গোল বাটি মোমবাতিটা নিভে গেছে। ঘরের মধ্যে উষ্ণতার আবেশ। কাঁচের জানালা বেয়ে পরদার ফাঁক দিয়ে টাটকা রোদ গড়িয়ে এসে উপুড় হওয়া পুরুষ পিঠে প্রগলভতায় লুটোপুটি খাচ্ছে। পিঠের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম , সকালের ঘাসের উপর শিরশিরে শিশির বিন্দুর মতই নিজেদের লুকোতে ব্যস্ত। না রোগা না মোটা পুরুষ মানুষটি উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। বিলম্বিত লয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে। পিঠে আধখানা চাঁদের মত নখের দাগে রাতের কলঙ্ক। কোমরের উপর পাতলা চাদর ঢাকা। পাশেই আরেকটি শরীর শুয়ে, চিৎ হয়ে। আলতো হাতে চাদরটা টেনে ঠিক করে দিয়ে রোদের প্রগলভতা দেখছে, চোখে হিংসে চকচকে। হয়ত পিঠে মুখ গুঁজতে ইচ্ছে করছে !! শ্বাস টানার শব্দে পুরুষ শরীরটি ঘুমিয়ে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে। এদিকের শরীরটি আলতো হাতে নিজেকে তুলে ও মানুষটির মুখ দেখে , নিঃশব্দে শিশুর মত ঘুমোচ্ছে। হাত মুঠো। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে এদিকের শরীরটি ফিরে আসে নিজের জায়গায়। উত্তেজনার ক্ষতে আঙুল বুলোতে বুলোতে নিঃশব্দে হাসে, গা শিউরে ওঠে রাত যাপনের সুখে।
ধরে নেওয়া যাক এদিকের শরীরটির নাম মেহুল , পুরোপুরি প্রেমে থাকা মানুষ। আয়ত চোখ, জোড়া ভ্রু , কামনা উদ্রেককারী ঠোঁট। আপাতত ঠোঁটের কোণে দাগ, নোনতা স্বাদ চুঁইয়ে পড়ে। পাশেই বেড সাইড টেবিলে অগুরু ধূপের ছাই এর পিরামিড। খাটের পাশে অবিন্যস্ত পোশাক, উল্টোনো চটি, সুরক্ষার প্যাকেট। একটা ডার্ক চকোলেটও , দাঁতের দাগ কাঁধে নিয়ে উপুড়। খাঁজ দেখে প্রেমীর চোখ চকচকে হয়ে ওঠে। অন্যমনস্ক আঙুল খেলা করতে থাকে, কামড়ানোর দাগ বরাবর।
মেহুলের জন্মটা কেন হয়েছিল আজও প্রশ্ন করে বাথরুমের টাইলসকে, যেখানটায় প্রতিদিন শাওয়ার চালালেই জল ছিটকে ছিটকে যায়। জলের ফোঁটারা শান্ত হয়ে নেমে আসে গড়ানের দিকে। তাদের পাশে দুটো হাতের পাঞ্জা নরম ছাপ বসায়। জল শরীর বেয়ে নামে, উপত্যকা পেরিয়ে। বাঁধ না মানা আনন্দের লহর তোলে শরীর যন্ত্রে। শিল্পী আঙুলরা শাওয়ারের জলে সেতারের তার খোঁজে। তার ? সম্পর্কের সুতো কিংবা তার একই গোত্রের। যন্ত্রের তার বাঁধা যায়, সম্পর্কের তার সেই যে কাটে কোনো হাতের আদরেই বাঁধা পড়ে না। প্রেমী রোজ ভাবে , রোজ। তারপর নগ্ন দেহে সূর্যকে আমন্ত্রণ জানায় কুন্তীর মত। সেই একই উচ্ছলতা , একই মন্ত্র
" ওম জবাকুসুম শঙ্কাসন কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং ধ্বন্তারিং সর্ব পাপয়ং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্ "
প্রণাম সূর্যদেব।
সূর্যদেব বুক ছুঁয়ে, আজকের মত কবচ পরিয়ে দেন জীবনী শক্তির। মেহুল একটা লাল টকটকে জবা বারান্দায় যেখানে রোদ পড়েছে সেখানে অর্পণ করে। চেয়ারের উপর রাখা থাকে পরবর্তী পোশাক। হালকা গোলাপী বার্থরোব । গলিয়ে নেয়, আলগা গিঁট্টু বেঁধে। ছোট থেকেই গিঁট্টু বাঁধাটা গোলমেলে লাগে মেহুলের। গিট্টু মানে সম্পর্কের তার। কার পরে কি বা কার পরে কে ? জেঠুর পরে মা নাকি বাবার পরে মা !!
হাতে জলের ঝারি নিয়ে মেহুল পা রাখে সবুজ ঘাসে , শিরশিরে অনুভূতি পায়ের তলা ছাড়িয়ে কোমর অবধি শিহরিত করে, ঊর্ধ্বাঙ্গে সূর্যের রক্ষাকবচ। জবাগাছ কান্ড পাতা ভিজিয়ে স্নান করে। একটা একটা বোঁটা ভাঙা কুঁড়ি ভ্রুণ টুস করে পায়ের কাছে খসে পড়ে। মেহুলের তখন নিজেকে প্রভু মনে হয়। ভ্রুণ-টি কুড়িয়ে নিয়ে শোঁকে, বুকের কাছে বার্থরোবের তলায় চেপে রাখে। ফিরে আসে ঘরে। শুরু হয়ে যায় নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। একপেয়ালা সুগন্ধি সবুজ চা-এর নির্যাসে ঠোঁট ডুবে যায়। সাথে নিজ হাতে বেক করা ঝরঝরে কুকিস।
এই ঘরটা নিজস্ব, মেহুলের মায়ার কারণ। এ ঘরে কারুর কোনো ফটো নেই কোথাও , একেকসময় নিজের মনেই হাসে সে । যেন অতিথিশালা এটি , মেহুল সেখানে অতিথি। রাতের অতিথি। চা-পান সেরে মেহুল লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পোশাক পরে , চোখে আলতো কাজল পেন্সিল টানে । বোঝা না যাওয়ার মত। বিছানায় পুরুষটির ঘুম প্রবল। মেহুল রোদটুকু আড়াল করতে পর্দা টেনে দেয়। মুখ অল্প হাঁ করে ঘুমন্ত মানুষটির গালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়েই সরিয়ে নেয় নিজেকে। কান উত্তপ্ত হয়ে উঠবে আর একটুক্ষণ ছুঁয়ে থাকলে।
ডাইনিং রুমের টেবিলে গোলাপী চিরকুটে চাবি রাখার নির্দেশ দিয়ে কিছু খাবার হটপটে রেখে মেহুল বেরোয় একটু দূরের তার ছোট্ট ক্যাফের দিকে। শাটার তোলে, কাঁচের দরজার ওপারে ক্লোজড বোর্ডটায় হাত বুলিয়ে সাফসুতরো করে নিয়ে অভ্যস্ত হাতে বেক করা শুরু করে। ছোট্ট হতে পারে , মানুষ আসে অনেক। মেহুল নিজের জায়গা থেকে দেখে তাদের। টাকা দেওয়ার সময় কারুর আঙুল সরু, প্ল্যাটিনামের আংটি বেড় দিয়ে থাকে, কারুর আঙুল সামান্য মোটা, স্টেনলেস স্টিলের আংটি, কারুর ঝুটো কিন্তু ভালোবাসা মাখানো আংটি অলংকৃত করে। সবুজ ঘাসের শিরশিরে অনুভবটা এইবারে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মেহুলের শিল্পী আঙুল অস্থির হয়ে টেবিল ঠোকে, বেশ কিছু পরে একসময় সব শান্ত। ক্রেতার কথা বার্তা হাসি কিছুই কানে আসে না। আজ কিছু নতুন কেকের কথা ভেবেছে মেহুল , দেখা যাক। ইতিমধ্যেই ফ্রেশ বেকের গন্ধে ক্যাফে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে।
অস্তিত্ব .... অস্তিত্ব!! শিকড়!! টান অথবা তার !! বাবা না জ্যেঠু ? কার কার কার অংশ !! নাকি কারুরই নয় । কার সাথেই তার মিল ?
( ক্রমশ ...)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860085590837951&id=707552542757924
No comments:
Post a Comment