সিরিজ ১: অস্ত্র উঠুক
গৌরচন্দ্রিকা
*****************
সুস্মিতা কুণ্ডু এবং শুভদীপ সাহা
হুঁকোটায় একটা হেঁইয়ো করে জোরসে টান দিয়ে, আমেজে শিবনেত্র হয়ে বসেছিলেন ভোলানাথবাবু। একটুকুনি ছাই বাঘছাপ গালচেটায় পড়তেই ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেল ভোলানাথবাবুর। বিরস বদনে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে ফের আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। বিলকুল ভুলে মেরে দিয়েছেন। পারোসুন্দরী এযাত্রায় আর আস্ত রাখবেনা। তেড়েমেড়ে হাঁক পাড়লেন দুই 'পুরাতন ভৃত্য'-কে।
"ওরে ওই নোদে, কোতায় গেলি হতচ্ছাড়া ভেঙ্গো"।
তড়িঘড়ি তেলচিটে গামছায় হাত মুছতে মুছতে দুই মক্কেল পড়ি কি মরি করে ছুটে এল।
"এজ্ঞে কী হয়েচে কত্তাবাবা? তামুক ঠিক সাজা হয়নি বুজি? এক ছিলিম এক্কুনি সেজে আনচি ফের। সব ওই নোদেটার দোষ" - বলে ভেঙ্গো।
নোদে কাঁইমাঁই করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, থামিয়ে দিয়ে ভোলানাথবাবু হুঙ্কার ছাড়লেন - "দুটোর মাথাই এই ডুগডুগি ছুঁড়ে ভাঙব! এক হপ্তা আগে যে জিনিসগুলো নিয়ে আসার কথা বলেছিলুম, নিয়েইচিস ?"
দুই ভৃত্য একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে এক হাত লম্বা জিভ বার করে। ভোলানাথবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বেশ খানিকটা তান্ডব নাচ করে নেবেন ভেবেও ক্ষ্যান্ত দেন। 'রতি'-র বিউটি পার্লার থেকে 'পারো' আসার আগে ওগুলো চাই-ই-চাই। নইলে তৃতীয় নয়ন থেকে বাঁচানোর সাধ্যি ব্রহ্মা বিষ্ণু কারোরই নেই।
ফের গলা ছাড়লেন - " কাতুউউউউ! গনুউউউউ! শিগ্গির আয় এখানে।"
দুই ভাই এসে হাজির হল বাপের কাছে। এত হাঁকডাক শুনে লাকি আর সরো-ও থাকতে না পেরে হাজির হল, নিজেদের দ্বিপ্রাহরিক রূপটান ছেড়ে।
ভোলানাথ এবার নোদে-ভেঙ্গো কে ছেড়ে এদের ওপর চড়াও হলেন।
"বলি কবে থেকে যে তোমাদের মাতাঠাকরুণের জং ধরা অস্ত্র-শস্ত্রগুলো বিশ্বকর্মার ওয়ার্কশপে পালিশ করার জন্য পড়ে আছে, সে খেয়াল আচে?"
কাতু সদ্য গজানো গোঁফটায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে -
"ওই মান্ধাতার দাদুর আমলের টিনকাটাগুলো নিয়ে মা যাবে মর্ত্যে যুদ্ধ করতে! তাহলেই হয়েচে। শুরুর আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আমিই তো আমার তির ধনুকটা বিশুখুড়োকে দিয়ে এসেছি। বলেছি একটা হালকা দেখে এ.কে.-৪৭ বানিয়ে দিতে। তুমিও মাকে নিদেনপক্ষে একটা পাইপগান কিনে দাও বুঝলে?"
হতভম্ব ভোলানাথের দিকে চেয়ে লাকি আর সরো কলকলিয়ে বলে ওঠে- " হ্যাঁ বাবা! দাদা ঠিকই বলেছে। ওই গেলবার পুজোয় মর্ত্যে মামাবাড়ি গেলুম। তা একটু লেট নাইট শো দেখে প্যান্ডেলে ফিরছি। আর লাকি কে তো জানোই কেমন গয়নাগাঁটি পরে বেরোয় পথে। কিরকম গুন্ডা মতো কটা ছেলে পিছু নিল। হাতে পেটো, রিভলবার, অ্যাসিড বাল্ব সব ছিল। ভাগ্যিস হাঁসু আর পাঁচু গিয়ে ঝপ করে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে এল। নইলে যে কী হত ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় ভয়ে।"
আতঙ্কে ফ্যাকাশে মেরে যাওয়া মুখে ভোলাবাবু কোনো মতে বল্লেন - "মা কে ডাকলি না কেন তোরা? বা কালীমাসি কে?"
"কী যে বলো না বাবা! কালীমাসির তখনো কৈলাস থেকে যাওয়ার প্লেনের টিকিটই বুক হয়নি। আর মা প্যান্ডেল থেকে এসে ত্রিশুল এইম করতে করতে তোমার লাকি আনলাকি হয়ে যেত আর সরো পার্মানেন্ট Sorrow-সাগরে ডুব দিত।" - বলে দুই মেয়ে।
ভোলাবাবু তো যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! গনুটার বুদ্ধিশুদ্ধির ওপর চিরকাল একটু বেশিই আস্থা করেন। ওকে শুধোলেন -
"গনু বাপু তুই কি বলিস এ ব্যাপারে? সত্যি কি তোর মায়ের অস্ত্রগুলো ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে?"
গনু ভেবেচিন্তে ধীরে ধীরে বলে -"তা বাবা ওরা মিছে কথা কইচেনা। এই তো সেদিন মহি-জ্যাঠা খুব দুক্কু করছিল। মর্ত্যের দোর্দন্ডপ্রতাপ মনুষ্যরূপী অসুরগুলোর শয়তানি দেখে জ্যাঠার নাকি ভারি ইনফিরিয়োরিটি কমপ্লেক্স হয়েচে। অ্যান্টি ডিপ্রেশন বড়িও গিলছে অশ্বিনীমামাদের প্রেসকিপশনে। জিগ্গেস করো না।"
এক কোণে মুষড়ে বসে মোষের দুধ দুইতে থাকা মহি-জ্যাঠার দিকে শুঁড়-নির্দেশ করে গনু।
"মা কে ওইসব মর্ত্যবাসী মারকুটে অসুরদের সামনে ওই ফঙ্গবেনে অস্ত্র কটা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া কি উচিত হবে?"
সবাই বড় চিন্তায় কান মাথা চুলকোতে থাকে। এমন সময় ভোলানাথ-ঘরণী পারো প্রবেশ করেন। সকলের ঝিমোনো মুখগুলো দেখে শুধোন - "কী হল টা কী? এমন ম্যাদা মেরে আছো কেন সবকটা মিলে?"
সকলে মিলে হাঁউ মাঁউ খাঁউ করে সব বলতে শুরু করল। সব শুনে টুনে মাতা ঠাকরুণ বল্লেন -"তোদের অনেক আগেই সব কিছু আমার ভাবা হয়ে গেছে। এ যুগের নররূপী অসুরদের বধ করতে যে আমার পুরোনো অস্ত্রআর কাজে আসবেনা সে আমি ভালই বুঝেছি। তাই মর্ত্যের অসুর বধের দায় মর্ত্যেরই #অস্ত্র_উঠুক টিমের হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। যুগোপযোগী হাতিয়ার ওরাই খুঁজে বার করবে।"
ভোলানাথবাবু প্রবল বিস্ময়ে বললেন - "#অস্ত্র_উঠুক !! সেটা কী ? খায় না মাথায় দেয়! "
পারো তীব্র কটাক্ষপাত করে ঝেঁঝে উঠলেন - "সেটা জানতে গেলে তো গেলবার যে দামি মোবাইলটা পুজোয় গিফ্ট করলুম সেটা অন করতে হবে। ফেসবুকে লগ-ইন করতে হবে। ওদের পেজটায় পয়লা বৈশাখ থেকে নজর রাখতে হবে।"
"আর কাতু গনু লাকি সরো তোরাও কিন্তু ওদের বার্তা 'শেয়ার' করে ছড়িয়ে দিতে ভুলবি না।"
নোদে ভেঙ্গোও সমস্বরে বলে উঠলো - "আমরাও করব কত্তামা !"
মহি-জ্যাঠা টুক করে ইউ টিউবে অকাল মহালয়া চালিয়ে দিল -
"ইথ্থং যদা যদা বাধা দানবোথ্থা ভবিষ্যতি।
তদা তদাবতীর্যাহম করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্।।
যখন যখনই দানবের অত্যাচারে পৃথ্বী হবে ভারানতা, তখন তখনই শত্রুনাশের জন্য তুমি আবির্ভূতা হবে এই মহীতলে। এই আশ্বাসে স্নেহ ছিল, অভয় ছিল, প্রেম ছিল।
কিন্তু হে মা! শত্রু যে আজ সর্বত্রই। তোমার মহিমময় আবির্ভাব কি ঘটবে না? অস্ত্র কি তোমার ঝংকার তুলবে না অত্যাচারীর অঙ্গচ্ছেদনে?
"রাবনস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে ব্রহ্মণাবোধঃ
দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা।"
রাবণবধের জন্য রামকে অনুগ্রহ করতে ব্রহ্মার স্তুতিতে নিদ্রা থেকে জাগরিতা হয়েছিলে তুমি! তবে এই দুষ্কালে শত শত কন্ঠের আকুল স্তুতিতেও কি তোমার নিদ্রাভঙ্গ হচ্ছে না? তুমি কি শুধু রাজাকে অনুগ্রহ করবে বলে জগজ্জননীরূপে বিরাজিতা?
তবে "আব্রহ্মকীটজননী" কেন?
"গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধুযাবত পিবাম্যহম্।
ময়া ত্বয়ি হতেত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতা।।"
ধর্ষকের কামোল্লাস কি তোমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না? তবে তোমার এই নির্বিকল্পা নির্বিকারা রূপ কেন মা? তোমার বন্দনাগীতি সপ্তসুরে তানপুরে সাধা আছে, তোমার জয়ধ্বনি কম্বুকন্ঠে বাঁধা আছে। শুধু তোমার শত্রুনিধনের অপেক্ষা মাত্র।
আজ এই পূণ্য লগনে প্রেম-জরজর ভাষে বোধন করি তোমার! হে ত্রিলোকেশ্বরি! হে অমৃতানন্দময়ি! করূণাবলোকিনী! হে অনন্তা! হে অনন্তায়ূধধারিণী অনন্তভূজা! হে অনন্তকোটিব্রহ্মান্ডপ্রসবিনী! তোমার শক্তি জাজ্জ্বল্যমান আদিত্যকিরণের মত বিস্তারিত হোক জগতে। তোমার তীক্ষ্ণধার অস্ত্র উঠে আসুক নারীশক্তি রূপে। তোমার শাশ্বত বাৎসল্যময়ি মূর্তি হোক নারীর আদর্শ। এই ভাবদ্বয়ে ভাবমন্ডিতা হয়ে নারী হয়ে উঠুক 'ভীষণে মধুরা'।।
খড়্গে নাশো অরিকুল কালী কলিহরা।
নাশো মৃত্যু নাশো ব্যাধি বরাভয়করা।।
কালীদাস পদে পদে সেইপদ কয়।
যেপদে বিপদমাত্রে পদরক্ষা হয়।।
No comments:
Post a Comment