Thursday, March 15, 2018

#নিষিদ্ধ_যাপন #পঞ্চম_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা



__________________________________

টানটান বিছানা, জানলার ওপারে সমুদ্রের গর্জন। তার সাথে পাল্লা দিয়ে অমানুষিক কামের আশ্লেষ আহ্বানের শব্দরা ধরা দিচ্ছে না মানে বোঝার জন্য। উপর নীচে দুই মত্ত শরীর। ঘন মুহূর্ত ঘন নিঃশ্বাস । ঘামের ফোঁটা নাকের ডগায়, নাক ঠোঁটের মাঝে জমে উঠেছে । উন্মুক্ত ঠোঁট, হাতের বাঁধনে শরীর তীব্র সুখের সন্ধানে অলিগলি খুঁড়ছে অন্ধ হয়ে।

“ ওহ্ কাম অন মাদারফাকার! ”

লহমায় ঠান্ডা হয়ে গেল উপরের শরীর, সাম্রাজ্য বিস্তার করছিল যে। খাট থেকে নেমে, সোজা হয়ে দাঁড়ালো, মাথা নীচু। বিছানায় ছটফটে অপর শরীর শ্বাস টেনে টেনে  তখনও

“ ওহ্ সন অফ বিচ , কাম, কাম। নিড ইউ। ”

সাঁড়াশী হাতের মোহে ধরা দিল বালিশ, চেপে ধরল শ্বাস টানা শরীরের মালিকের মুখে।

গোঁ গোঁ গোঁ… টান টান শরীর।

দাঁতে ঠোঁট চেপে শেষবারের মত গলির উৎসমুখে গেঁথে বন্ধ করে দিল চাওয়া পাওয়ার দরজাটা। ঠোঁটের নোনতাস্বাদ জিভ ছুঁলো।

_________________________________

দরজার তালাটা টেনে দেখে মেহুল চাবিটা আলতো হাতে রুমালে ভালো করে মুছে শুইয়ে দিল বাগানের একটেরে থাকা সাদা গোলাপের ঝরে পড়া পাপড়ির নীচে। বেরিয়ে যেতে যেতে একবার বাড়ির দিকে তাকালো মেহুল। ঐ যে দক্ষিণমুখী ঘর, দোতলার বক্স খাটে ঘুমিয়ে আছে অন্ব, অন্বয়ী। মায়ের মত করে একই ভঙ্গিতে একপাশ ফিরে। নিজে শুইয়ে রেখে এসেছে, কাল প্রচন্ড পরিশ্রম গেছে, পরিশ্রান্ত মানুষ তো!! ঘুমোক। মাছিরাও বিরক্ত করতে পারবে না এমন ঘুম ঘুমোক। বাবা মারা যাওয়ার পর শীতের শেষ মাঝরাতে ঘুমচোখে মায়ের পরিশ্রান্ত মুখে স্বেদবিন্দু তাকে উত্তেজিত করেছিল, পরম যত্নে মাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল সে। পাশ ফিরিয়ে চাদর চাপা দিয়ে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে পাড়ি দিয়েছিল অচেনা শহরে। আসার আগে জ্যেঠুর দরজার চিলতে ফাঁক দিয়ে আলোর ভার অন্ধকার বয়ে আনছিল। এক শহরে বেশিদিন টিঁকতে পারে নি, শহর থেকে অন্য শহরে যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াত। পালিয়ে বেড়াত। “ বেচারা বাবাটা, তার কিছুই ছিল না নিজের। ” সম্পর্ক চায় না সে,  শরীরের গন্ধে তার অমোঘ নেশা ।

রাতের অন্ধকারের অতিথি অন্বয়ীর শঙ্করপুরের শঙ্খমালা বাড়ি থেকে দিনের আলোয় পরিচিত পায়ে হেঁটে ফিরছে। সোনা রোদ ছুঁচ্ছে বুক, পিঠ ।

“ ওঁ জবা কুসুম সংকাশং… ”

আচ্ছা সে অপরাধ বোধে ভুগত কি ? সে তো অনুতপ্ত বোধ করেনি কখনো, এখনোও তো করছে না।

বাবা মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি  “ রক্তবীজ ” আউড়ে গেছে। মনে পড়ে।

শেষ রাতের জয়ী পরাজিত হ্যাঁ দুটোই তো সে, সেই ‘ মাদাররর্ ফাকারর্ ’টা

ফিরছে নিজের অতিথি শালায়, অন্বয়ীর শঙ্করপুরের বাড়ির অতিথি এখন ফিরছে। যেখানে রম্যাণী আছে, শাওন আছে, আর আছে ক্যাফেতে আসা সেই মানুষটা। সেই মানুষটার টানেই ফিরছে। একবার জিজ্ঞেস করতেই হবে

“ ক্যাফেতে কি করতে আসেন ? ”

হয়ত দেখা হয়ে যেতে পারে দুজনে কোনো একদিন অতিথিশালার সোফায়, চেয়ারে টেবিলে, খাটে, ছাদে । অনুভবে বাঁচা হয়ে যেতে পারে এক একটা দিন রাত।

__________________________________

রম্যাণী সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে এই সাতসকালেই মেহুলের দিকে। বর্ষীয়ান পুলিশ অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করছেন অন্বয়ী মল্লিকের মার্ডারকেসের। শঙ্করপুরের তার বাগানবাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে মৃতদেহ। তার সেক্রেটারি ডায়েরি করেছে। ফোনের কললিস্টের নাম্বার ধরে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। লাস্টের দুটো নাম্বারের আগে মেহুলের নাম্বার। আজ ক্যাফেতে কাস্টমার নেই। রম্যাণী, মেহুল ও পুলিশ অফিসার। সন্তুষ্ট পুলিশ অফিসার থানায় ডেকে পাঠানোর আদেশ দিয়ে মসমসিয়ে জিপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

রম্যাণীকে খোলা বুকে টেনে নিতে নিতে বড় করে শ্বাস ফেলল মেহুল। মুখে ক্লান্তির ছাপের ভান রেখে রম্যাণীর ঘন চুলে নাক ডুবিয়ে নিশ্চিন্ততা অনুভব করতে লাগল। ভাগ্যিস, দুজনের ফোন যাওয়ার আগের দিন থেকেই এই শহরের ঘরে একলা শুয়ে বিশ্রাম নিয়েছে।

দরজা ঠেলে ঢুকল ক্যাফের নিশ্চুপ প্রথম মানুষ। আজ আর কোণের চেয়ারে গিয়ে বসল না। এগিয়ে এল মেহুলের দিকে, ঝুঁকে পড়ে হ্যান্ডশেক করল। মেহুলের শরীর ঝটকা লাগল তার গভীর চোখের দিকে তাকাতেই। মানুষটা হেসে বেরিয়ে গেল দরজা ঠেলে।

চলে যাওয়া মানুষটার থেকে চোখ সরিয়ে নিতে নিতেই বেজে উঠল মেহুলের ফোন

“ বনমালী তুমি, পরজনমে হইও রাধা ।”

ফার্নিচারের দোকান থেকে কল।

রম্যাণীকে বুক থেকে সরিয়ে ফ্রেশ হতে ঢুকল বাথরুমে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুখে জলের ঝাপটা দিতেই পিছনে ওরা কারা সব ?

অল্পবয়সের জ্যেঠু, যৌবন বয়সের জ্যেঠু, মধ্যবয়সের জ্যেঠু একে একে একে পেছন থেকে শরীরে মিশছে। সবশেষে দাঁড়িয়ে একটু আগে চলে যাওয়া মানুষটা। হাতের ফোনটা মেহুলের ফোনের পাশে রেখে মেহুলের শরীরে মিশে যাওয়ার আগে টের পেল তার মাথা ঘুরছে কারণ

এ তো এ তো প্রৌঢ় জ্যেঠু , যার মত দেখতে তাকে। প্রৌঢ় হলে তাকে এমনিই দেখতে হবে হয়ত। শরীরে মিশে গেল প্রত্যেক বয়সের  জ্যেঠু। মেহুল হাত বাড়াল তার ফোনের পাশের ফোনটার দিকে, কিন্তু কোথায় ফোন ?

শুধু মেহুলের ফোনটাই একলা পড়ে আছে। তার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে  ?

ফোনটা আবার বেজে উঠল।

মনে পড়ল জ্যেঠুর ভীষণ প্রিয় ছিল গানটা, কবে যেন তার পছন্দের গানের লিস্টে মিশে গেছে এই গানটা খেয়াল করা হয়নি।

আয়নায় ঘুষিটা বসাতে বসাতে মেহুল চিৎকার করে উঠল

“ বাবা  ,  সন অফ বিচ হেয়ার। রক্তবীজ হেয়ার বাবা। ”

(সমাপ্ত)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860091930837317&id=707552542757924

#নিষিদ্ধ_যাপন #চতুর্থ_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা



তিনজনে প্রায় একই বছরে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গেল আগে পরে । মেহুলের  একেক সময় হিংসে হয়, একেক সময় আনন্দ। মিশ্র অনুভূতিতে ভাসতে ভাসতে তার শরীর উত্তপ্ত হতে থাকে।  কাউকে পাশে বসিয়ে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।

ফোনটা বেজে উঠল।

অন্বয়ী ফোন করেছে । অন্বয়ী মল্লিক, ফ্যাশন ডিজাইনার। আপাতত অন্বয়ী তার ছোট্ট ক্যাফেতে ইনভেস্ট করতে রাজী , চল্লিশ শতাংশ লাভের বিনিময়ে।  ক্যাফেটা ভালো করে সাজাতে চায় সে। একটা বেতের সোফাসেট কিনবে, আরেকটা কফি মেশিন, বেশকিছু জিনিসও।

এতদিন অন্বয়ীর সাথে অনলাইনে মেল চালাচালি করে কথা হয়েছে। এবার সামনে গিয়ে কনভিন্স করতে হবে। ফোনটা রিসিভ করে সে।

“ আমি কি মিস্টার মেহুলের সাথে কথা বলছি , অন্বয়ী মল্লিক হেয়ার।”

হাস্কি গলার আওয়াজে কাটা কাটা বাক্য ভেসে আসে।

মেহুল সোজা হয়ে বসে।

ব্যবসায়িক কথা চলতে থাকে।

জীবন চলে। সপ্তাহ আসে যায়।

মেহুলের সাথে ক্যাফের আগন্তুকের দেখা চলতে থাকে। এগিয়ে এসে কথা বলা হয় না এই যা। রম্যাণীও আসে প্রায় প্রতিদিন , বিনা শর্তে মেহুলের হাতে হাতে সাহায্য করে। একটা কিন্ডারগার্টেনে অতিকষ্টে চাকরিও জোগার করে নিয়েছে। স্বামী কোনোদিন ফেরে ঘরে কোনোদিন ফেরে না। তাকে উৎখাত করেনি। দুজনের দেখা হয় না একছাদের নীচে থেকেও। রম্যাণী এই বিষয় নিয়ে দুঃখও করে না। মেহুল মাঝে মাঝে ভাবে মানুষ কত অদ্ভুত , অভ্যাসের বশ হয়ে গেলে সেই জীবন নিয়েই বেঁচে থাকে। রম্যাণীর ব্যক্তিত্ব আকর্ষণ করে তাকে , চুম্বকের মত।

তবে এখন রম্যাণীকে অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। কেমন যেন একটা সম্পর্কের নাম দিতে চায়। নামহীন সম্পর্কের মাধুর্য হারাবে নাম পেলে, যেন বুঝতেই চায় না। সম্পর্কের নাম হলেই সেটাতে উৎসাহ হারাবে মেহুল। ঠোঁটের কোণে পাতলা হাসিটা ফিকে হয়ে আসে।

অন্বয়ী মল্লিকও কম যান না। তাঁর অফিসে বেশ কয়েকবার গেছে সে, আমন্ত্রণ জানাতে তিনিও এসেছেন, ক্যাফে ঘুরে দেখে গেছেন। রূপান্তরকামী মানুষরা হেলাফেলার চরিত্র হন না তা বোধহয় অন্বয়ী মল্লিককে দেখলে বোঝা যাবে। ঝজু শরীর, দৃঢ়চেতা মন, কমকথার মানুষ।

রম্যাণীর উপর নেশাটা কমে আসছে মেহুল টের পায়, গোলাপ সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে গেলে যেমন কুঁড়ি খোঁজে মন, কিংবা অর্ধপ্রস্ফুটিত কুঁড়ি। ঠিক তেমন ভাব নিয়েই মেহুল আকৃষ্ট হচ্ছে অন্বয়ীর উপর। অস্থির বা বিরক্তিতে ল্যাপটপে আঙুল ঠোকা, সিগারেটে টান দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকানো, জুতো ট্যাপ করতে থাকা।

না না না! তার এ কী হচ্ছে ? সে মানুষ থেকে কী অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। কেমন করে সব মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে সে ? প্রশ্নরা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়।
নগ্ন হয়ে আয়নায় চোখ রাখলে কি নিজেকে চেনা যায় ? প্রায়ই এই সম্পর্কহীন মানুষটা জলবিন্দুর কাম, প্রেম মেখে আয়নার সামনে দাঁড়ায় । রেখায় রেখায় আঙুল রেখে পূর্বসুরী খোঁজে। জেঠু না বাবা ? ঘুসিতে চিড় খেয়ে যায় কাঁচ প্রায় প্রতিদিনই, প্রতিদিনই নতুন কাঁচ আসে।

এখন বড় অপ্রেমিক লাগছে নিজেকে। শিকড়টা খুঁজে পেলে কালঘুম ঘুমানোর আগে শান্তির পরত লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত । তা কি করে সম্ভব !!  এখনকার বাড়িতে গরাদ হয় না, কালো আলকাতরা লাগানো লোহার শিকের গরাদ। হয় না কড়িকাঠ। আধুনিক ছাদের গা জুড়ে নেমে আসে কৃত্রিম নকসী রাত, চাঁদ, তারা। বাল্বের উজ্জ্বলতা ধার নিয়ে 
নির্ঘুম চোখে জ্বলজ্বলে কৃত্রিমতা নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। আজকাল মেহুলের আকাশ দেখতে ইচ্ছে করলেই ছাদে উঠে শোয়। গরমকালে মাদুর পেতে, শীতকালে স্লিপিং ব্যাগ। ঘন নীল আকাশে, কাস্তের ধারের মত একফালি চাঁদ, চারদিকে ছড়ানো তারার আতসবাজির ফুলকি। আকাশের তারায় আপনজনেরা ঘর বানায়, মা কখনো বলেনি, বরং মা বলতে মনে পড়ে আকাশের কালপুরুষকে। মা বলতে মনে পড়ে মিঠাপাতি পান ছেঁচার গন্ধ, মা বলতে মনে পড়ে বৃহস্পতিবার আলতার ছাপ ফেলা জলছাপ বিছানার চাদরের কোণায়, মা বলতে মনে পড়ে শাড়িতে হলুদ রঙের হাত মোছার দাগ।

__________________________________

বেশ কদিন কেটে গেছে। রম্যাণী এখন নিয়মিত আসে, কপালের সিঁদুরের টিপটা তিরছে দাগ টেনে নিষিদ্ধ ডাক ডাকে মেহুলকে ।  ঠোঁট শুকোয় , বুক শুকোয় তেষ্টায়। গলা অবধি তেষ্টাটা ঢোঁক গেলে। ঘন কাজল চোখের গভীর ডাককে অস্বীকার করতে পারে না মেহুল । অতিথিশালা এখন রম্যাণীকে চেনে , প্রায়ই তাপ মাখে যে। মেহুল  একেকসময় অতিথিশালাকে মানুষ ভাবে। যে  উদার হৃদয়ের মানুষ। যে আসুক তাকে কর্পূর জল দেবে , বাঁচার জন্য পাত সাজিয়ে রসদ দেবে, খানিক পুঁটুলি বেঁধে দেবে আগামী দিনের জন্য । একেকসময় অতিথিশালার দেওয়ালের সাথে ঝগড়া করে , কথায় বলে না ওদের তো কান আছে। ফিসফিসে ঝগড়া, ঘ্যানঘেনে ঝগড়া, পিঠ দিয়ে বসে কথা চালাচালি সবরকমই করে যায় মেহুল।

আচ্ছা এ কেমন মানসিকতা !!  ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষের ঠোঁটের উপর চোখ আটকে যায়, কামনার অঙ্গ তীক্ষ্ণ সজীব হয়ে ঠোঁট চাটে। লিঙ্গভেদ মানে না, হাতের মুঠোয় ধরে গলায় মুখ ডুবিয়ে গন্ধে মাতাল হতে ইচ্ছে করে। তবে কি পাগল হতে অল্পই বাকি, মেহুলের নিজেকে নিয়েই ধন্ধ জাগে।

থুতনিতে তিল , শাঁওলা রং, গ্লসি লিপস্টিক, কানে, নাকে স্টাডে মেহুলের চোখ মুগ্ধতা নিবেদন করে চলেছে টেবিলের এপার থেকে। ঘুরন্ত চেয়ারে অস্থির ব্যক্তিত্ব।

“ সাচ এ সন অফ বিচ, ফাক ”

অন্বয়ী মল্লিকের মুখ থেকে শব্দটা যেন ছিটকে এল। চমকে মেহুল ভাবনা সামলাতে সামলাতে পিছিয়ে গেল। তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে না, ফোনেতেই কার উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করেছেন। আগুনের ফুলকির মত ছিটকে এসে মেহুলের নরম চামড়ায় আটকে গেল। এই নোংরা শব্দটা তাকে দুর্বল করে দেয় জাড় থেকে। অন্ধকারে মুড়ে যায় ভেতরটা, মনের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হতে থাকে বাবার গলা। ঘরের ঠিক মাঝখানে ফুটে ওঠে ছোট মেহুলকে বুকে জড়িয়ে মাতৃমূর্তি। দরজার ওপারে জ্যেঠুর গলা,

 “ ভুল বুঝছিস ভাই , ভুল বুঝছিস ”।

কখনো কখনো মাতৃমূর্তিটা পুরুষ মূর্তিতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। গর্জানো পুরুষ মানুষটা  একই থাকে।

বাচ্ছা মানুষটার দিকে আঙুল তুলে পুরুষ মানুষটা চেঁচায় “রক্তবীজ, রক্তবীজ”

অতীত ভেসে আসে সময় উজান বেয়ে। দেওয়ালের ঠান্ডা বুকে নিজেকে না মেশালে মেহুলের এই অতীত ঘরটা হারায় না। হারায় না একটা তীব্র জ্বালা। ঘর থেকে ক্যাফে যাওয়া আসার পথটুকু হেডফোনের নরম আব্রুতে ঢাকা থাকে কান, যাতে কোনোভাবেই না কোনো নোংরা শব্দ একদিনের মত স্তব্ধ করে দেয়।

(ক্রমশ...)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860089917504185&id=707552542757924

#নিষিদ্ধ_যাপন #তৃতীয়_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা



রম্যাণীর ভ্রূ ধনুকে টঙ্কার দিয়ে ওঠে মানে তেমনই লাগে মেহুলের। বুকের মরীচিকা , মরুভূমি হয়ে যায় নিমেষে। রম্যাণী দ্বিতীয় কুকিটা ভাঙে না, ক্লান্ত ভঙ্গিতে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসে। মেহুলের চোখে কি যেন  পড়ে, আঙুলরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রাত গভীর হয় , ক্যাফে ফাঁকা হতে থাকে। নটা বাজতেই চত্বর ফাঁকা। মেহুল প্লেট গুছিয়ে ফেলে ডাস্টবিনে। খুচরো গোনে নিঃশব্দে।  রম্যাণী দেওয়ালে মাথা হেলিয়ে বসে থাকে।
নীরবতা অগভীর আঁধারে পা দিয়ে ঢেউ তোলে।

মেহুল ক্লোজড বোর্ডটা ঘুরিয়ে দেয় । ধীর পায়ে হাত কচলে রম্যাণীর পিঠের পিছনে দাঁড়ায়। নারীর শরীর কাঁপছে। মায়ের শরীরও কাঁপত চাপা কান্নায়। আস্তে করে হাত রাখে হলুদ ফর্সা কাঁধে, বড় চেনা অকাল বর্ষণের আভাস ।
টেবিলে লুটোয় ক্লান্ত নারী, সাদা মেঝেতে আঁচল লুটোয়।
শ্রীফল ছুঁয়ে যায় টেবিলের ধার।

নারী আশ্রয়ের নামে বুক চায় , বাঁধভাঙা কান্নায় ভাসাতে। আক্রোশের কামে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে।

শাটার নামে । বন্ধু-পুরুষের বুক ঘেঁষে নারী অতিথিশালায় পৌঁছয়। কালো সোফা নগ্নতা ঢাকে নীল ভেলভেট চাদরে ।
রাতের বাঘিনী রক্তের স্বাদ ঠোঁটে মাখে।

সকাল আসে নিয়ম মেনে, বিছানায় দুটি শরীর, এক শরীর পাশ ফিরে শুয়ে থাকে চোখে হাত চাপা দিয়ে, অন্য শরীর তাকিয়ে থাকে ও শরীরের দিকে। এদিকের শরীর ওঠে, ক্লান্ত বাঘিনীর মেরুদন্ডের উপর ঠোঁট ছোঁয়ায়, কেঁপে ওঠে সে শরীর।

রাত কাটে।

শনিবার সকাল -

মেহুল বিছানা ছেড়ে পা রাখে মেঝেয়। মেঝে জুড়ে অবিন্যস্ত পোশাক। খাটের গায়ে আধা শাড়ির আঁচল, বাকি মেঝের লজ্জা বাড়ায়। আপনমনেই হেসে ওঠে সে।

শরীর ভোগের নেশাটা বাড়ছে মেহুলের।

সূর্যের  ছোঁয়ায়  নগ্ন ভেনাস অন্য সৌন্দর্য। দেখতে দেখতে মেহুল ধীর পায়ে বাথরুমে ঢোকে। ব্রাশের সাথে কথা সেরে শাওয়ার চালিয়ে দেয়।
শরীর জুড়ে কলঙ্কের দাগ মেহুলের আজ। সারা শরীর জুড়ে অন্য শরীরের গন্ধ, পিঠে নখের আঁচড় চিড়চিড় করে জ্বালা করে।  নিজেকেই আলিঙ্গন করে ভিজতে থাকে মানুষটা।

একসময় শেষ হয় স্নান। আজ জবা ফুল ছাড়াই সূর্যের দিকে হাত জোড় হয়,
দীর্ঘ ওঁ কার ধ্বনি,
" ওঁ জবাকুসুম... "

জবা গাছে আজ ভ্রুণ অনেক বেশী। কেউ আলগা বাঁধনে , কেউ ঠিক ঠাক, কেউ বাঁধন ভাঙা । পাতার ভেতর অংশ কুরে কুরে খেয়েছে পোকা , কুঁকড়ে গেছে। ঠিক যেন মায়ের সাথে তার সম্পর্কটা। সম্পর্কের ঘূণ পোকার মতই মনে হল মেহুল।

আজ অনেকগুলো ভ্রুণ সহ ফুটে থাকা ফুল ঝরে পড়ল প্রভুর পায়ে। তুলল না মেহুল, বরং পিছোতে লাগল জবা গাছের দিকে তাকিয়ে। ঘরে ঢুকে দেখল রম্যাণী প্রস্তুত তার স্বামী পরিত্যক্ত পাখির বাসায় ফিরে যেতে। আজ অনেক সামলে গেছে মানুষটা। সব মানুষের একটা সময় ভরসার জায়গা লাগে, যাদের থাকে না তারা দেওয়ালে পিঠ রাখে। মেহুলের হাত রম্যাণীর গাল ছোঁয়, কপালে ছোঁয় ঠোঁট । রম্যাণী আলিঙ্গন করে না , বাথরোব এক হাতের মুঠোয় ধরে থাকে।

রম্যাণী বেরিয়ে যায়, সভ্য সোফা নগ্ন হয়। গা এলায় মেহুল , নিজের দুই হাত উল্টে পাল্টে দেখে। তার হাতের তালু লালচে, মায়ের মত।  স্বভাবটাও বোধহয় মায়ের মত। হাত মুঠো করে, মুঠো খোলে। মনে পড়ে এই হাত ছুঁয়েছিল রম্যাণীর নোনতা স্বাদের চিবুক, পিঠ, হাত । আঙুল ছুঁয়েছিল ঠোঁট, কপাল থেকে ঝোড়ো চুল সরিয়ে ঠোঁটেরা মিলিত হয়েছিল। সঙ্গমে শীৎকার ছিল, অভিশাপ ছিল, অধিকার বোধ ছিল , দাবি ছিল না।  যেন মৈথুনরত মানুষেরা জানতই সকাল মানেই সীমান্ত পাঁচিলের গায়ে রোদ পড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠা।

ব্ল্যাক কফি নিয়ে বসে মেহুল , আজ ছুটি । সেই সন্ধ্যায় বেরোতে পারে একটা দরকারে, ইচ্ছে না হলে নাও বেরোতে পারে।

মায়েরও হাত লালচে ছিল, রাতে শুতে আসার সময় মনে হত আরও লাল হয়েছে। হাত বুলিয়ে দিত ছেলের ঘুমন্ত কপালে। চুলে বিলি কেটে দিত। পাশের ঘর থেকে গজরানি শোনা যেত। অসহায় মধ্যবয়সী পুরুষের গর্জন। মেহুল অনুভব করত মায়ের ঘামে ভেজা শরীর একই সাথে ঠান্ডা আবার উত্তপ্তও। কাল রম্যাণীর শরীর জুড়ে তেমনই ভাব খেলা করেছে। প্রতি ঝড়ের পর শান্ত হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলো প্রিয় হয়ে থাকবে সারা জীবন।

মেহুলের হঠাৎ চোখে পড়ে তার বাড়ির গেট খুলে ঢুকছে ক্যাফেতে দেখা প্রতিদিনকার মানুষটা ।

এখানে?

মেহুলকে অনুসরণ করছে নাকি!!  অনুসরণ করে পৌঁছে গেছে তার বাড়িতে ?

মেহুলের চোখ স্থির হয় মানুষটার উপর। মানুষটা চিরপরিচিত ঢং-এ জবাগাছের কাছে যায়, গুঁড়িতে হাত বোলায়। কুঁকড়ে যাওয়া পাতায় আঙুল বুলিয়ে আদর করে।মাথা ঠেকায় জবা গাছে। ফোনটা বেজে ওঠে। তার চোখের সামনে দিয়েই মানুষটা মাথা নীচু করে বেরিয়ে যায়।

মেহুল সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্ল্যাকবোর্ডের পাশেই রাখা থাকে বাহারি কাঁসার পাত্র। জল টল টলে, তলদেশে রঙিন কাঁচের মত দেখতে পাথর। পাত্রের উপর ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মেহুল।  নিজেকে চিনতে চায়, তাই বোধহয় বার বার ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে। প্রতিদিনের রুটিন তার ঘষে ঘষে মোছা ব্ল্যাকবোর্ডটা, ঝুঁকে দেখা নিজের প্রতিবিম্ব। মনে হয় মুখের একপাশ জেঠুর, অন্যপাশ বাবার । ভ্রু কুঁচকে ওঠে তার বিরক্তিতে ,  ক্লান্তিতে সোজা হয়।

চোখ পড়ে  যায় জর্জিও জ্যাকোবিডসের আঁকা ফার্স্ট স্টেপ ছবিতে। যদিও এই ছবির দুটি ভার্সন, এখানে প্রথম ছবির নকলটি সাজানো। বৃদ্ধ মানুষটি ছোট্ট নাতনিকে টেবিলের উপর হাঁটা শেখাচ্ছেন, অন্য প্রান্তে শিশুটির বড় দিদি বোনকে ধরে ফেলার মত পোশ্চার নিয়ে অপেক্ষারত। তার ছোট থেকে কিশোরবেলা সবটাই বিপত্নীক জেঠুর কোলে কোলেই কেটেছে। বেশ বড় অবধি দেখেছে জ্যেঠু বুড়ো হয়ে যেতে , বাবার সামনে কোলকুঁজো হয়ে যেতে।

জ্যেঠুর  মতই লালচে ফর্সা, আয়ত চোখ, টানা চোখের পাতা তার। অল্প কালো রেখা টানলে চোখ দুটো স্পষ্ট ইশারা করে। এই অভ্যাসটাও জেঠুর থেকেই রপ্ত করেছে সে। সকালে আচমন পুজো সেরে পায়রার পালক কাজলে ডুবিয়ে চোখে রেখা টেনে নিয়ে তবেই ঘর থেকে বেরোতে। সেসময় বাচ্ছা মানুষটা দরজায় পর্দা ধরে উঁকি দিত। জ্যেঠু বেরিয়েই তার হাত ধরে কাছে টেনে নিত। ভেজা ভেজা চন্দনের গন্ধ,  চন্দন মাখা প্রশস্ত বুকেতে।

একবার কে এক পিসি ঠাকুমা এসেছিল তাদের বাড়ি , খুঁটিয়ে দেখে মেহুলের গালে ঠোনা মেরে বলেছিল

“ আ মোলো যা , এ ছোঁড়া বিপ্রর মত দেখতে হইছে লা। বংশ বংশ! বংশের ব্যাটা অমনই দেখতে হবেই তো।”

বিপ্রদাস ছিল জেঠুর নাম।

বাবা রেশনের থলি নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

জ্যেঠু চেয়ারে দুলতে দুলতে বই নামিয়ে রেখে অপ্রস্তুত হাসি হেসেছিলেন। মায়ের মুখটা দেখা হয়নি মেহুলের , তাই জানে না কি ভাব খেলা করেছিল।

(ক্রমশ...)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860086967504480&id=707552542757924

#নিষিদ্ধ_যাপন #দ্বিতীয়_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা



বন্ধ দরজা ঠেলে ঢুকছে প্রথম মানুষ ,  দিনের দ্বিতীয় মানুষ। একে ঠিক বোঝে না মেহুল , মানুষটা আসে , এক কোণে হলুদ চেয়ার টেনে বসে। মেহুলের দিকে গাঢ় চোখে তাকায়।  মেহুল মেলাতে না চেয়েও মিলিয়ে ফেলে মানুষটার সমুদ্রের মত গভীর চোখে। মানুষটা অবিকল একই সুরে টেবিল বাজায়, তারপর একটা ফোন আসে, প্রতিদিনই একই সময় বেজে ওঠে ফোনটা। রিংটোনটার মধ্যেই একটা নিশ্চুপ নেশা আছে টের পায় মেহুল।

“ বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা… “

মিনিট দশ থাকার পর মানুষটা জুতো খটখটিয়ে বেরিয়ে যায়। দিনে একবার করেই রোজ দেখা হয় এর সাথে। অদ্ভুত না ?

আজ শুক্রবার। আজ রম্যাণীর আসার কথা। মেহুলের সাথে কিছু সময় বেক ও কবিতায় কাটানোর কথা। তার রম্যাণীকে ভালো লাগে, স্বপ্নসুন্দরী যেন। রম্যাণী  আদ্যোপান্ত ' হোম মেকার ' । চ্যাটার্ড অ্যাকাউন্টেট স্বামীর সাথে এ শহরে আছে। নিঃশ্বাস নেয়, রাঁধে। ছুটি কাটায় মেহুলের ক্যাফেতে । প্রতি শুক্রবার আসে , সঙ্গে আনে জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

' হোম মেকার '
মা হোম মেকার ছিল ? ছিলই তো। দরজা খুলে দেওয়া থেকে শোবার ঘরের চাদর একদিকের খাটের পাশে হেলে পড়া সবই মায়ের আয়ত্তে।

প্রথম দিন ব্ল্যাক ফরেস্ট পরিবেশন করতে গিয়ে চোখ  পড়ে গেছিল রম্যাণীর হাতের খোলা বইয়ের পাতায়

" ভালোবাসা নিয়ে কত বিবাদ করেছো!
এখন, টেবিল জোড়া নিবন্ত লন্ঠনও সহনীয়।সহানুভূতি। সবজির মতন বিকোয় না হাটে। হাত কাটে, না রক্ত পড়ে না। বিভীষিকা! দুচোখের পক্ষেও নড়ে না।
প্রজড় পিন্ডের মত আছো- আজই বিবাদ করেছো।ভালোবাসা নিয়ে কিছু বিবাদ করেছো, কাতর পাথর মিছু বিবাদ...  "

চোখ তুলে দেখার সময় মেহুল দেখেছিল
সেদিন রম্যাণীর চোখের কোণ লালচে, সজল চোখে ধেবড়ে যাওয়া কাজল।
পরে পরে মেহুলের চোখ পড়েছে নাকের উপর বসানো চশমার আড়ালে চোখের পাতায়, ব্যক্তিত্বে, তার জীবন উপন্যাসে। প্রত্যেকটা জীবন একটা একটা উপন্যাস, কোনোটা খোলা কোনোটা বন্ধ। বন্ধুত্ব করে নিয়েছে মেহুল রম্যাণীর সাথে। এখন ও আর রম্যাণী সুন্দর সন্ধ্যা কাটায়, সপ্তাহে একদিনই যদিও। কবিতা আওড়ায়, আঙুলের ভাঁজে শূন্যতার আঁক কষে, আর…. বেক করে। কখনো কখনো গানও গায়।

কাঁচের দরজায় লটকানো ক্লোজড বোর্ডটা ঘুরিয়ে দেয় মেহুল । ওদিকে তিনটে হলুদ হাসিমুখের সাথে ওপেনড লেখা।  এবার শুরু হবে মানুষ আসা, ক্রেতা আসা। কেউ হাত ধরে, কেউ পাশে হেঁটে, কেউ হাত ঝুলিয়ে একলা।, পিঠে ক্লান্ত ব্যাগ।

মেহুল প্লেট প্রস্তুত করে, কাঁটা চামচ গুছিয়ে রাখে। ফ্রেশ বেকড খাবারগুলো সাজায়, দামের ট্যাগ বসায়। ছোট্ট মেনু কার্ড বসিয়ে আসে টেবিলে টেবিলে। দুজন স্কুল ছাত্রী কাঁচের দরজা ঠেলে ঢোকে। দিন শুরু হয়ে যায়।

দুপুর গড়ায়। সন্ধ্যা নামে, পড়ন্ত সূর্যের আলো ক্যাফের কোণে কোণে পাতাবাহারি গাছের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে কুকিজের কাঁচের বয়ামগুলোর ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে। এমন সময় দরজা ঠেলে পা রাখে রম্যাণী। আজ পরনে কালো খেসের শাড়িতে রক্তাভ সূর্যের রথ। চোখে গোল ভারী ফ্রেমের চশমা, চশমার ওপারে গাঢ় কাজলটানা। ঠোঁটে ম্যাট ফিনিশড লিপস্টিক। আজ হাতের অলংকার একটা কাঠের চুড়ি, বুকের মাঝে রূপোর দূর্গা। ওকে দেখে মেহুলের মনে পড়ে গেল সেই কবিতাটা, যেটা পরশু গভীর রাতে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিল।

সেই হাত

অভিনব দুটি হাতে দেয়াল দরোজা খুলে দাও। ততক্ষণে রোদ্দুর পৌঁচেছে গোটারাত ঘুরে ঘুরে রোদ্দুর পৌঁচেছে ঘরে।
কিছুটা নড়বড়ে ছিলো ঘর। এককোণে পাথর তেমন সন্তুষ্ট নয়, দখল দখল শব্দ করে।
দাবি তার ঘরটি ভরাবে মানুষের মাথায় চড়াবে তার ভার। আর যদি পারে গিলে খাবে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে...
- শক্তি চট্টোপাধ্যায়

হ্যাঁ, ওর অতিথিশালায় একটি ব্ল্যাকবোর্ড আছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁ পাশে রাখা। নিয়মিত চকের আঁচড়ে ঘষা দাগের কলঙ্কে আবছা হয়ে থাকে। ডাস্টারও আছে বটে তবে মেহুলের নরম হাতটাই বেশি ব্যবহার হয় কলঙ্ক ঘষামাজা আবছা করতে। বহু পুরনো অভ্যাস এ।

রম্যাণী এসে দাঁড়ালো কাউন্টারের কাছে, মেহুলী যেখানে দাঁড়িয়ে তার খুব কাছে। স্নিগ্ধ চন্দনের গন্ধ ভেসে এল অভিসারের আমন্ত্রণ নিয়ে। চন্দনের গন্ধটা মাতাল করে মেহুলকে আজও। প্রতি ভোরে মায়ের গায়ে লেগে থাকত ঘামে ভেজা চন্দনের গন্ধ । বুকে কাঁধে লাল আধা গোল চাঁদ চিহ্ন।

কাউন্টারের তরফ থেকে চিনেমাটির বাটিতে দুটি ফরচুন কুকি অভিবাদন জানায় রম্যাণীকে। অভ্যস্ত হাতের চাপে মাঝ বরাবর ভাগ হয়ে যায় কুকি, বেরিয়ে আসে এক চিলতে রেশমী চিরকুট।
" আজ রাতের অভিসারে রাধারাণী "

(ক্রমশ...)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860086027504574&id=707552542757924

নিষিদ্ধ_যাপন (প্রথম পর্ব) ময়ূরী পাঁজা



গোল বাটি মোমবাতিটা নিভে গেছে। ঘরের মধ্যে উষ্ণতার আবেশ। কাঁচের জানালা বেয়ে পরদার ফাঁক দিয়ে টাটকা রোদ গড়িয়ে এসে উপুড় হওয়া পুরুষ পিঠে প্রগলভতায় লুটোপুটি খাচ্ছে। পিঠের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম ,  সকালের ঘাসের উপর শিরশিরে শিশির বিন্দুর মতই নিজেদের লুকোতে ব্যস্ত। না রোগা না মোটা পুরুষ মানুষটি উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। বিলম্বিত লয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে। পিঠে আধখানা চাঁদের মত নখের দাগে রাতের কলঙ্ক। কোমরের উপর পাতলা চাদর ঢাকা। পাশেই আরেকটি শরীর শুয়ে, চিৎ হয়ে। আলতো হাতে চাদরটা টেনে ঠিক করে দিয়ে রোদের প্রগলভতা দেখছে,  চোখে হিংসে চকচকে। হয়ত পিঠে মুখ গুঁজতে ইচ্ছে করছে !!  শ্বাস টানার শব্দে পুরুষ শরীরটি ঘুমিয়ে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে। এদিকের শরীরটি আলতো হাতে নিজেকে তুলে ও মানুষটির মুখ দেখে ,  নিঃশব্দে শিশুর মত ঘুমোচ্ছে। হাত মুঠো। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে এদিকের শরীরটি ফিরে আসে নিজের জায়গায়। উত্তেজনার ক্ষতে আঙুল বুলোতে বুলোতে নিঃশব্দে হাসে, গা শিউরে ওঠে রাত যাপনের সুখে।

ধরে নেওয়া যাক এদিকের শরীরটির নাম মেহুল , পুরোপুরি প্রেমে থাকা মানুষ। আয়ত চোখ, জোড়া ভ্রু , কামনা উদ্রেককারী ঠোঁট। আপাতত ঠোঁটের কোণে দাগ, নোনতা স্বাদ চুঁইয়ে পড়ে। পাশেই বেড সাইড টেবিলে অগুরু ধূপের ছাই এর পিরামিড। খাটের পাশে অবিন্যস্ত পোশাক, উল্টোনো চটি,  সুরক্ষার প্যাকেট।  একটা ডার্ক চকোলেটও , দাঁতের দাগ কাঁধে নিয়ে উপুড়। খাঁজ দেখে  প্রেমীর চোখ চকচকে হয়ে ওঠে। অন্যমনস্ক আঙুল খেলা করতে থাকে, কামড়ানোর দাগ বরাবর।

মেহুলের জন্মটা কেন হয়েছিল আজও প্রশ্ন করে বাথরুমের টাইলসকে, যেখানটায় প্রতিদিন শাওয়ার চালালেই জল ছিটকে ছিটকে যায়। জলের ফোঁটারা শান্ত হয়ে নেমে আসে গড়ানের দিকে। তাদের পাশে দুটো হাতের পাঞ্জা নরম ছাপ বসায়। জল শরীর বেয়ে নামে, উপত্যকা পেরিয়ে। বাঁধ না মানা আনন্দের লহর তোলে শরীর যন্ত্রে। শিল্পী আঙুলরা শাওয়ারের জলে সেতারের তার খোঁজে। তার ?  সম্পর্কের সুতো কিংবা তার একই গোত্রের। যন্ত্রের তার বাঁধা যায়,  সম্পর্কের তার সেই যে কাটে কোনো হাতের আদরেই বাঁধা পড়ে না। প্রেমী রোজ ভাবে , রোজ। তারপর নগ্ন দেহে সূর্যকে আমন্ত্রণ জানায় কুন্তীর মত। সেই একই উচ্ছলতা , একই মন্ত্র
" ওম জবাকুসুম শঙ্কাসন  কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং ধ্বন্তারিং সর্ব পাপয়ং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্  "

প্রণাম সূর্যদেব।

সূর্যদেব বুক ছুঁয়ে, আজকের মত কবচ পরিয়ে দেন জীবনী শক্তির। মেহুল একটা লাল টকটকে জবা বারান্দায় যেখানে রোদ পড়েছে সেখানে অর্পণ করে। চেয়ারের উপর রাখা থাকে পরবর্তী পোশাক। হালকা গোলাপী বার্থরোব । গলিয়ে নেয়, আলগা গিঁট্টু বেঁধে।  ছোট থেকেই গিঁট্টু বাঁধাটা গোলমেলে লাগে মেহুলের। গিট্টু মানে সম্পর্কের তার। কার পরে কি বা কার পরে কে ? জেঠুর পরে মা নাকি  বাবার পরে মা !!

হাতে জলের ঝারি নিয়ে মেহুল পা রাখে সবুজ ঘাসে ,  শিরশিরে অনুভূতি পায়ের তলা ছাড়িয়ে কোমর অবধি শিহরিত করে,  ঊর্ধ্বাঙ্গে সূর্যের রক্ষাকবচ। জবাগাছ কান্ড পাতা ভিজিয়ে স্নান করে। একটা একটা বোঁটা ভাঙা কুঁড়ি ভ্রুণ টুস করে পায়ের কাছে খসে পড়ে। মেহুলের তখন নিজেকে প্রভু মনে হয়। ভ্রুণ-টি কুড়িয়ে নিয়ে শোঁকে, বুকের কাছে বার্থরোবের তলায় চেপে রাখে। ফিরে আসে ঘরে। শুরু হয়ে যায় নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। একপেয়ালা সুগন্ধি সবুজ চা-এর নির্যাসে ঠোঁট ডুবে যায়। সাথে নিজ হাতে বেক করা ঝরঝরে কুকিস।

এই ঘরটা নিজস্ব, মেহুলের মায়ার কারণ। এ ঘরে কারুর কোনো ফটো নেই কোথাও , একেকসময় নিজের মনেই হাসে সে । যেন অতিথিশালা এটি , মেহুল সেখানে অতিথি। রাতের অতিথি। চা-পান সেরে মেহুল লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পোশাক পরে , চোখে আলতো কাজল পেন্সিল টানে । বোঝা না যাওয়ার মত।  বিছানায় পুরুষটির ঘুম প্রবল। মেহুল রোদটুকু আড়াল করতে পর্দা টেনে দেয়। মুখ অল্প হাঁ করে ঘুমন্ত মানুষটির গালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়েই সরিয়ে নেয় নিজেকে। কান উত্তপ্ত হয়ে উঠবে আর একটুক্ষণ ছুঁয়ে থাকলে।

ডাইনিং রুমের টেবিলে গোলাপী চিরকুটে চাবি রাখার নির্দেশ দিয়ে কিছু খাবার হটপটে রেখে মেহুল বেরোয় একটু দূরের তার ছোট্ট ক্যাফের দিকে। শাটার তোলে, কাঁচের দরজার ওপারে ক্লোজড বোর্ডটায় হাত বুলিয়ে সাফসুতরো করে নিয়ে অভ্যস্ত হাতে বেক করা শুরু করে। ছোট্ট হতে পারে , মানুষ আসে অনেক। মেহুল নিজের জায়গা থেকে দেখে তাদের। টাকা দেওয়ার সময় কারুর আঙুল সরু, প্ল্যাটিনামের আংটি বেড় দিয়ে থাকে, কারুর আঙুল সামান্য মোটা, স্টেনলেস স্টিলের আংটি, কারুর ঝুটো কিন্তু ভালোবাসা মাখানো আংটি অলংকৃত করে।  সবুজ ঘাসের শিরশিরে অনুভবটা এইবারে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মেহুলের শিল্পী আঙুল অস্থির হয়ে টেবিল ঠোকে, বেশ কিছু পরে একসময় সব শান্ত। ক্রেতার কথা বার্তা হাসি কিছুই কানে আসে না। আজ কিছু নতুন কেকের কথা ভেবেছে মেহুল , দেখা যাক। ইতিমধ্যেই ফ্রেশ বেকের গন্ধে ক্যাফে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে।

অস্তিত্ব ....  অস্তিত্ব!!  শিকড়!!   টান অথবা তার !!  বাবা না জ্যেঠু ? কার কার কার অংশ !!  নাকি কারুরই নয় । কার সাথেই তার মিল ?

( ক্রমশ ...)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860085590837951&id=707552542757924