__________________________________
টানটান বিছানা, জানলার ওপারে সমুদ্রের গর্জন। তার সাথে পাল্লা দিয়ে অমানুষিক কামের আশ্লেষ আহ্বানের শব্দরা ধরা দিচ্ছে না মানে বোঝার জন্য। উপর নীচে দুই মত্ত শরীর। ঘন মুহূর্ত ঘন নিঃশ্বাস । ঘামের ফোঁটা নাকের ডগায়, নাক ঠোঁটের মাঝে জমে উঠেছে । উন্মুক্ত ঠোঁট, হাতের বাঁধনে শরীর তীব্র সুখের সন্ধানে অলিগলি খুঁড়ছে অন্ধ হয়ে।
“ ওহ্ কাম অন মাদারফাকার! ”
লহমায় ঠান্ডা হয়ে গেল উপরের শরীর, সাম্রাজ্য বিস্তার করছিল যে। খাট থেকে নেমে, সোজা হয়ে দাঁড়ালো, মাথা নীচু। বিছানায় ছটফটে অপর শরীর শ্বাস টেনে টেনে তখনও
“ ওহ্ সন অফ বিচ , কাম, কাম। নিড ইউ। ”
সাঁড়াশী হাতের মোহে ধরা দিল বালিশ, চেপে ধরল শ্বাস টানা শরীরের মালিকের মুখে।
গোঁ গোঁ গোঁ… টান টান শরীর।
দাঁতে ঠোঁট চেপে শেষবারের মত গলির উৎসমুখে গেঁথে বন্ধ করে দিল চাওয়া পাওয়ার দরজাটা। ঠোঁটের নোনতাস্বাদ জিভ ছুঁলো।
_________________________________
দরজার তালাটা টেনে দেখে মেহুল চাবিটা আলতো হাতে রুমালে ভালো করে মুছে শুইয়ে দিল বাগানের একটেরে থাকা সাদা গোলাপের ঝরে পড়া পাপড়ির নীচে। বেরিয়ে যেতে যেতে একবার বাড়ির দিকে তাকালো মেহুল। ঐ যে দক্ষিণমুখী ঘর, দোতলার বক্স খাটে ঘুমিয়ে আছে অন্ব, অন্বয়ী। মায়ের মত করে একই ভঙ্গিতে একপাশ ফিরে। নিজে শুইয়ে রেখে এসেছে, কাল প্রচন্ড পরিশ্রম গেছে, পরিশ্রান্ত মানুষ তো!! ঘুমোক। মাছিরাও বিরক্ত করতে পারবে না এমন ঘুম ঘুমোক। বাবা মারা যাওয়ার পর শীতের শেষ মাঝরাতে ঘুমচোখে মায়ের পরিশ্রান্ত মুখে স্বেদবিন্দু তাকে উত্তেজিত করেছিল, পরম যত্নে মাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল সে। পাশ ফিরিয়ে চাদর চাপা দিয়ে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে পাড়ি দিয়েছিল অচেনা শহরে। আসার আগে জ্যেঠুর দরজার চিলতে ফাঁক দিয়ে আলোর ভার অন্ধকার বয়ে আনছিল। এক শহরে বেশিদিন টিঁকতে পারে নি, শহর থেকে অন্য শহরে যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াত। পালিয়ে বেড়াত। “ বেচারা বাবাটা, তার কিছুই ছিল না নিজের। ” সম্পর্ক চায় না সে, শরীরের গন্ধে তার অমোঘ নেশা ।
রাতের অন্ধকারের অতিথি অন্বয়ীর শঙ্করপুরের শঙ্খমালা বাড়ি থেকে দিনের আলোয় পরিচিত পায়ে হেঁটে ফিরছে। সোনা রোদ ছুঁচ্ছে বুক, পিঠ ।
“ ওঁ জবা কুসুম সংকাশং… ”
আচ্ছা সে অপরাধ বোধে ভুগত কি ? সে তো অনুতপ্ত বোধ করেনি কখনো, এখনোও তো করছে না।
বাবা মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি “ রক্তবীজ ” আউড়ে গেছে। মনে পড়ে।
শেষ রাতের জয়ী পরাজিত হ্যাঁ দুটোই তো সে, সেই ‘ মাদাররর্ ফাকারর্ ’টা
ফিরছে নিজের অতিথি শালায়, অন্বয়ীর শঙ্করপুরের বাড়ির অতিথি এখন ফিরছে। যেখানে রম্যাণী আছে, শাওন আছে, আর আছে ক্যাফেতে আসা সেই মানুষটা। সেই মানুষটার টানেই ফিরছে। একবার জিজ্ঞেস করতেই হবে
“ ক্যাফেতে কি করতে আসেন ? ”
হয়ত দেখা হয়ে যেতে পারে দুজনে কোনো একদিন অতিথিশালার সোফায়, চেয়ারে টেবিলে, খাটে, ছাদে । অনুভবে বাঁচা হয়ে যেতে পারে এক একটা দিন রাত।
__________________________________
রম্যাণী সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে এই সাতসকালেই মেহুলের দিকে। বর্ষীয়ান পুলিশ অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করছেন অন্বয়ী মল্লিকের মার্ডারকেসের। শঙ্করপুরের তার বাগানবাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে মৃতদেহ। তার সেক্রেটারি ডায়েরি করেছে। ফোনের কললিস্টের নাম্বার ধরে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। লাস্টের দুটো নাম্বারের আগে মেহুলের নাম্বার। আজ ক্যাফেতে কাস্টমার নেই। রম্যাণী, মেহুল ও পুলিশ অফিসার। সন্তুষ্ট পুলিশ অফিসার থানায় ডেকে পাঠানোর আদেশ দিয়ে মসমসিয়ে জিপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
রম্যাণীকে খোলা বুকে টেনে নিতে নিতে বড় করে শ্বাস ফেলল মেহুল। মুখে ক্লান্তির ছাপের ভান রেখে রম্যাণীর ঘন চুলে নাক ডুবিয়ে নিশ্চিন্ততা অনুভব করতে লাগল। ভাগ্যিস, দুজনের ফোন যাওয়ার আগের দিন থেকেই এই শহরের ঘরে একলা শুয়ে বিশ্রাম নিয়েছে।
দরজা ঠেলে ঢুকল ক্যাফের নিশ্চুপ প্রথম মানুষ। আজ আর কোণের চেয়ারে গিয়ে বসল না। এগিয়ে এল মেহুলের দিকে, ঝুঁকে পড়ে হ্যান্ডশেক করল। মেহুলের শরীর ঝটকা লাগল তার গভীর চোখের দিকে তাকাতেই। মানুষটা হেসে বেরিয়ে গেল দরজা ঠেলে।
চলে যাওয়া মানুষটার থেকে চোখ সরিয়ে নিতে নিতেই বেজে উঠল মেহুলের ফোন
“ বনমালী তুমি, পরজনমে হইও রাধা ।”
ফার্নিচারের দোকান থেকে কল।
রম্যাণীকে বুক থেকে সরিয়ে ফ্রেশ হতে ঢুকল বাথরুমে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুখে জলের ঝাপটা দিতেই পিছনে ওরা কারা সব ?
অল্পবয়সের জ্যেঠু, যৌবন বয়সের জ্যেঠু, মধ্যবয়সের জ্যেঠু একে একে একে পেছন থেকে শরীরে মিশছে। সবশেষে দাঁড়িয়ে একটু আগে চলে যাওয়া মানুষটা। হাতের ফোনটা মেহুলের ফোনের পাশে রেখে মেহুলের শরীরে মিশে যাওয়ার আগে টের পেল তার মাথা ঘুরছে কারণ
এ তো এ তো প্রৌঢ় জ্যেঠু , যার মত দেখতে তাকে। প্রৌঢ় হলে তাকে এমনিই দেখতে হবে হয়ত। শরীরে মিশে গেল প্রত্যেক বয়সের জ্যেঠু। মেহুল হাত বাড়াল তার ফোনের পাশের ফোনটার দিকে, কিন্তু কোথায় ফোন ?
শুধু মেহুলের ফোনটাই একলা পড়ে আছে। তার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে ?
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
মনে পড়ল জ্যেঠুর ভীষণ প্রিয় ছিল গানটা, কবে যেন তার পছন্দের গানের লিস্টে মিশে গেছে এই গানটা খেয়াল করা হয়নি।
আয়নায় ঘুষিটা বসাতে বসাতে মেহুল চিৎকার করে উঠল
“ বাবা , সন অফ বিচ হেয়ার। রক্তবীজ হেয়ার বাবা। ”
(সমাপ্ত)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860091930837317&id=707552542757924