Showing posts with label থিমভিত্তিক ধারাবাহিক সিরিজ. Show all posts
Showing posts with label থিমভিত্তিক ধারাবাহিক সিরিজ. Show all posts

Sunday, April 29, 2018

#মেলার_গল্প

#উপসংহার

#ধূপছায়া_মজুমদার

তারপর, বন্ধুরা, মেলার ক'টাদিন কেমন কাটলো? মনে হচ্ছে না কেমন হুশ করে দিনগুলো পেরিয়ে গেল? এই তো সেদিন মেলা বসলো, বাঁশ-তেরপলের কাঠামোর ওপর ওয়াটারপ্রুফ পলিথিনের চাদর দড়ি দিয়ে বেশ করে টেনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে অস্থায়ী দোকানের অস্থায়ী ছাদ তৈরি হলো, দোকানে দোকানে ইলেকট্রিকের তার টেনে নিয়ে গিয়ে আলো ঝোলানো হলো, ওদিকে 'হ্যালো টেস্টিং টেস্টিং হ্যালো ওয়ান টু থ্রি' শুনে শুনে কান ঝালাপালা হচ্ছিলো কদিন, মেলা শুরুর দিন হঠাৎ সেটাই বদলে গেলো "আমাদের এই বার্সিক মেলার অোনুষ্ঠান এবার সতেরো বছরে পড়ল' তে, আর ওই ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুকুর, কাক, আর প্রায় ওদের সঙ্গেই ভাগ্য ভাগ করে নেওয়া ভবঘুরেদের দল, তারাও সব গুটিগুটি পায়ে আসতে লাগলো মেলার মাঠের দিকে।

মেলার মাঠে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দেখা হয়ে গেল গঙ্গা যমুনা পতু আর রমেনের সঙ্গে। পুলিশ আর মানবাধিকারের টানাপোড়েনে ওদের ভবিষ্যতে কি লেখা আছে পড়া গেল না, তবে নেশার ঘোরে বকে যাওয়া রমেনের কথা শুনে মনে হলো, লোকটার বাইরেটা আর ভেতরটা বোধহয় একরকম নয়। অবশ্য আমরা বাইরে থেকে দেখে আর কতটুকু বুঝতে পারি? আমরা কি বুঝি, জোড়া মেয়েদের একজন যমুনা, সে তার নিজের 'সমাজে ফিট না হওয়া' চেহারাকে সাজিয়েগুছিয়ে রেখে কোন্ লড়াইয়ে যুঝতে চেষ্টা করে? নাকি আমরা বুঝতে পারি পতু কেন পঞ্চাশ টাকার নোটটা আলাদা করে তুলে রেখে দেয়? টানটা ঠিক কিসের?

এরপর আমরা দেখি টুম্পা আর তার মাকে। টুম্পাটা বড় অভিমানী, সেই কবে ওর মা গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়েছিল, সেই ব্যথা সে মেলায় আসার সময়েও বুকে বয়ে এনেছে। সেই অভিমানেই কি ছোট্ট মেয়েটা মায়ের আঁচল ছেড়ে একা একা বেরিয়ে পড়েছিল মেলায় ঘুরতে? তারপর আর চেনা পথে ফিরে যেতে পারেনি? না বোধহয়, অতটুকু মেয়ে কি আর অত ভেবে কাজ করে? ওর চোখে আর মনে ঝিলমিল লেগেছিল, চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল মেলার ঐশ্বর্যে, তাই ও হাঁটা দিয়েছিল অনির্দেশের পথে। বাকিরা কেউ ওকে খুঁজে পায়নি, কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিল ওকে। তারপর কি হল? খুব স্পষ্ট নয় সেটা, মোট কথা, সময়ের সরণি থেকে আর ফেরা হলো না টুম্পার। আহা, আরেকটু আগলালে হতো না? কি জানি!

এরপর আমাদের সামনে আসেন একমুঠো লজেন্স হাতে নিয়ে পোটলি বাবা, জীবনবাবু। যাঁর শরীরে জীবন ক্যান্সারের কলমে বিদায়ের নির্ঘণ্ট লিখে পাঠিয়েই দিয়েছে, তিনি কাঁধের ঝোলায় মুঠো মুঠো লজেন্স নিয়ে মেলা থেকে মেলায় ঘুরে বেড়ান স্রেফ একটু আনন্দ জীবনে ভরে নেবেন বলে। এঁর সঙ্গে আলাপের পরেও কি আমরা ভাবব জীবনের অনেকটা জুড়ে থাকে আঁধার? নাহ, সেটা উচিত হবে না, চলুন, আমরা বরং আলোর হাত ধরে হেঁটে যাই জীবনবাবুর কাছে, আনন্দের খোঁজে চলেছেন উনি, ওঁর সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে তো!

এর পর যার সঙ্গে আলাপ হলো, সে হচ্ছে টুবাই। সে তার 'কালো, সোয়েট করা ' মালতীমাসির ভক্ত, শহুরে উন্নাসিকতা আর উচ্চাকাঙক্ষার ঘেরাটোপে তার সরল শৈশবের স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে যায়, ব্যালান্সিং-এর খেলনার মতোই নিখুঁত ব্যালান্সিং শিখে যায় সেও। শুধু, তার বুকের মাঝে কোনও এক কোণে থেকে যায় কি নাগরদোলা আর পাঁপড় -জিলিপির কোনও ছবি? সেই ছবি নিয়ে সে কি তার উত্তরসূরির হাত ধরে একদিন এসে দাঁড়াবে এই মেলার মাঠে? উত্তর দেবে সময়।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন শেষ বিকেলে দেখা যায় তিনজনের একটা পরিবার হেঁটে চলে যাচ্ছে, বাড়ি ফিরছে, পথে ফেলে যাচ্ছে মেলার চিহ্নদের, জিলিপির ফোঁটা ফোঁটা রস, পাঁপড়ভাজার হলদে গুঁড়ো, ওদের ঝোলায় আছে এক মস্ত দৌলত, ছবিঘরের ক্যামেরায় তোলা একটা আস্ত ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ। ওদের চুড়ি কেনা হয়নি, মাথায় দেওয়ার শোলার টোকা, পায়ে দেওয়ার চটি, কিচ্ছুটি কেনা হয়নি, বদলে ওদের ছেলেটার মুখে হাসি ফুটেছে, আর কি চাই? মনে পড়ে যায়, অনেকদিন আগে এক গ্রাম্য মাঝির চেয়ে নেওয়া আশীষের কথা, "আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে"! এ চাওয়া যে চিরন্তন। মুখগুলো বদলে যায়, চাওয়াটা সেই একই থাকে। তারই জন্য কষ্ট, তারই জন্য ত্যাগস্বীকার, সবকিছু।

এরপর এসে দাঁড়াতে হলো গগন ময়রার দোকানে, তার জিলিপির নামডাক যা, চেখে দেখতে তো হবেই। রসে টইটম্বুর জিলিপি খেতে খেতে জানা গেল এক আপাতকঠিন ব্যবসায়ীর এক অসম লড়াইয়ের কাহিনী, এক সাধারণ মানুষ থেকে মহীরুহ হয়ে ওঠার আখ্যান। নেলো হাবলা খেঁদি মান্তিদের গ্রাসাচ্ছাদনের ভারই কেবল নয়, তাদের কর্মসংস্থানেরও রাস্তা খোলা রাখবে বলে প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে গগন ময়রা আর মণি, হয়তো নিজেদের অজান্তেই, এ যে 'সমাজসেবা', সেই অনুভবের অহঙ্কার তাদের মনে জায়গা করে নিচ্ছে কি? জানা নেই। তাদের এই লড়াই ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে, মানুষের মনে জেগে উঠুক শুভবোধ, পরমেশ্বরের কাছে আপাতত এই প্রার্থনা করে চলুন এগিয়ে যাই আমরা।

এবার দেখা হবে নিতাই বেলুনওয়ালার সঙ্গে। ওই যে, পা মুড়ে বসে ছবি আঁকতে থাকা ছেলেটির পাশে বসে পাজামা টা একটু তুলে কাটা পায়ের ঘষা খাওয়া জায়গাটা চুলকে নিচ্ছে নিতাই, আর ছবি আঁকিয়ে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখছে তার 'মডেল' কে সে ভুল করে গোটা মানুষ ভেবে ফেলেছিল। আহা, থাক না, ক্ষতি কি? দ্যাখো দেখি, নিতাই ক্ষ্যাপা কেমন খুশি হলো নিজের গোটা চেহারাটাকে ছবির দুনিয়ায় দেখতে পেয়ে! এইই তো পাওয়া হে বন্ধুরা, ওই যে একলা নিতাই বেলুনওয়ালা নিজের একখানা গোটা ছবি আর হাতে সেই পুরাকালের ঝুমঝুমি বেলুন দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে একটা মস্ত বেলুন উপহার দিয়ে বসল শিল্পী মানুষটিকে, ওদের ওই খুশি আর বিস্ময়টুকুই রয়ে যাবে, ফিরে ফিরে আসবে আঁধারঘেরা মুহূর্তেও, এক লহমায় আলোয় ভরে যাবে চারপাশ। বাকি সবই মায়া, কালের ক্যানভাসে ভাসমান বুদবুদ, ব্যস।

চড়কের মেলা, সেখানে লোহার শলায় জিভ ফোঁড়া, গালে বাণ মারা, আগুনে হাঁটা এসব আসবে না, তাই কি আর হয়? তাই এবার আমাদের দেখা হয়ে যায় বুধনের সঙ্গে, চড়কপূজার ব্রতপালনের নামে নিজেকে যে বছরের পর বছর ক্ষতবিক্ষত করে চলে, কোন্ ইষ্টলাভের আশায়, জানা নেই। তবে করে, সে, এবং গ্রামবাংলার আরও অগণিত মানুষ এভাবেই ব্রতপালন করে আসছে বহুদিন ধরে। বুধনের কষ্টে চোখ উপচে জল আসে তার স্ত্রী মালতীর, তার কষ্টে প্রলেপ লাগাতে উঠেপড়ে লাগেন প্রাচীন আধুনিক মানুষ অমলা। তাঁদের আগলে রাখার মায়ায় জড়িয়ে বুধন কি সামনের বছর পিছিয়ে আসবে এই কষ্টদায়ক আচার পালন থেকে? দেখা যাক, অপেক্ষায় থাকি আমরা, আরও এক বছর।

বৈশাখের মেলার এক প্রধান চরিত্র হলো কালবৈশাখী ঝড়, আর মেলায় দুই মনের মিলন হবে, দুই মন একসুতোয় বাঁধা পড়ে নতুন পথে চলা শুরু করবে এই মেলার মাঠ থেকেই, এ তো খুবই স্বাভাবিক। তাই মেলার মাঠে এক ঝড়ের সন্ধ্যায় শুরু হয় জয়ন্ত আর মিঠির একসাথে পথ চলা। জয়ন্তকে ভালো মানুষ বলেই মনে হয়, সে নিশ্চয়ই মিঠিকে ভালো রাখবে, মিঠি -জয়ন্তর নতুন সংসার শান্তি আর স্বস্তিতে ভরে উঠবে, এই আশা মনে রেখে আমরা তাকাই ঋজুর দিকে, সেই ঝড়ের সন্ধ্যাতেই যে ঋজু অসুরবধ করে এক নতুন জন্ম লাভ করেছে। আর নোলাবুড়ো? কে নেবে তার ভাতের ভার? জয়ন্ত কি তাকেও নিয়ে গেল কলকাতা? নাকি তার হাত এবার ধরবে ঋজু, প্রায়শ্চিত্ত করবে ফেলে আসা পাপের? ভগবান আর নোলাবুড়োকে দুপাশে নিয়ে একই টেবিলে বসে খাওয়া সারতে পারবে কি ঋজু? সময়ই বলুক সে কথা, আমরা বরং সামনে এগোই।

এভাবেই শেষ হয় চড়কের মেলা, খোলা হয় প্যান্ডেল, খোলা হয় নাগরদোলার টুকরোদের। আবার অন্য কোথাও গিয়ে জড়ো হবে এরা, হয়তো গোবিন্দপুর, কিংবা অন্য কোথাও। আমরাও যাবো সেসব মেলায়, পায়ে পায়ে, দেখা হয়ে যাবে চেনামুখগুলোর সঙ্গে, চিনে নেবো আরও কিছু নতুন মুখ। জীবন বয়ে যাবে তার নিজের স্রোতে, দিনরাত্রি আসবে যাবে, আমরা খুঁজে নিতে থাকব জীবনরসের গল্প, মেলার মাঠে।

(সমাপ্ত)

****************************

***'মেলার গল্প ' আপাতত এখানেই শেষ। বন্ধুরা, সঙ্গে থাকার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। সিরিজটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত জানতে চাই আমরা, আপনাদের মনের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছি, আমরা জানতে আগ্রহী।

সিরিজশেষে পাঠকদের কাছ থেকে সিরিজের থিমের ওপর গল্প চাওয়ার রেওয়াজ বজায় থাকছে এই বারও। পাঠকবন্ধুদের কাছে অনুরোধ, মেলা নিয়ে লেখা অপ্রকাশিত গল্প-কবিতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। মেলা হয়ে উঠুক সবার জন্য।

******************************

**'মেলা' সিরিজের সবকটি গল্পের লিঙ্ক একত্রে দেওয়া রইলো নিচে, বন্ধুদের জন্য :

মেলার গল্পের গৌরচন্দ্রিকা, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878076192372224&id=707552542757924

গঙ্গা যমুনা, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067565706420&id=707552542757924

সময় সরণি, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878066922373151&id=707552542757924

পোটলি বাবা, দেবলীনার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878074705705706&id=707552542757924

টুবাইয়ের গল্প, অভিষেকের কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878066399039870&id=707552542757924

পদচিহ্ন, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067832373060&id=707552542757924

দয়াময়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878073859039124&id=707552542757924

স্বপ্নফানুস, দেবলীনার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878065759039934&id=707552542757924

মানত, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067349039775&id=707552542757924

চক্রবৎ (সিনেমায় যেমন হয়), অনিন্দ্যর কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=882580938588416&id=707552542757924

Wednesday, February 14, 2018

অস্ত্র উঠুক : গৌরচন্দ্রিকা

সিরিজ ১: অস্ত্র উঠুক 
গৌরচন্দ্রিকা 
*****************
সুস্মিতা কুণ্ডু এবং শুভদীপ সাহা

হুঁকোটায় একটা হেঁইয়ো করে জোরসে টান দিয়ে, আমেজে শিবনেত্র হয়ে বসেছিলেন ভোলানাথবাবু। একটুকুনি ছাই বাঘছাপ গালচেটায় পড়তেই  ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেল ভোলানাথবাবুর। বিরস বদনে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে ফের আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। বিলকুল ভুলে মেরে দিয়েছেন। পারোসুন্দরী এযাত্রায় আর আস্ত রাখবেনা। তেড়েমেড়ে হাঁক পাড়লেন দুই 'পুরাতন ভৃত্য'-কে। 
"ওরে ওই নোদে, কোতায় গেলি হতচ্ছাড়া ভেঙ্গো"। 
তড়িঘড়ি তেলচিটে গামছায় হাত মুছতে মুছতে দুই মক্কেল পড়ি কি মরি করে ছুটে এল। 
"এজ্ঞে কী হয়েচে কত্তাবাবা? তামুক ঠিক সাজা হয়নি বুজি? এক ছিলিম এক্কুনি সেজে আনচি ফের। সব ওই নোদেটার দোষ" - বলে ভেঙ্গো।
নোদে কাঁইমাঁই করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, থামিয়ে দিয়ে ভোলানাথবাবু হুঙ্কার ছাড়লেন - "দুটোর মাথাই এই ডুগডুগি ছুঁড়ে ভাঙব! এক হপ্তা আগে যে জিনিসগুলো নিয়ে আসার কথা বলেছিলুম, নিয়েইচিস ?"
দুই ভৃত্য একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে এক হাত লম্বা জিভ বার করে। ভোলানাথবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বেশ খানিকটা তান্ডব নাচ করে নেবেন ভেবেও ক্ষ্যান্ত দেন। 'রতি'-র বিউটি পার্লার থেকে 'পারো' আসার আগে ওগুলো চাই-ই-চাই। নইলে তৃতীয় নয়ন থেকে বাঁচানোর সাধ্যি ব্রহ্মা বিষ্ণু কারোরই নেই। 
ফের গলা ছাড়লেন - " কাতুউউউউ! গনুউউউউ! শিগ্গির আয় এখানে।" 
দুই ভাই এসে হাজির হল বাপের কাছে। এত হাঁকডাক শুনে লাকি আর সরো-ও থাকতে না পেরে হাজির হল, নিজেদের দ্বিপ্রাহরিক রূপটান ছেড়ে। 
ভোলানাথ এবার নোদে-ভেঙ্গো কে ছেড়ে এদের ওপর চড়াও হলেন। 
"বলি কবে থেকে যে তোমাদের মাতাঠাকরুণের জং ধরা অস্ত্র-শস্ত্রগুলো বিশ্বকর্মার ওয়ার্কশপে পালিশ করার জন্য পড়ে আছে, সে খেয়াল আচে?" 
কাতু সদ্য গজানো গোঁফটায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে -
 "ওই মান্ধাতার দাদুর আমলের টিনকাটাগুলো নিয়ে মা যাবে মর্ত্যে যুদ্ধ করতে! তাহলেই হয়েচে। শুরুর আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আমিই তো আমার তির ধনুকটা বিশুখুড়োকে দিয়ে এসেছি। বলেছি একটা হালকা দেখে এ.কে.-৪৭ বানিয়ে দিতে। তুমিও মাকে নিদেনপক্ষে একটা পাইপগান কিনে দাও বুঝলে?"
হতভম্ব ভোলানাথের দিকে চেয়ে লাকি আর সরো কলকলিয়ে বলে ওঠে- " হ্যাঁ বাবা! দাদা ঠিকই বলেছে। ওই গেলবার পুজোয় মর্ত্যে মামাবাড়ি গেলুম। তা একটু লেট নাইট শো দেখে প্যান্ডেলে ফিরছি। আর লাকি কে তো জানোই কেমন গয়নাগাঁটি পরে বেরোয় পথে। কিরকম গুন্ডা মতো কটা ছেলে পিছু নিল। হাতে পেটো, রিভলবার, অ্যাসিড বাল্ব সব ছিল। ভাগ্যিস হাঁসু আর পাঁচু গিয়ে ঝপ করে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে এল। নইলে যে কী হত ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় ভয়ে।"
আতঙ্কে ফ্যাকাশে মেরে যাওয়া মুখে ভোলাবাবু কোনো মতে বল্লেন - "মা কে ডাকলি না কেন তোরা? বা কালীমাসি কে?"
"কী যে বলো না বাবা! কালীমাসির তখনো কৈলাস থেকে যাওয়ার প্লেনের টিকিটই বুক হয়নি। আর মা প্যান্ডেল থেকে এসে ত্রিশুল এইম করতে করতে তোমার লাকি আনলাকি হয়ে যেত আর সরো পার্মানেন্ট Sorrow-সাগরে ডুব দিত।" - বলে দুই মেয়ে। 

ভোলাবাবু তো যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! গনুটার বুদ্ধিশুদ্ধির ওপর চিরকাল একটু বেশিই আস্থা করেন। ওকে শুধোলেন -
 "গনু বাপু তুই কি বলিস এ ব্যাপারে? সত্যি কি তোর মায়ের অস্ত্রগুলো ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে?" 
গনু ভেবেচিন্তে ধীরে ধীরে বলে -"তা বাবা ওরা মিছে কথা কইচেনা। এই তো সেদিন মহি-জ্যাঠা খুব দুক্কু করছিল। মর্ত্যের দোর্দন্ডপ্রতাপ মনুষ্যরূপী অসুরগুলোর শয়তানি দেখে জ্যাঠার নাকি ভারি ইনফিরিয়োরিটি কমপ্লেক্স হয়েচে। অ্যান্টি ডিপ্রেশন বড়িও গিলছে অশ্বিনীমামাদের প্রেসকিপশনে। জিগ্গেস করো না।"
এক কোণে মুষড়ে বসে মোষের দুধ দুইতে থাকা মহি-জ্যাঠার দিকে শুঁড়-নির্দেশ করে গনু। 
"মা কে ওইসব মর্ত্যবাসী মারকুটে অসুরদের সামনে ওই ফঙ্গবেনে অস্ত্র কটা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া কি উচিত হবে?"

সবাই বড় চিন্তায় কান মাথা চুলকোতে থাকে। এমন সময় ভোলানাথ-ঘরণী পারো প্রবেশ করেন। সকলের ঝিমোনো মুখগুলো দেখে শুধোন - "কী হল টা কী? এমন ম্যাদা মেরে আছো কেন সবকটা মিলে?"
সকলে মিলে হাঁউ মাঁউ খাঁউ করে সব বলতে শুরু করল। সব শুনে টুনে মাতা ঠাকরুণ বল্লেন -"তোদের অনেক আগেই সব কিছু আমার ভাবা হয়ে গেছে। এ যুগের নররূপী অসুরদের বধ করতে যে আমার পুরোনো অস্ত্রআর কাজে আসবেনা সে আমি ভালই বুঝেছি। তাই মর্ত্যের অসুর বধের দায় মর্ত্যেরই #অস্ত্র_উঠুক টিমের হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। যুগোপযোগী হাতিয়ার ওরাই খুঁজে বার করবে।"

ভোলানাথবাবু প্রবল বিস্ময়ে বললেন - "#অস্ত্র_উঠুক !! সেটা কী ? খায় না মাথায় দেয়! " 
পারো তীব্র কটাক্ষপাত করে ঝেঁঝে উঠলেন - "সেটা জানতে গেলে তো গেলবার যে দামি মোবাইলটা পুজোয় গিফ্ট করলুম সেটা অন করতে হবে। ফেসবুকে লগ-ইন করতে হবে। ওদের পেজটায় পয়লা বৈশাখ থেকে নজর রাখতে হবে।" 
"আর কাতু গনু লাকি সরো তোরাও কিন্তু ওদের বার্তা 'শেয়ার' করে ছড়িয়ে দিতে ভুলবি না।"
নোদে ভেঙ্গোও সমস্বরে বলে উঠলো - "আমরাও করব কত্তামা !"
মহি-জ্যাঠা টুক করে ইউ টিউবে অকাল মহালয়া চালিয়ে দিল - 

"ইথ্থং যদা যদা বাধা দানবোথ্থা ভবিষ্যতি।
তদা তদাবতীর্যাহম করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্।।
যখন যখনই দানবের অত্যাচারে পৃথ্বী হবে ভারানতা, তখন তখনই শত্রুনাশের জন্য তুমি আবির্ভূতা হবে এই মহীতলে। এই আশ্বাসে স্নেহ ছিল, অভয় ছিল, প্রেম ছিল।
কিন্তু হে মা! শত্রু যে আজ সর্বত্রই। তোমার মহিমময় আবির্ভাব কি ঘটবে না? অস্ত্র কি তোমার ঝংকার তুলবে না অত্যাচারীর অঙ্গচ্ছেদনে? 
"রাবনস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে ব্রহ্মণাবোধঃ
দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা।"
রাবণবধের জন্য রামকে অনুগ্রহ করতে ব্রহ্মার স্তুতিতে নিদ্রা থেকে জাগরিতা হয়েছিলে তুমি! তবে এই দুষ্কালে শত শত কন্ঠের আকুল স্তুতিতেও কি তোমার নিদ্রাভঙ্গ হচ্ছে না? তুমি কি শুধু রাজাকে অনুগ্রহ করবে বলে জগজ্জননীরূপে বিরাজিতা?
তবে "আব্রহ্মকীটজননী" কেন? 
"গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধুযাবত পিবাম্যহম্।
ময়া ত্বয়ি হতেত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতা।।"
ধর্ষকের কামোল্লাস কি তোমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না? তবে তোমার এই নির্বিকল্পা নির্বিকারা  রূপ কেন মা? তোমার বন্দনাগীতি সপ্তসুরে তানপুরে সাধা আছে, তোমার জয়ধ্বনি কম্বুকন্ঠে বাঁধা আছে। শুধু তোমার শত্রুনিধনের অপেক্ষা মাত্র।  
আজ এই পূণ্য লগনে প্রেম-জরজর ভাষে বোধন করি তোমার! হে ত্রিলোকেশ্বরি! হে অমৃতানন্দময়ি! করূণাবলোকিনী! হে অনন্তা! হে অনন্তায়ূধধারিণী অনন্তভূজা! হে অনন্তকোটিব্রহ্মান্ডপ্রসবিনী! তোমার শক্তি জাজ্জ্বল্যমান আদিত্যকিরণের মত বিস্তারিত হোক জগতে। তোমার তীক্ষ্ণধার অস্ত্র উঠে আসুক নারীশক্তি রূপে। তোমার শাশ্বত বাৎসল্যময়ি মূর্তি হোক নারীর আদর্শ। এই ভাবদ্বয়ে ভাবমন্ডিতা হয়ে নারী হয়ে উঠুক 'ভীষণে মধুরা'।।

খড়্গে নাশো অরিকুল কালী কলিহরা।
নাশো মৃত্যু নাশো ব্যাধি বরাভয়করা।।
কালীদাস পদে পদে সেইপদ কয়।
যেপদে বিপদমাত্রে পদরক্ষা হয়।।