Thursday, March 15, 2018

#নিষিদ্ধ_যাপন #চতুর্থ_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা



তিনজনে প্রায় একই বছরে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গেল আগে পরে । মেহুলের  একেক সময় হিংসে হয়, একেক সময় আনন্দ। মিশ্র অনুভূতিতে ভাসতে ভাসতে তার শরীর উত্তপ্ত হতে থাকে।  কাউকে পাশে বসিয়ে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।

ফোনটা বেজে উঠল।

অন্বয়ী ফোন করেছে । অন্বয়ী মল্লিক, ফ্যাশন ডিজাইনার। আপাতত অন্বয়ী তার ছোট্ট ক্যাফেতে ইনভেস্ট করতে রাজী , চল্লিশ শতাংশ লাভের বিনিময়ে।  ক্যাফেটা ভালো করে সাজাতে চায় সে। একটা বেতের সোফাসেট কিনবে, আরেকটা কফি মেশিন, বেশকিছু জিনিসও।

এতদিন অন্বয়ীর সাথে অনলাইনে মেল চালাচালি করে কথা হয়েছে। এবার সামনে গিয়ে কনভিন্স করতে হবে। ফোনটা রিসিভ করে সে।

“ আমি কি মিস্টার মেহুলের সাথে কথা বলছি , অন্বয়ী মল্লিক হেয়ার।”

হাস্কি গলার আওয়াজে কাটা কাটা বাক্য ভেসে আসে।

মেহুল সোজা হয়ে বসে।

ব্যবসায়িক কথা চলতে থাকে।

জীবন চলে। সপ্তাহ আসে যায়।

মেহুলের সাথে ক্যাফের আগন্তুকের দেখা চলতে থাকে। এগিয়ে এসে কথা বলা হয় না এই যা। রম্যাণীও আসে প্রায় প্রতিদিন , বিনা শর্তে মেহুলের হাতে হাতে সাহায্য করে। একটা কিন্ডারগার্টেনে অতিকষ্টে চাকরিও জোগার করে নিয়েছে। স্বামী কোনোদিন ফেরে ঘরে কোনোদিন ফেরে না। তাকে উৎখাত করেনি। দুজনের দেখা হয় না একছাদের নীচে থেকেও। রম্যাণী এই বিষয় নিয়ে দুঃখও করে না। মেহুল মাঝে মাঝে ভাবে মানুষ কত অদ্ভুত , অভ্যাসের বশ হয়ে গেলে সেই জীবন নিয়েই বেঁচে থাকে। রম্যাণীর ব্যক্তিত্ব আকর্ষণ করে তাকে , চুম্বকের মত।

তবে এখন রম্যাণীকে অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। কেমন যেন একটা সম্পর্কের নাম দিতে চায়। নামহীন সম্পর্কের মাধুর্য হারাবে নাম পেলে, যেন বুঝতেই চায় না। সম্পর্কের নাম হলেই সেটাতে উৎসাহ হারাবে মেহুল। ঠোঁটের কোণে পাতলা হাসিটা ফিকে হয়ে আসে।

অন্বয়ী মল্লিকও কম যান না। তাঁর অফিসে বেশ কয়েকবার গেছে সে, আমন্ত্রণ জানাতে তিনিও এসেছেন, ক্যাফে ঘুরে দেখে গেছেন। রূপান্তরকামী মানুষরা হেলাফেলার চরিত্র হন না তা বোধহয় অন্বয়ী মল্লিককে দেখলে বোঝা যাবে। ঝজু শরীর, দৃঢ়চেতা মন, কমকথার মানুষ।

রম্যাণীর উপর নেশাটা কমে আসছে মেহুল টের পায়, গোলাপ সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে গেলে যেমন কুঁড়ি খোঁজে মন, কিংবা অর্ধপ্রস্ফুটিত কুঁড়ি। ঠিক তেমন ভাব নিয়েই মেহুল আকৃষ্ট হচ্ছে অন্বয়ীর উপর। অস্থির বা বিরক্তিতে ল্যাপটপে আঙুল ঠোকা, সিগারেটে টান দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকানো, জুতো ট্যাপ করতে থাকা।

না না না! তার এ কী হচ্ছে ? সে মানুষ থেকে কী অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। কেমন করে সব মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে সে ? প্রশ্নরা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়।
নগ্ন হয়ে আয়নায় চোখ রাখলে কি নিজেকে চেনা যায় ? প্রায়ই এই সম্পর্কহীন মানুষটা জলবিন্দুর কাম, প্রেম মেখে আয়নার সামনে দাঁড়ায় । রেখায় রেখায় আঙুল রেখে পূর্বসুরী খোঁজে। জেঠু না বাবা ? ঘুসিতে চিড় খেয়ে যায় কাঁচ প্রায় প্রতিদিনই, প্রতিদিনই নতুন কাঁচ আসে।

এখন বড় অপ্রেমিক লাগছে নিজেকে। শিকড়টা খুঁজে পেলে কালঘুম ঘুমানোর আগে শান্তির পরত লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত । তা কি করে সম্ভব !!  এখনকার বাড়িতে গরাদ হয় না, কালো আলকাতরা লাগানো লোহার শিকের গরাদ। হয় না কড়িকাঠ। আধুনিক ছাদের গা জুড়ে নেমে আসে কৃত্রিম নকসী রাত, চাঁদ, তারা। বাল্বের উজ্জ্বলতা ধার নিয়ে 
নির্ঘুম চোখে জ্বলজ্বলে কৃত্রিমতা নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। আজকাল মেহুলের আকাশ দেখতে ইচ্ছে করলেই ছাদে উঠে শোয়। গরমকালে মাদুর পেতে, শীতকালে স্লিপিং ব্যাগ। ঘন নীল আকাশে, কাস্তের ধারের মত একফালি চাঁদ, চারদিকে ছড়ানো তারার আতসবাজির ফুলকি। আকাশের তারায় আপনজনেরা ঘর বানায়, মা কখনো বলেনি, বরং মা বলতে মনে পড়ে আকাশের কালপুরুষকে। মা বলতে মনে পড়ে মিঠাপাতি পান ছেঁচার গন্ধ, মা বলতে মনে পড়ে বৃহস্পতিবার আলতার ছাপ ফেলা জলছাপ বিছানার চাদরের কোণায়, মা বলতে মনে পড়ে শাড়িতে হলুদ রঙের হাত মোছার দাগ।

__________________________________

বেশ কদিন কেটে গেছে। রম্যাণী এখন নিয়মিত আসে, কপালের সিঁদুরের টিপটা তিরছে দাগ টেনে নিষিদ্ধ ডাক ডাকে মেহুলকে ।  ঠোঁট শুকোয় , বুক শুকোয় তেষ্টায়। গলা অবধি তেষ্টাটা ঢোঁক গেলে। ঘন কাজল চোখের গভীর ডাককে অস্বীকার করতে পারে না মেহুল । অতিথিশালা এখন রম্যাণীকে চেনে , প্রায়ই তাপ মাখে যে। মেহুল  একেকসময় অতিথিশালাকে মানুষ ভাবে। যে  উদার হৃদয়ের মানুষ। যে আসুক তাকে কর্পূর জল দেবে , বাঁচার জন্য পাত সাজিয়ে রসদ দেবে, খানিক পুঁটুলি বেঁধে দেবে আগামী দিনের জন্য । একেকসময় অতিথিশালার দেওয়ালের সাথে ঝগড়া করে , কথায় বলে না ওদের তো কান আছে। ফিসফিসে ঝগড়া, ঘ্যানঘেনে ঝগড়া, পিঠ দিয়ে বসে কথা চালাচালি সবরকমই করে যায় মেহুল।

আচ্ছা এ কেমন মানসিকতা !!  ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষের ঠোঁটের উপর চোখ আটকে যায়, কামনার অঙ্গ তীক্ষ্ণ সজীব হয়ে ঠোঁট চাটে। লিঙ্গভেদ মানে না, হাতের মুঠোয় ধরে গলায় মুখ ডুবিয়ে গন্ধে মাতাল হতে ইচ্ছে করে। তবে কি পাগল হতে অল্পই বাকি, মেহুলের নিজেকে নিয়েই ধন্ধ জাগে।

থুতনিতে তিল , শাঁওলা রং, গ্লসি লিপস্টিক, কানে, নাকে স্টাডে মেহুলের চোখ মুগ্ধতা নিবেদন করে চলেছে টেবিলের এপার থেকে। ঘুরন্ত চেয়ারে অস্থির ব্যক্তিত্ব।

“ সাচ এ সন অফ বিচ, ফাক ”

অন্বয়ী মল্লিকের মুখ থেকে শব্দটা যেন ছিটকে এল। চমকে মেহুল ভাবনা সামলাতে সামলাতে পিছিয়ে গেল। তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে না, ফোনেতেই কার উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করেছেন। আগুনের ফুলকির মত ছিটকে এসে মেহুলের নরম চামড়ায় আটকে গেল। এই নোংরা শব্দটা তাকে দুর্বল করে দেয় জাড় থেকে। অন্ধকারে মুড়ে যায় ভেতরটা, মনের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হতে থাকে বাবার গলা। ঘরের ঠিক মাঝখানে ফুটে ওঠে ছোট মেহুলকে বুকে জড়িয়ে মাতৃমূর্তি। দরজার ওপারে জ্যেঠুর গলা,

 “ ভুল বুঝছিস ভাই , ভুল বুঝছিস ”।

কখনো কখনো মাতৃমূর্তিটা পুরুষ মূর্তিতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। গর্জানো পুরুষ মানুষটা  একই থাকে।

বাচ্ছা মানুষটার দিকে আঙুল তুলে পুরুষ মানুষটা চেঁচায় “রক্তবীজ, রক্তবীজ”

অতীত ভেসে আসে সময় উজান বেয়ে। দেওয়ালের ঠান্ডা বুকে নিজেকে না মেশালে মেহুলের এই অতীত ঘরটা হারায় না। হারায় না একটা তীব্র জ্বালা। ঘর থেকে ক্যাফে যাওয়া আসার পথটুকু হেডফোনের নরম আব্রুতে ঢাকা থাকে কান, যাতে কোনোভাবেই না কোনো নোংরা শব্দ একদিনের মত স্তব্ধ করে দেয়।

(ক্রমশ...)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860089917504185&id=707552542757924

No comments:

Post a Comment