স্বর্ণদ্বীপ_চৌধুরী
“খেন্তি রে, খেন্তি পোড়ারমুখী, খেন্তিইইইই, ওরে ও খেন্তি, আ মোলো যা, কানের মাতা কেয়ে বসে আচিস নাকি?”
“ও মা ফুলঠাকমা যে, শুনতে পাইনি গো, কড়ায় ভাজা বসিয়ে এইচি, তা বলো, কি জন্যি এত্ত হাঁক দিচ্চিলে?”
“শিগগির চল, বড়বাবু, তোরে ডাক দিচে,বলতিচে কি দরকার আছে। আয় আয়!”
গতিক বড় সুবিধার লাগলো না সব শুনে, খেন্তি ওরফে চম্পার। এই বড়বাবু লোকটি যে একেবারেই সুবিধার নয়, এই তল্লাটে সব ঘরের মানুষ সেই কথা জানে। নামেই পুলিশ, আসলে রাজনৈতিক দলের পান্ডা-গুন্ডাদের ফোকটে ফূর্তির রসদ জোগানোর দালাল, আসবে আর মেয়েদের নিয়ে যাবে সেই মতলবে। দুগ্গামাসী ওরফে এই বস্তির সর্বেসর্বাও কিছু বলে না একে, তারও যে অনেক স্বার্থ আছে। কতরকম বেআইনি নেশার কারবার চালায় দুগ্গামাসী এই বস্তির পায়রার খোপগুলোতে, সব জানা স্থানীয় ওই নেতাদের আর বড়বাবুর, তাই কোনো আইন দুগ্গামাসীর টিকিটাও ছুঁতে পারে না। শুনেছে, অনেক আগে এখানে বদলি হয়ে আসা এক পুলিশ অফিসার এসব নিয়ে তদন্ত করে, ধর-পাকড় শুরু করেছিল,তবে কারুর শাস্তিই সেভাবে স্থায়ী হয়নি। সেই অফিসারকে কচুকাটা করে ভাসিয়ে দিয়েছিল ওই রূপনারায়ণের জলে এখানকার দারোয়ানের দল। তার অভাগী স্ত্রী, স্বামীর মুখটুকও পায়নি দেখতে শেষবারের মতো। কি করেই বা পাবে, মাথাটাই তো পাওয়া যায়নি এমন কাজের সাফাই! পোশাকের মধ্যে থাকা কার্ড দেখে শনাক্ত করা হয়েছিল ওর আট টুকরো দেহটা, কিছুটা তার আবার জলজ প্রাণীও ঠুকরে খেয়েছে।
চম্পা তখনও এই বস্তিতে আসেনি, ওর প্রাণের সখী সোহাগীর মুখে এসব শুনেছে। সোহাগী বলেছিল, “মুখ দেখতি পাবে কি করে রে খেন্তি! আমি দেকেচিলাম, কানাই আর খালিদ, দুইজনা ওই মুন্ডুটা নিয়ে লুফালুফি খেলতি খেলতি ফেলি দিলো নদের জলে।”
সোহাগীর জন্ম থেকে বড় হওয়া এই নরকেই, ওর মা এখানে এসেছিল অনেক ছোটবেলায়, বাপ-মা মরা একরত্তি মেয়ের খাওয়ানো-পরানোর খরচ থেকে বাঁচতে, তার কাকা বেচে দিয়ে গেছিল এই পাড়ায়। সোহাগীর মা এইডস হয়ে মরে বেঁচেছে অনেক আগেই, সোহাগী তখন বেশ ছোট, ফুলঠাকুমা ওকে বড় করেছে, আর এখন ও নিজেও এখানকার অভিজ্ঞ পণ্যজীবী। শুনেছে শহরের শিক্ষিত, আধুনিক মননের অধিকারী নারী-পুরুষেরা, সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থার প্রতিনিধিরা অনেক কাজ করে ওদের পুনর্বাসনের জন্যে। কত প্রকল্প, কত সহায়তা, কত উন্নয়নের আলো, তাদের মতো কিছু কিছু মেয়েদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখায়, তবে সেসব ওই কলকাতা শহরের সোনাগাছির জন্যে, মফস্বলের প্রান্তে থাকা বেশ্যাপট্টির গলিতে, সেই আলোর ক্ষীণ কিরণটুকুও এসে পৌঁছায় না।
“কি রে চল! সঙের মতো রংমাখা রূপ নিয়ে দোরে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস লো? তোর ঘরে নাগর আচে নাকি? থাকলে অন্য কাউকে পাঠাচ্চি, তোরে ডাকচে বড়বাবু, আয় একুনি।” দুগ্গামাসীর অত্যুগ্র কুহরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হলো চম্পার, ফুলঠাকুমার সাথে সাথে দুগ্গামাসীও এসেছিল পেছন পেছন তাকে নিয়ে যেতে, অতটা খেয়াল করেনি। বিনা বাক্যব্যয়ে চম্পা পিছু নিলো দুগ্গামাসীর, লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে ফুলঠাকুমাও ধীর পদক্ষেপে তাদের। রক্ষাকালীর বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বড়োবাবুর মুখটা দূর থেকে মা বগলার পায়ের তলায় থাকা অসুরের মুখের মতো লাগলো এক ঝলক, লালসাময় রসনা লকলকিয়ে যেন লেহন করছে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর শরীর, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে বারাঙ্গনাদের ব্যবহারজীর্ণ লাবণ্য।
“এই যে বাবু, নে যাও, এই চম্পাকে তো তুমি চেনোই ভালোমতো, আর হেইটা হলো স্বপ্না, নতুন আমদানি। এহনো পোক্ত না, তবে নে যাও, ও ঠিক পারবে এহন। দেখেশুনে নে আমার ঘরে এসো।”
“তোর ঘরে কি জন্যে রে দুগ্গা! সবই তো ছিবড়ে হয়ে গেছে তোর!”
বড়বাবুর বিশ্রী কথা আর বিশ্রী ইঙ্গিতওয়ালা হাসির খ্যাক খ্যাক আওয়াজ যেন কানে গিয়ে বিঁধলো চম্পার, যদিও দুগ্গামাসীকে সে মোটেই পছন্দ করে না, তাও ইচ্ছা করছিল পায়ের জীর্ণ পাদুকার সদপ্রয়োগ করে ওই ভন্ড রক্ষাকর্তার দুটি গালে।
“ বাজে কতা রাখো দিকি! দেনাপাওনা কি সকলের সামনে করবে নাকি!আর ছিবড়ে তো তুমিও চুষতে আসো মাঝে মাঝে, দিনের আলোয় চিনতে অসুবিধা হচ্চে বুঝি, সরাবো নাকি বুকের কাপড়টা?”
যাক, দুগ্গামাসীর উত্তরটা ভালোই ছিল, চম্পা ভাবে মনে মনে, তবে এই লোকটা যা বেহায়া, এর মোটেই গায়ে লাগবে না, আর গায়ে যে লাগেনি বড়বাবুর একেবারেই, প্রত্যুত্তরে দেওয়া হাসিতেই তা বেশ পরিষ্কার।
“আচ্ছা চম্পা শোন, বাবু তোকে নে যাবে, গোল করবিনি, স্বপ্নারে নে শান্ত হয়ে যাবি, নেতাবাবুর কিছু অতিথ আসবেন, তাদের খাতির যত্ন করবি। ওনারা যেমনটি বলবেন করবি, তিনদিন বাদে তোদের দে যাবেন বড়বাবু। তখন পাবি তোদের ভাগ। স্বপ্নারে একটু শিকিয়ে দিবি। ও মাগী সুবিদার নয়।”
দুগ্গামাসী বলার আগেই এরকম কিছুর একটা আঁচ পেয়েছিল চম্পা, এখন আর সন্দেহ রইলো না। স্বপ্নাকে দেখে মনে হলো বলির আগে বেঁধে রাখা পাঁঠা, চারদিকে আড়চোখে দেখছে আর কাঁপছে। এবারে তার মানে অর্থবান কোনো সৌখিন মক্কেলের বায়না আছে, নাহলে দেনাপাওনা,ভাগ-বখরা, এসবের ধারেকাছে দিয়েও যায় না ওই বড়বাবু। স্বপ্নাকে দেখে বড় মায়া হলো চম্পার, গলার কাছে একটা দলাপাকানো চাপা কষ্ট আবার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো অনেকদিন বাদে। বছর পাঁচেক আগে চম্পাও এমন করেই দাঁড়িয়েছিল, যখন তাকে পাঠানো হচ্ছিল জনৈক এক নেতা, দুগ্গামাসীর কথায় ‘মালদার বাবু’র মনোরঞ্জন করতে।
গরিবের মেয়ে ছিল চম্পা ওরফে মীনাক্ষী,স্কুল পালিয়ে ভালোবেসেছিল গ্রামে কয়েকদিনের জন্যে কন্ট্রাক্ট’এর কাজ করতে আসা অজ্ঞাতকুলশীল রাজুকে। বিয়ের পর রাজু ওকে এখানে রেখে যায়, দুগ্গামাসীকে ওর মাসি পরিচয় দিয়ে,কথা দিয়েছিল বাড়িতে জানিয়ে তারপরে এসে তাকে পূর্ণ মর্যাদায় নিয়ে যাবে তার শ্বশুরের ভিটেয়,কথা রাখতে রাজু আর ফিরে আসেনি। চম্পার আজও স্পষ্ট মনে আছে, প্রথমবার ব্যবসায় পাঠানোর আগে, দুগ্গামাসী জোর করে মুছে দিয়েছিল ওর সিঁথির সিঁদুর, ভেঙে দিয়েছিল শাঁখা-পলা, বলেছিল ‘বেশ্যার বর হয়না রে হারামজাদী, বাবু হয়!’। সেদিন অবশ্য শুধু শাঁখা পলা নয়, ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল ওর পূর্বপরিচয়, ওর বিশ্বাস আর সর্বোপরি ওর মন। দুগ্গামাসীর দেওয়া নাম ‘চম্পা’।তার মতো সবারই এখানে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে, সোহাগী বলেছিল”এ তো অন্য জেবন রে চম্পা, হেইখানে পুরাতন নামের কোনো কাম নেই”।চম্পা অবশ্য জানে নাম পরিবর্তনের কারণ, যাতে কোনোদিন কেউ কোনোভাবেই ফিরে যাওয়ার পথের সন্ধান তাদের দিতে না পারে। চম্পার স্পষ্ট মনে আছে, ওর প্রথম ক্রেতার অত্যাচারের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়েছিল চম্পা। যখন হুঁশ ফেরে, দেখে দামী পালংকের ধবধবে সাদা চাদর ওর যোনি থেকে নিঃশব্দে নিঃসৃত টাটকা রক্তে ভিজে গেছে । কোনোরকমে টলতে টলতে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াতেই, কে যেন খামচে ধরলো স্তনাগ্র পিছন থেকে, দৈহিক বুভুক্ষা বাকি ছিল বুঝি তখনও ! দেহে এতো শক্তি ছিলো না যে নিজেকে ছাড়ায়, বুঝেছিল বাঁধা দিতে গেলে নির্যাতন বাড়বে, চুপ করে মড়ার মতো পড়েছিল বেশ কিছুক্ষণ, মদ্যপ লোকটা কিছুক্ষণ তার মধ্যে উত্তেজনা সঞ্চারের বৃথা চেষ্টা করে, তার কোনো সাড়া না পেয়ে কিছু বাদে নিজেই বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে। খবর দিয়েছিল কানাই দালালকে।একটা কাপড় জড়িয়ে,কানাই কোনোরকমে তুলে এনেছিল বাবুর বাড়ি থেকে চম্পাকে, তারপরে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল সুস্থ হয়ে ব্যবসায় ফিরতে। মাঝে কয়েকবার পালাতেও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। বরং যে শাস্তি জুটেছিল তার বদলে, তা ভাবলে এখনো শিউরে ওঠে ও মনে মনে। কানাই, খালিদ, ভুবন আর পিটার, দুগ্গামাসীর চার পোষ্য মনুষ্যরূপী নরখাদক, একসাথে চড়াও হয়েছিল তার নগ্ন শরীরের ওপর! তাই এখন আর এইসব নিয়ে ভাবেনা চম্পা, পালাবার রাস্তা বন্ধ, থাকতে যখন হবে এখানেই, ব্যবসা না করলে খাবে কি! বাইরের জগৎটা অনেকদিন আগেই ছেড়ে এসেছে ওর মতো এখানে থাকা বাকি মেয়েরা, ফিরে গিয়ে অন্যভাবে বাঁচা যাবে কি যাবে না সে তো ভাবনাতেই অনেক দূর, প্রগাঢ় ভীতি নিশ্চিন্ত বাসা বেঁধেছে অন্তরে, এই চেনা জায়গা ছেড়ে বেরোতে।
“এই যে নবাবের বিটি, যাও, পরনের কাপড়কানা বদলে নাও, এরপরে তিনদিন আর পরনে কিচু উঠবে কিনা, সাজতে সময় পাবে কিনা কে জানে! এই সুপ্রিয়া, নে যা তো স্বপ্নারে, সাজায়ে নিয়ে আয়, চম্পা মা আমার তো রেডিই আচে।”
দুগ্গামাসীর আদেশে জনৈকা সুপ্রিয়া, যে এখনো অব্দি শুধু শয্যা ছাড়া কারুর হৃদয়ের প্রিয়া হতে পারেনি, স্বপ্নার হাত দুটো এমন ভাবে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললো, যেন ছেলেবেলার শখ ছিল দারোগার চাকরি করার। চম্পা চোখ ফেরাতে পারছে না স্বপ্নার দিক থেকে, এক পাও নড়ছে না মেয়েটা নিজে থেকে, ভাবগতিক যা, একটু ফাঁক পেলেই দৌড় লাগাবে, কিন্তু তাহলে যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না।
“খেন্তি, মা!”
“কি গো ফুলঠাকমা, বলো।”
“তুই ওকে পালাতে দিবি মা, সঙ্গে নে যাচ্চিস তো! দেহিস না, যদি কোনোরকমে…”
“আস্তে বলো ঠাকমা, দুগ্গামাসি শুনলে তোমার আবার তিনবেলার খাওয়া জুটবেনি। আমিও থাকবনি। বুড়ো বয়েসে না খেয়ে মরবি বুড়ি।”
“তা মরি!পাপের ভাত আর খেয়ে কাজ নাই।”
“ওই বুড়ি! কি ফুসফুস করচিস রে?” একটা হাঁক দিয়ে দুগ্গামাসী আবার ঢুকে গেলো ঘরের মধ্যে, টাকা পয়সা নিয়ে কিছু গোলমাল হচ্ছিল বোধহয় বড়বাবুর সাথে, বুড়ি কানে কালা, বুঝে পায় না ঠিক কতটা জোরে শোনায় ওর কথা গুলো বাকিদের কাছে।
বুড়ি চুপ করে গেলেও, ওর কথা গুলো ঘুরপাক খেতে থাকলো চম্পার অন্তরাত্মার চারপাশে। কিন্তু কিসের লোভে সাহায্য করবে, ওই স্বপ্না নামের মেয়েটাকে, উল্টে ধরা পড়লে, শেষ থাকবে না দুর্গতির, দুজনেরই। আর কেনই বা করবে, ওকে তো কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি কোনোদিন, বরং উল্টে সকলেই বুঝিয়েছে এখানে কি করে টিকে থাকতে হয়, শিখিয়েছে ব্যবসা বাড়ানোর কৌশল।
সুপ্রিয়াদি স্বপ্নার হাতটা চম্পার হাতে দিয়ে বললো,” এনে ধর। এ ছুঁড়ির লক্ষণ ভালো নয়,ভেগে যাওয়ার তালে আছে। সামলে রাখিস।”
স্বপ্না কঠিন মুখ আর প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে চম্পার নজরদারিতে উঠে বসলো গাড়ীতে, সাথে চম্পা ছাড়াও দুজন উর্দিধারী পুলিশ বসে আছে।
চম্পা সমানে লক্ষ্য করে চলেছে স্বপ্নাকে। মাঝারি গড়ন, গায়ের রঙ, মুখের আদল দেখে মনে হচ্ছে, নেহাতই বদসঙ্গে পড়ে এই পাড়ায় এসে গেছিল, অভাবে নয়। অনেকটা রাস্তা চলার পর স্বপ্না বেশ উশখুশ করতে লাগলো, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন। গাড়ি থামলো বটে, কিন্তু আদেশ হলো সবার সামনেই কাজ সারতে হবে, পাখি যাতে না পালায় তাই এই বন্দোবস্ত। স্বপ্না যে একেবারেই প্রস্তুত নয় তা বুঝে, চম্পা ওদের বলে স্বপ্নাকে নিয়ে গেল একটু আড়ালে, ঝোপের মাঝে।
“নে, কর।”
স্বপ্না তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে।
“আ মোলো যা। পালাবার তালে নেমেচিলি নাকি! ওসব হবেনি। তুই পালা আর আমি মরি আর কি। যা করার করে গাড়িতে ওঠ।”
এতক্ষণে বুঝি স্বপ্নার বাঁধ ভাঙলো পুরোপুরি, সমবেদনা জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা, অনেক অনুনয় করলো চম্পার কাছে অনেক, ফল হলো না কিছুই!
“হেই সব হবেনি বাপু। দেকেচিস হেইখান থেকে দেকা যাচ্চে গাড়ি, একটা হাঁক দেব আর সব কটা মিনসে একসাথে এসে পড়বে। চল! চল! একন হেই তোর জেবন। বাকিদের মতো বাবুদের খুশি করবি আর গতরসোহাগ নিবি। অভ্যেস হয়ে যাবে এহন।”
স্বপ্নার কঠিন মুখ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। পাশে বসা দুই চৌকিদারের একজন বেশ বয়স্ক হলেও অপরজন তুলনায় ছোকরাই বলা চলে। দুজনেই আড়চোখে, পাশে বসা দুই বারবনিতার দেহসৌষ্ঠব মাপার প্রয়াস করে যাচ্ছে, হয়তো হাত নিশপিশও করছে, একটু ছুঁয়ে দেখতে, কিন্তু পারছেনা, সামনে বড়বাবু বসে আছে বলে হয়তো সাহসে কুলাচ্ছেনা।
“তা বড়বাবু, কোতায় নে যাচ্চেন আমাদের? সেই ককুন তো উঠেচি, আর কদ্দুর গোও?”
“আরে হরেনবাবুর ছেলের বন্ধু এসেছে কজন। বাবার কাছে আবদার করেছে, বাগানবাড়িতে থেকে ফুর্তি করবে, কাঁচা বয়েসের ঝোঁক আর কি। এই তিনদিন তাই মোচ্ছব হবে রে, মদের ফোয়ারা ছুটবে, তোরা নাচবি। ভালো করে খুশি করতে পারলে, অনেক বখশিশ পাবি জেনে রাখ।”
হরেনবাবুকে চম্পা ভালোমতোই চেনে। অলিখিত ভাবে ওই দুগ্গামাসীর স্বামী, ওর বাঁধা বাবু। লোকটার যে কিসের ব্যবসা আছে, আর কিসের নেই, তা বোঝা দায়। মদ, নারী, আর নেশার জিনিসের এক চেটিয়া ব্যবসায় লোকটা আগে থেকেই ছিল টাকার কুমির, তার ওপর আগেরবার ভোটে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীও হয়েছে এখন।
বাগানবাড়িতে এসে যখন নামলো তখন দিনের আলো অস্তমিত, সন্ধ্যার কনে দেখা মেঘের আলোয় গণিকা প্রবেশ করলো তার ক্ষণিকের বাসরগৃহের অন্দরে। বাড়িটা মূল লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরেই, আশেপাশে জনমানুষের চিহ্ন নেই। বাড়ির পিছনে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ গিয়ে মিশেছে ধানক্ষেতে। বিলাসবহুল ঘরের প্রকান্ড জানলায় দাঁড়িয়ে চম্পা উদাসদৃষ্টিতে একবারে চেয়ে দেখলো বাইরে। আকাশের মতো তার সিঁথিও রাঙা হয়ে উঠেছিল একদিন, ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল সে এক প্রবঞ্চকের হাতে হাত রেখে,বৃথা সে স্বপ্নের তিলমাত্র বাস্তবতা পায়নি, ধীরে ধীরে মা-বাবার একমাত্র মেয়ে, দাদার একমাত্র আদরের বোন মীনাক্ষী মরে গিয়ে, তার পরিচয় এখন শুধুই লালবাতি এলাকার চম্পা। কেবল ফুলঠাকুমার ওপর বেশ মায়া পড়ে গিয়েছে এখানে আসার পর থেকে।
স্বপ্না এর মধ্যেও দুবার কাতর অনুরোধ জানিয়েছে চম্পার কাছে, চম্পা কঠোর। “কেন বাঁচাবো বল শুনি! যাতে সবাই মিলে একা আমাকেই ছিঁড়ে খায়!”
হরেনবাবুর ছেলে আর তার বন্ধুরা আগে থেকেই ওখানে উপস্থিত ছিল, চম্পা আর স্বপ্নাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেল অন্দরের একটি ঘরের মধ্যে বাইরের ঘর থেকে। স্বপ্না হাত পা ছুঁড়ে অনেকবার নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করলেও চম্পা বেশ উপভোগই করছিল। ‘এই তো সুযোগ! এদের কাঁচা-কচি মাথা গুলো চিবিয়ে নিজের আখেরটা গুছিয়ে নেওয়ার। একজনকে বাঁধা বাবু বানালে আর চিন্তা নেই। খাওয়া-পরার কোনো কষ্টই থাকবেনা, বাগানবাড়িতে থাকতে পাবে, যেমন পেয়েছিল সাইদা দিদি। এই হরেনবাবুরই ভাই তো নিয়ে গেছিল তাকে কিনে, নিজের কাছে কোন এক বাগানবাড়িতে পাকাপাকি ভাবে রাখবে বলে। কিন্তু এই সেই বাগানবাড়ি কি? তাহলে দেখতে পাচ্ছেনা কেন! কে জানে, অন্য কোথাও হবে হয়তো! বড় মানুষ এরা, কত বাড়ি থাকে এমন এদের। স্বপ্নাটা বোকা! যত আটকাবে ততই বাড়বে এদের জেদ, আর ততই বেদনা বাড়বে। মেনেই নিক না!’
যেরকম ভেবেছিল, সেরকমটি হলো না। ভেবেছিল এখুনি হয়তো চারটে ছেলে মিলে বিবস্ত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর যেমনটা, বাকি খরিদ্দার করে থাকে। এরা সেই রাস্তায় গেল না, কথাবার্তায় বুঝলো, রাত্রে খাওয়াদাওয়ার বাদে হবে মদ্যপানের উৎসব আর তার পরেই ওদের নিয়ে শুরু হবে আদিম রিপুর খেলা।বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, তবে ভেতরেই ঘুরে ঘুরে দেখার আছে।চম্পা একটু জরিপ করে দেখলো যে ঘরে তাদের রাখা হয়েছে, সেই ঘরের লাগোয়া রয়েছে স্নানঘর। স্নানঘরের লাগোয়া আরেকটি ঘর, সেটা বন্ধ করা রয়েছে। চম্পার খুব ইচ্ছা করছিল,বাকি বাড়িটুকুও একটু ঘুরে ঘুরে দেখে। বড়মানুষদের এরকম সাজানো বাড়ি, সে আগে কখনো দেখেনি, কিন্তু স্বপ্নাকে পাহারা দিতে গিয়ে সকাল থেকে তার নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে, শান্তিতে একটু জিরিয়ে নেবে তারও উপায় নেই। ছেলেগুলো পাশের ঘরে বসে কি করছে একটা টিভির মতো জিনিস নিয়ে। চম্পা স্বপ্নাকে স্নানঘরে পাঠিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একটু আড়ি পাতলো মাঝের একটা জানলায়। ছেলেগুলো কি একটা দেখছে ওই টিভিটায়। চম্পা একটু দেখতে চেষ্টা করে বেশ কিছু বাদে উদ্ধার করলো, টিভিতে চলছে দুটি মানুষের রতিক্রিয়ার ভিডিও, মানুষদুটিও তার চেনা, হরেনবাবুর ভাই আর সাইদা দিদি। চম্পা মনে মনে ছেলেগুলোকে দুটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল ওখান থেকে, কিন্তু চোখ আটকে গেলো টিভির পর্দায়। এ কি দেখছে! হরেনবাবুর ভাই মত্ত উলঙ্গ অবস্থায় উঠে গিয়ে একটা বড় লোহার রড নিয়ে এলেন কোথা থেকে, আর এনেই সোজা ঢুকিয়ে দিলেন সাইদা দিদির যৌনাঙ্গে,পৈশাচিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে হরেনবাবুর ভাইয়ের মুখমন্ডল।বেশ কিছুক্ষন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করার পর মুখ দিয়ে টাটকা রক্ত বেরিয়ে একটু ছটফট করে আস্তে আস্তে স্থির হয়ে গেল সাইদা দিদির নির্বস্ত্র দেহটা। দুটো লোক ঢুকলো ঘরে তার কিছু বাদেই, আর পা ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেল দেহটা নিয়ে।
সর্বনাশ! সাইদা দিদি বেঁচে নেই! আর এই নরপিশাচগুলো সেই ভিডিও দেখে উল্লসিত। কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এলো চম্পা। স্বপ্না দরজায় মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে খুলে দেওয়ার জন্যে, চম্পা কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বেশ গম্ভীর গলায় বলল “খুলছি দাঁড়া!”
চম্পার দু পায়ের মাঝের প্রথমবারের অশরীরী ক্ষতটা হঠাৎ বুঝি প্রাণ ফিরে পেয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সংকেত দিচ্ছে যেন ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যেতে চলেছে। পালাতেই হবে ওদের, যেভাবেই হোক।
পাশের ঘরে ছেলেগুলোর গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এখনো, চম্পার মাথায় খেলে গেল বুদ্ধি। স্বপ্নাকে ভেতরেই অপেক্ষা করতে বলে ও গেল পাশের ঘরে।
“এই যে বাবুরা, কখন থেকে গা’টা ম্যাজম্যাজ করছে, আর কতক্ষণ?”
“এই যে আমার রানি, খুব ক্ষিদে পেয়েছে না তোর!একটু সবুর কর, তোর সব ক্ষিদে আজই মিটিয়ে দেব আমরা।”
চম্পার বুক কাঁপছে, কিন্তু এদের কিছুই বুঝতে দিলোনা, বরং একটু ছলকলাতেই এরা তুলে দিল কাঙ্খিত বস্তু ওর হাতে, দু’বোতল মদ, দুটো সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই।
ওখানে বসেই দুবার গ্লাসে ঢেলে নিজে খেয়ে ওদেরও খাওয়ালো বেশ অনেকটা করে, খালি পেটে মদ্যপানের ফলে হরেনবাবুর ভাইপো বেশ বেসামাল হয়ে পড়লো, এর মধ্যেই চম্পার ওপর আদেশ হলো স্বপ্নাকে তৈরি করে নিয়ে আসার। চম্পা বুঝলো কাজ হাসিল। মদের বোতল, দেশলাই সব নিয়ে চললো পাশের ঘরে স্বপ্নাকে তৈরি করে প্রস্তুত করতে।
সকাল থেকে স্বপ্না আশায় ছিল, চম্পার মন গলবে, ও ছাড়া পাবে, কিন্তু সেই সব আশা ভরসা এখন কর্পূরের মতো উবে গেছে, এখন সঙ্গী শুধুই উৎকণ্ঠা আর চরমতম সর্বনাশের আশঙ্কা। বন্ধ করা স্নানঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে পথশ্রমের ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিল একটু। হঠাৎ একটা জ্বলন্ত ঘরের আবহে খুলে গেল স্নানঘরের দরজা, সামনে চম্পা দাঁড়িয়ে।
“পালা তুই, পালা জানলা দিয়ে। এই সুযোগ!”
চম্পার এহেন ভোলবদলে বিস্মিত স্বপ্না ক্ষণিক সময় নিলো সম্বিৎ ফেরাতে। তারপরে আর কালবিলম্ব করেনি,
“কিন্তু দিদি তুমি!”
স্বপ্নার গলার আওয়াজটা বড় মিঠে লাগলো চম্পার।
“আমার বোদয় যাওয়া হবেনি রে!তুই যা! সাইদা দিদির মতো মরতে দেবনি আমি তোকে। যা হয় হোক!”
জানলা দিয়ে লাফিয়ে পরে পাঁচিল টপকে একবার ফিরে তাকালো স্বপ্না।চম্পাকে বাঁচাতে, সাহস সঞ্চার করে একটু ফিরে আসতেই চোখে পড়লো তিনটি পুরুষের ছায়ামূর্তি, খোলা জানলা দিয়ে তারাও বেরিয়ে আসতে চাইছে, ওকে ধরে নিয়ে যেতে, কিন্তু একি, অগ্নিময় শরীরে কেউ যেন গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে ওদের, দাউদাউ করে জ্বলে যাচ্ছে তিনটি ছটফট করতে থাকা শরীর, আর সেই প্রজ্জ্বলিত মানুষটি সর্বগ্রাসী আগুন নিয়ে যেন প্রলয়নৃত্য করে চলেছে, ওই বাড়ির সমস্ত পাপ, সমস্ত ক্লেদ ভস্মীভূত করার মানসে। লেলিহান আগুনের শিখায় ঝলসে গেল দৃষ্টিপথ, আর ফিরে তাকায়নি স্বপ্না।
“হারামজাদী, কাকে পাঠিয়েছিলি তুই! রেন্ডি মাগী একাই চার চারটে ছেলেকে পুড়িয়ে মারলো আর নিজেও মরলো। শালী আরেকটা কোথায় পালিয়েছে যদি ধরতে পারি, ওটাকেও সাইদার মতো মারবো! শালী তোর চম্পা নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আমার ভাইপোকে জড়িয়ে ধরেছিল জানিস!ছেলেটার মুখটাও দেখতে পেলো না ওর মা, শেষবারের মতো, এত জ্বলে গেছে।”
সবার অলক্ষ্যে কেউ বুঝি মানদন্ড রেখে ন্যায়বিচার করলেন।
স্বপ্নার কি হয় এরপরে কারুর জানা নেই, বারবনিতাদের পল্লীতে রাত্রিযাপন করা অদূষিত মেয়েটি, সভ্য সমাজে বা তার পরিবারের আশ্রয় পেয়েছিল কিনা, তা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রেখে দেয়। শোনা যায়, দুগ্গামাসীকেও পুত্রশোকে পাগল হয়ে, হরেনবাবু নিজেই হত্যা করেন, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের বস্তি। কিন্তু চম্পা, বা অসময়ে ঝরে যাওয়া এরকম আরো কত প্রাণ প্রশ্ন রেখে যায় সমাজের কাছে, সত্যিই কি এই প্রাণগুলোর মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমরা? এরকম অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আশেপাশে আমাদের, কিন্তু তার কত গুলোই বা যোগ্য ন্যায়বিচারের আলোয় আলোকিত হয়?
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ কাম্য, কিন্তু এই সব ক্ষেত্রে আমরা প্রতিকারেই সীমিত রেখে দিই আমাদের কর্তব্যকে। একটি মানুষের যৌনতা তার অস্তিত্বের দোসর। তাহলে কোনওভাবেই কি যৌনতাকে পণ্য হিসেবে বাজারে ঠেলে না দিয়ে, এই সমস্ত মানুষগুলোকে বিকল্প জীবিকার কোনো সন্ধান দেওয়া সম্ভব ছিলো না, না কি সদিচ্ছার অভাব সেই রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চোখ গুলোতেই ঠুলি বেঁধে রেখে দিয়েছে?
প্রশ্ন থাকবেই!
ছবিঋণ: গুগল
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=879733682206475&id=707552542757924
“খেন্তি রে, খেন্তি পোড়ারমুখী, খেন্তিইইইই, ওরে ও খেন্তি, আ মোলো যা, কানের মাতা কেয়ে বসে আচিস নাকি?”
“ও মা ফুলঠাকমা যে, শুনতে পাইনি গো, কড়ায় ভাজা বসিয়ে এইচি, তা বলো, কি জন্যি এত্ত হাঁক দিচ্চিলে?”
“শিগগির চল, বড়বাবু, তোরে ডাক দিচে,বলতিচে কি দরকার আছে। আয় আয়!”
গতিক বড় সুবিধার লাগলো না সব শুনে, খেন্তি ওরফে চম্পার। এই বড়বাবু লোকটি যে একেবারেই সুবিধার নয়, এই তল্লাটে সব ঘরের মানুষ সেই কথা জানে। নামেই পুলিশ, আসলে রাজনৈতিক দলের পান্ডা-গুন্ডাদের ফোকটে ফূর্তির রসদ জোগানোর দালাল, আসবে আর মেয়েদের নিয়ে যাবে সেই মতলবে। দুগ্গামাসী ওরফে এই বস্তির সর্বেসর্বাও কিছু বলে না একে, তারও যে অনেক স্বার্থ আছে। কতরকম বেআইনি নেশার কারবার চালায় দুগ্গামাসী এই বস্তির পায়রার খোপগুলোতে, সব জানা স্থানীয় ওই নেতাদের আর বড়বাবুর, তাই কোনো আইন দুগ্গামাসীর টিকিটাও ছুঁতে পারে না। শুনেছে, অনেক আগে এখানে বদলি হয়ে আসা এক পুলিশ অফিসার এসব নিয়ে তদন্ত করে, ধর-পাকড় শুরু করেছিল,তবে কারুর শাস্তিই সেভাবে স্থায়ী হয়নি। সেই অফিসারকে কচুকাটা করে ভাসিয়ে দিয়েছিল ওই রূপনারায়ণের জলে এখানকার দারোয়ানের দল। তার অভাগী স্ত্রী, স্বামীর মুখটুকও পায়নি দেখতে শেষবারের মতো। কি করেই বা পাবে, মাথাটাই তো পাওয়া যায়নি এমন কাজের সাফাই! পোশাকের মধ্যে থাকা কার্ড দেখে শনাক্ত করা হয়েছিল ওর আট টুকরো দেহটা, কিছুটা তার আবার জলজ প্রাণীও ঠুকরে খেয়েছে।
চম্পা তখনও এই বস্তিতে আসেনি, ওর প্রাণের সখী সোহাগীর মুখে এসব শুনেছে। সোহাগী বলেছিল, “মুখ দেখতি পাবে কি করে রে খেন্তি! আমি দেকেচিলাম, কানাই আর খালিদ, দুইজনা ওই মুন্ডুটা নিয়ে লুফালুফি খেলতি খেলতি ফেলি দিলো নদের জলে।”
সোহাগীর জন্ম থেকে বড় হওয়া এই নরকেই, ওর মা এখানে এসেছিল অনেক ছোটবেলায়, বাপ-মা মরা একরত্তি মেয়ের খাওয়ানো-পরানোর খরচ থেকে বাঁচতে, তার কাকা বেচে দিয়ে গেছিল এই পাড়ায়। সোহাগীর মা এইডস হয়ে মরে বেঁচেছে অনেক আগেই, সোহাগী তখন বেশ ছোট, ফুলঠাকুমা ওকে বড় করেছে, আর এখন ও নিজেও এখানকার অভিজ্ঞ পণ্যজীবী। শুনেছে শহরের শিক্ষিত, আধুনিক মননের অধিকারী নারী-পুরুষেরা, সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থার প্রতিনিধিরা অনেক কাজ করে ওদের পুনর্বাসনের জন্যে। কত প্রকল্প, কত সহায়তা, কত উন্নয়নের আলো, তাদের মতো কিছু কিছু মেয়েদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখায়, তবে সেসব ওই কলকাতা শহরের সোনাগাছির জন্যে, মফস্বলের প্রান্তে থাকা বেশ্যাপট্টির গলিতে, সেই আলোর ক্ষীণ কিরণটুকুও এসে পৌঁছায় না।
“কি রে চল! সঙের মতো রংমাখা রূপ নিয়ে দোরে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস লো? তোর ঘরে নাগর আচে নাকি? থাকলে অন্য কাউকে পাঠাচ্চি, তোরে ডাকচে বড়বাবু, আয় একুনি।” দুগ্গামাসীর অত্যুগ্র কুহরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হলো চম্পার, ফুলঠাকুমার সাথে সাথে দুগ্গামাসীও এসেছিল পেছন পেছন তাকে নিয়ে যেতে, অতটা খেয়াল করেনি। বিনা বাক্যব্যয়ে চম্পা পিছু নিলো দুগ্গামাসীর, লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে ফুলঠাকুমাও ধীর পদক্ষেপে তাদের। রক্ষাকালীর বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বড়োবাবুর মুখটা দূর থেকে মা বগলার পায়ের তলায় থাকা অসুরের মুখের মতো লাগলো এক ঝলক, লালসাময় রসনা লকলকিয়ে যেন লেহন করছে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর শরীর, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে বারাঙ্গনাদের ব্যবহারজীর্ণ লাবণ্য।
“এই যে বাবু, নে যাও, এই চম্পাকে তো তুমি চেনোই ভালোমতো, আর হেইটা হলো স্বপ্না, নতুন আমদানি। এহনো পোক্ত না, তবে নে যাও, ও ঠিক পারবে এহন। দেখেশুনে নে আমার ঘরে এসো।”
“তোর ঘরে কি জন্যে রে দুগ্গা! সবই তো ছিবড়ে হয়ে গেছে তোর!”
বড়বাবুর বিশ্রী কথা আর বিশ্রী ইঙ্গিতওয়ালা হাসির খ্যাক খ্যাক আওয়াজ যেন কানে গিয়ে বিঁধলো চম্পার, যদিও দুগ্গামাসীকে সে মোটেই পছন্দ করে না, তাও ইচ্ছা করছিল পায়ের জীর্ণ পাদুকার সদপ্রয়োগ করে ওই ভন্ড রক্ষাকর্তার দুটি গালে।
“ বাজে কতা রাখো দিকি! দেনাপাওনা কি সকলের সামনে করবে নাকি!আর ছিবড়ে তো তুমিও চুষতে আসো মাঝে মাঝে, দিনের আলোয় চিনতে অসুবিধা হচ্চে বুঝি, সরাবো নাকি বুকের কাপড়টা?”
যাক, দুগ্গামাসীর উত্তরটা ভালোই ছিল, চম্পা ভাবে মনে মনে, তবে এই লোকটা যা বেহায়া, এর মোটেই গায়ে লাগবে না, আর গায়ে যে লাগেনি বড়বাবুর একেবারেই, প্রত্যুত্তরে দেওয়া হাসিতেই তা বেশ পরিষ্কার।
“আচ্ছা চম্পা শোন, বাবু তোকে নে যাবে, গোল করবিনি, স্বপ্নারে নে শান্ত হয়ে যাবি, নেতাবাবুর কিছু অতিথ আসবেন, তাদের খাতির যত্ন করবি। ওনারা যেমনটি বলবেন করবি, তিনদিন বাদে তোদের দে যাবেন বড়বাবু। তখন পাবি তোদের ভাগ। স্বপ্নারে একটু শিকিয়ে দিবি। ও মাগী সুবিদার নয়।”
দুগ্গামাসী বলার আগেই এরকম কিছুর একটা আঁচ পেয়েছিল চম্পা, এখন আর সন্দেহ রইলো না। স্বপ্নাকে দেখে মনে হলো বলির আগে বেঁধে রাখা পাঁঠা, চারদিকে আড়চোখে দেখছে আর কাঁপছে। এবারে তার মানে অর্থবান কোনো সৌখিন মক্কেলের বায়না আছে, নাহলে দেনাপাওনা,ভাগ-বখরা, এসবের ধারেকাছে দিয়েও যায় না ওই বড়বাবু। স্বপ্নাকে দেখে বড় মায়া হলো চম্পার, গলার কাছে একটা দলাপাকানো চাপা কষ্ট আবার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো অনেকদিন বাদে। বছর পাঁচেক আগে চম্পাও এমন করেই দাঁড়িয়েছিল, যখন তাকে পাঠানো হচ্ছিল জনৈক এক নেতা, দুগ্গামাসীর কথায় ‘মালদার বাবু’র মনোরঞ্জন করতে।
গরিবের মেয়ে ছিল চম্পা ওরফে মীনাক্ষী,স্কুল পালিয়ে ভালোবেসেছিল গ্রামে কয়েকদিনের জন্যে কন্ট্রাক্ট’এর কাজ করতে আসা অজ্ঞাতকুলশীল রাজুকে। বিয়ের পর রাজু ওকে এখানে রেখে যায়, দুগ্গামাসীকে ওর মাসি পরিচয় দিয়ে,কথা দিয়েছিল বাড়িতে জানিয়ে তারপরে এসে তাকে পূর্ণ মর্যাদায় নিয়ে যাবে তার শ্বশুরের ভিটেয়,কথা রাখতে রাজু আর ফিরে আসেনি। চম্পার আজও স্পষ্ট মনে আছে, প্রথমবার ব্যবসায় পাঠানোর আগে, দুগ্গামাসী জোর করে মুছে দিয়েছিল ওর সিঁথির সিঁদুর, ভেঙে দিয়েছিল শাঁখা-পলা, বলেছিল ‘বেশ্যার বর হয়না রে হারামজাদী, বাবু হয়!’। সেদিন অবশ্য শুধু শাঁখা পলা নয়, ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল ওর পূর্বপরিচয়, ওর বিশ্বাস আর সর্বোপরি ওর মন। দুগ্গামাসীর দেওয়া নাম ‘চম্পা’।তার মতো সবারই এখানে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে, সোহাগী বলেছিল”এ তো অন্য জেবন রে চম্পা, হেইখানে পুরাতন নামের কোনো কাম নেই”।চম্পা অবশ্য জানে নাম পরিবর্তনের কারণ, যাতে কোনোদিন কেউ কোনোভাবেই ফিরে যাওয়ার পথের সন্ধান তাদের দিতে না পারে। চম্পার স্পষ্ট মনে আছে, ওর প্রথম ক্রেতার অত্যাচারের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়েছিল চম্পা। যখন হুঁশ ফেরে, দেখে দামী পালংকের ধবধবে সাদা চাদর ওর যোনি থেকে নিঃশব্দে নিঃসৃত টাটকা রক্তে ভিজে গেছে । কোনোরকমে টলতে টলতে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াতেই, কে যেন খামচে ধরলো স্তনাগ্র পিছন থেকে, দৈহিক বুভুক্ষা বাকি ছিল বুঝি তখনও ! দেহে এতো শক্তি ছিলো না যে নিজেকে ছাড়ায়, বুঝেছিল বাঁধা দিতে গেলে নির্যাতন বাড়বে, চুপ করে মড়ার মতো পড়েছিল বেশ কিছুক্ষণ, মদ্যপ লোকটা কিছুক্ষণ তার মধ্যে উত্তেজনা সঞ্চারের বৃথা চেষ্টা করে, তার কোনো সাড়া না পেয়ে কিছু বাদে নিজেই বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে। খবর দিয়েছিল কানাই দালালকে।একটা কাপড় জড়িয়ে,কানাই কোনোরকমে তুলে এনেছিল বাবুর বাড়ি থেকে চম্পাকে, তারপরে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল সুস্থ হয়ে ব্যবসায় ফিরতে। মাঝে কয়েকবার পালাতেও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। বরং যে শাস্তি জুটেছিল তার বদলে, তা ভাবলে এখনো শিউরে ওঠে ও মনে মনে। কানাই, খালিদ, ভুবন আর পিটার, দুগ্গামাসীর চার পোষ্য মনুষ্যরূপী নরখাদক, একসাথে চড়াও হয়েছিল তার নগ্ন শরীরের ওপর! তাই এখন আর এইসব নিয়ে ভাবেনা চম্পা, পালাবার রাস্তা বন্ধ, থাকতে যখন হবে এখানেই, ব্যবসা না করলে খাবে কি! বাইরের জগৎটা অনেকদিন আগেই ছেড়ে এসেছে ওর মতো এখানে থাকা বাকি মেয়েরা, ফিরে গিয়ে অন্যভাবে বাঁচা যাবে কি যাবে না সে তো ভাবনাতেই অনেক দূর, প্রগাঢ় ভীতি নিশ্চিন্ত বাসা বেঁধেছে অন্তরে, এই চেনা জায়গা ছেড়ে বেরোতে।
“এই যে নবাবের বিটি, যাও, পরনের কাপড়কানা বদলে নাও, এরপরে তিনদিন আর পরনে কিচু উঠবে কিনা, সাজতে সময় পাবে কিনা কে জানে! এই সুপ্রিয়া, নে যা তো স্বপ্নারে, সাজায়ে নিয়ে আয়, চম্পা মা আমার তো রেডিই আচে।”
দুগ্গামাসীর আদেশে জনৈকা সুপ্রিয়া, যে এখনো অব্দি শুধু শয্যা ছাড়া কারুর হৃদয়ের প্রিয়া হতে পারেনি, স্বপ্নার হাত দুটো এমন ভাবে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললো, যেন ছেলেবেলার শখ ছিল দারোগার চাকরি করার। চম্পা চোখ ফেরাতে পারছে না স্বপ্নার দিক থেকে, এক পাও নড়ছে না মেয়েটা নিজে থেকে, ভাবগতিক যা, একটু ফাঁক পেলেই দৌড় লাগাবে, কিন্তু তাহলে যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না।
“খেন্তি, মা!”
“কি গো ফুলঠাকমা, বলো।”
“তুই ওকে পালাতে দিবি মা, সঙ্গে নে যাচ্চিস তো! দেহিস না, যদি কোনোরকমে…”
“আস্তে বলো ঠাকমা, দুগ্গামাসি শুনলে তোমার আবার তিনবেলার খাওয়া জুটবেনি। আমিও থাকবনি। বুড়ো বয়েসে না খেয়ে মরবি বুড়ি।”
“তা মরি!পাপের ভাত আর খেয়ে কাজ নাই।”
“ওই বুড়ি! কি ফুসফুস করচিস রে?” একটা হাঁক দিয়ে দুগ্গামাসী আবার ঢুকে গেলো ঘরের মধ্যে, টাকা পয়সা নিয়ে কিছু গোলমাল হচ্ছিল বোধহয় বড়বাবুর সাথে, বুড়ি কানে কালা, বুঝে পায় না ঠিক কতটা জোরে শোনায় ওর কথা গুলো বাকিদের কাছে।
বুড়ি চুপ করে গেলেও, ওর কথা গুলো ঘুরপাক খেতে থাকলো চম্পার অন্তরাত্মার চারপাশে। কিন্তু কিসের লোভে সাহায্য করবে, ওই স্বপ্না নামের মেয়েটাকে, উল্টে ধরা পড়লে, শেষ থাকবে না দুর্গতির, দুজনেরই। আর কেনই বা করবে, ওকে তো কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি কোনোদিন, বরং উল্টে সকলেই বুঝিয়েছে এখানে কি করে টিকে থাকতে হয়, শিখিয়েছে ব্যবসা বাড়ানোর কৌশল।
সুপ্রিয়াদি স্বপ্নার হাতটা চম্পার হাতে দিয়ে বললো,” এনে ধর। এ ছুঁড়ির লক্ষণ ভালো নয়,ভেগে যাওয়ার তালে আছে। সামলে রাখিস।”
স্বপ্না কঠিন মুখ আর প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে চম্পার নজরদারিতে উঠে বসলো গাড়ীতে, সাথে চম্পা ছাড়াও দুজন উর্দিধারী পুলিশ বসে আছে।
চম্পা সমানে লক্ষ্য করে চলেছে স্বপ্নাকে। মাঝারি গড়ন, গায়ের রঙ, মুখের আদল দেখে মনে হচ্ছে, নেহাতই বদসঙ্গে পড়ে এই পাড়ায় এসে গেছিল, অভাবে নয়। অনেকটা রাস্তা চলার পর স্বপ্না বেশ উশখুশ করতে লাগলো, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন। গাড়ি থামলো বটে, কিন্তু আদেশ হলো সবার সামনেই কাজ সারতে হবে, পাখি যাতে না পালায় তাই এই বন্দোবস্ত। স্বপ্না যে একেবারেই প্রস্তুত নয় তা বুঝে, চম্পা ওদের বলে স্বপ্নাকে নিয়ে গেল একটু আড়ালে, ঝোপের মাঝে।
“নে, কর।”
স্বপ্না তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে।
“আ মোলো যা। পালাবার তালে নেমেচিলি নাকি! ওসব হবেনি। তুই পালা আর আমি মরি আর কি। যা করার করে গাড়িতে ওঠ।”
এতক্ষণে বুঝি স্বপ্নার বাঁধ ভাঙলো পুরোপুরি, সমবেদনা জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা, অনেক অনুনয় করলো চম্পার কাছে অনেক, ফল হলো না কিছুই!
“হেই সব হবেনি বাপু। দেকেচিস হেইখান থেকে দেকা যাচ্চে গাড়ি, একটা হাঁক দেব আর সব কটা মিনসে একসাথে এসে পড়বে। চল! চল! একন হেই তোর জেবন। বাকিদের মতো বাবুদের খুশি করবি আর গতরসোহাগ নিবি। অভ্যেস হয়ে যাবে এহন।”
স্বপ্নার কঠিন মুখ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। পাশে বসা দুই চৌকিদারের একজন বেশ বয়স্ক হলেও অপরজন তুলনায় ছোকরাই বলা চলে। দুজনেই আড়চোখে, পাশে বসা দুই বারবনিতার দেহসৌষ্ঠব মাপার প্রয়াস করে যাচ্ছে, হয়তো হাত নিশপিশও করছে, একটু ছুঁয়ে দেখতে, কিন্তু পারছেনা, সামনে বড়বাবু বসে আছে বলে হয়তো সাহসে কুলাচ্ছেনা।
“তা বড়বাবু, কোতায় নে যাচ্চেন আমাদের? সেই ককুন তো উঠেচি, আর কদ্দুর গোও?”
“আরে হরেনবাবুর ছেলের বন্ধু এসেছে কজন। বাবার কাছে আবদার করেছে, বাগানবাড়িতে থেকে ফুর্তি করবে, কাঁচা বয়েসের ঝোঁক আর কি। এই তিনদিন তাই মোচ্ছব হবে রে, মদের ফোয়ারা ছুটবে, তোরা নাচবি। ভালো করে খুশি করতে পারলে, অনেক বখশিশ পাবি জেনে রাখ।”
হরেনবাবুকে চম্পা ভালোমতোই চেনে। অলিখিত ভাবে ওই দুগ্গামাসীর স্বামী, ওর বাঁধা বাবু। লোকটার যে কিসের ব্যবসা আছে, আর কিসের নেই, তা বোঝা দায়। মদ, নারী, আর নেশার জিনিসের এক চেটিয়া ব্যবসায় লোকটা আগে থেকেই ছিল টাকার কুমির, তার ওপর আগেরবার ভোটে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীও হয়েছে এখন।
বাগানবাড়িতে এসে যখন নামলো তখন দিনের আলো অস্তমিত, সন্ধ্যার কনে দেখা মেঘের আলোয় গণিকা প্রবেশ করলো তার ক্ষণিকের বাসরগৃহের অন্দরে। বাড়িটা মূল লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরেই, আশেপাশে জনমানুষের চিহ্ন নেই। বাড়ির পিছনে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ গিয়ে মিশেছে ধানক্ষেতে। বিলাসবহুল ঘরের প্রকান্ড জানলায় দাঁড়িয়ে চম্পা উদাসদৃষ্টিতে একবারে চেয়ে দেখলো বাইরে। আকাশের মতো তার সিঁথিও রাঙা হয়ে উঠেছিল একদিন, ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল সে এক প্রবঞ্চকের হাতে হাত রেখে,বৃথা সে স্বপ্নের তিলমাত্র বাস্তবতা পায়নি, ধীরে ধীরে মা-বাবার একমাত্র মেয়ে, দাদার একমাত্র আদরের বোন মীনাক্ষী মরে গিয়ে, তার পরিচয় এখন শুধুই লালবাতি এলাকার চম্পা। কেবল ফুলঠাকুমার ওপর বেশ মায়া পড়ে গিয়েছে এখানে আসার পর থেকে।
স্বপ্না এর মধ্যেও দুবার কাতর অনুরোধ জানিয়েছে চম্পার কাছে, চম্পা কঠোর। “কেন বাঁচাবো বল শুনি! যাতে সবাই মিলে একা আমাকেই ছিঁড়ে খায়!”
হরেনবাবুর ছেলে আর তার বন্ধুরা আগে থেকেই ওখানে উপস্থিত ছিল, চম্পা আর স্বপ্নাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেল অন্দরের একটি ঘরের মধ্যে বাইরের ঘর থেকে। স্বপ্না হাত পা ছুঁড়ে অনেকবার নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করলেও চম্পা বেশ উপভোগই করছিল। ‘এই তো সুযোগ! এদের কাঁচা-কচি মাথা গুলো চিবিয়ে নিজের আখেরটা গুছিয়ে নেওয়ার। একজনকে বাঁধা বাবু বানালে আর চিন্তা নেই। খাওয়া-পরার কোনো কষ্টই থাকবেনা, বাগানবাড়িতে থাকতে পাবে, যেমন পেয়েছিল সাইদা দিদি। এই হরেনবাবুরই ভাই তো নিয়ে গেছিল তাকে কিনে, নিজের কাছে কোন এক বাগানবাড়িতে পাকাপাকি ভাবে রাখবে বলে। কিন্তু এই সেই বাগানবাড়ি কি? তাহলে দেখতে পাচ্ছেনা কেন! কে জানে, অন্য কোথাও হবে হয়তো! বড় মানুষ এরা, কত বাড়ি থাকে এমন এদের। স্বপ্নাটা বোকা! যত আটকাবে ততই বাড়বে এদের জেদ, আর ততই বেদনা বাড়বে। মেনেই নিক না!’
যেরকম ভেবেছিল, সেরকমটি হলো না। ভেবেছিল এখুনি হয়তো চারটে ছেলে মিলে বিবস্ত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর যেমনটা, বাকি খরিদ্দার করে থাকে। এরা সেই রাস্তায় গেল না, কথাবার্তায় বুঝলো, রাত্রে খাওয়াদাওয়ার বাদে হবে মদ্যপানের উৎসব আর তার পরেই ওদের নিয়ে শুরু হবে আদিম রিপুর খেলা।বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, তবে ভেতরেই ঘুরে ঘুরে দেখার আছে।চম্পা একটু জরিপ করে দেখলো যে ঘরে তাদের রাখা হয়েছে, সেই ঘরের লাগোয়া রয়েছে স্নানঘর। স্নানঘরের লাগোয়া আরেকটি ঘর, সেটা বন্ধ করা রয়েছে। চম্পার খুব ইচ্ছা করছিল,বাকি বাড়িটুকুও একটু ঘুরে ঘুরে দেখে। বড়মানুষদের এরকম সাজানো বাড়ি, সে আগে কখনো দেখেনি, কিন্তু স্বপ্নাকে পাহারা দিতে গিয়ে সকাল থেকে তার নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে, শান্তিতে একটু জিরিয়ে নেবে তারও উপায় নেই। ছেলেগুলো পাশের ঘরে বসে কি করছে একটা টিভির মতো জিনিস নিয়ে। চম্পা স্বপ্নাকে স্নানঘরে পাঠিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একটু আড়ি পাতলো মাঝের একটা জানলায়। ছেলেগুলো কি একটা দেখছে ওই টিভিটায়। চম্পা একটু দেখতে চেষ্টা করে বেশ কিছু বাদে উদ্ধার করলো, টিভিতে চলছে দুটি মানুষের রতিক্রিয়ার ভিডিও, মানুষদুটিও তার চেনা, হরেনবাবুর ভাই আর সাইদা দিদি। চম্পা মনে মনে ছেলেগুলোকে দুটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল ওখান থেকে, কিন্তু চোখ আটকে গেলো টিভির পর্দায়। এ কি দেখছে! হরেনবাবুর ভাই মত্ত উলঙ্গ অবস্থায় উঠে গিয়ে একটা বড় লোহার রড নিয়ে এলেন কোথা থেকে, আর এনেই সোজা ঢুকিয়ে দিলেন সাইদা দিদির যৌনাঙ্গে,পৈশাচিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে হরেনবাবুর ভাইয়ের মুখমন্ডল।বেশ কিছুক্ষন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করার পর মুখ দিয়ে টাটকা রক্ত বেরিয়ে একটু ছটফট করে আস্তে আস্তে স্থির হয়ে গেল সাইদা দিদির নির্বস্ত্র দেহটা। দুটো লোক ঢুকলো ঘরে তার কিছু বাদেই, আর পা ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেল দেহটা নিয়ে।
সর্বনাশ! সাইদা দিদি বেঁচে নেই! আর এই নরপিশাচগুলো সেই ভিডিও দেখে উল্লসিত। কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এলো চম্পা। স্বপ্না দরজায় মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে খুলে দেওয়ার জন্যে, চম্পা কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বেশ গম্ভীর গলায় বলল “খুলছি দাঁড়া!”
চম্পার দু পায়ের মাঝের প্রথমবারের অশরীরী ক্ষতটা হঠাৎ বুঝি প্রাণ ফিরে পেয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সংকেত দিচ্ছে যেন ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যেতে চলেছে। পালাতেই হবে ওদের, যেভাবেই হোক।
পাশের ঘরে ছেলেগুলোর গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এখনো, চম্পার মাথায় খেলে গেল বুদ্ধি। স্বপ্নাকে ভেতরেই অপেক্ষা করতে বলে ও গেল পাশের ঘরে।
“এই যে বাবুরা, কখন থেকে গা’টা ম্যাজম্যাজ করছে, আর কতক্ষণ?”
“এই যে আমার রানি, খুব ক্ষিদে পেয়েছে না তোর!একটু সবুর কর, তোর সব ক্ষিদে আজই মিটিয়ে দেব আমরা।”
চম্পার বুক কাঁপছে, কিন্তু এদের কিছুই বুঝতে দিলোনা, বরং একটু ছলকলাতেই এরা তুলে দিল কাঙ্খিত বস্তু ওর হাতে, দু’বোতল মদ, দুটো সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই।
ওখানে বসেই দুবার গ্লাসে ঢেলে নিজে খেয়ে ওদেরও খাওয়ালো বেশ অনেকটা করে, খালি পেটে মদ্যপানের ফলে হরেনবাবুর ভাইপো বেশ বেসামাল হয়ে পড়লো, এর মধ্যেই চম্পার ওপর আদেশ হলো স্বপ্নাকে তৈরি করে নিয়ে আসার। চম্পা বুঝলো কাজ হাসিল। মদের বোতল, দেশলাই সব নিয়ে চললো পাশের ঘরে স্বপ্নাকে তৈরি করে প্রস্তুত করতে।
সকাল থেকে স্বপ্না আশায় ছিল, চম্পার মন গলবে, ও ছাড়া পাবে, কিন্তু সেই সব আশা ভরসা এখন কর্পূরের মতো উবে গেছে, এখন সঙ্গী শুধুই উৎকণ্ঠা আর চরমতম সর্বনাশের আশঙ্কা। বন্ধ করা স্নানঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে পথশ্রমের ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিল একটু। হঠাৎ একটা জ্বলন্ত ঘরের আবহে খুলে গেল স্নানঘরের দরজা, সামনে চম্পা দাঁড়িয়ে।
“পালা তুই, পালা জানলা দিয়ে। এই সুযোগ!”
চম্পার এহেন ভোলবদলে বিস্মিত স্বপ্না ক্ষণিক সময় নিলো সম্বিৎ ফেরাতে। তারপরে আর কালবিলম্ব করেনি,
“কিন্তু দিদি তুমি!”
স্বপ্নার গলার আওয়াজটা বড় মিঠে লাগলো চম্পার।
“আমার বোদয় যাওয়া হবেনি রে!তুই যা! সাইদা দিদির মতো মরতে দেবনি আমি তোকে। যা হয় হোক!”
জানলা দিয়ে লাফিয়ে পরে পাঁচিল টপকে একবার ফিরে তাকালো স্বপ্না।চম্পাকে বাঁচাতে, সাহস সঞ্চার করে একটু ফিরে আসতেই চোখে পড়লো তিনটি পুরুষের ছায়ামূর্তি, খোলা জানলা দিয়ে তারাও বেরিয়ে আসতে চাইছে, ওকে ধরে নিয়ে যেতে, কিন্তু একি, অগ্নিময় শরীরে কেউ যেন গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে ওদের, দাউদাউ করে জ্বলে যাচ্ছে তিনটি ছটফট করতে থাকা শরীর, আর সেই প্রজ্জ্বলিত মানুষটি সর্বগ্রাসী আগুন নিয়ে যেন প্রলয়নৃত্য করে চলেছে, ওই বাড়ির সমস্ত পাপ, সমস্ত ক্লেদ ভস্মীভূত করার মানসে। লেলিহান আগুনের শিখায় ঝলসে গেল দৃষ্টিপথ, আর ফিরে তাকায়নি স্বপ্না।
“হারামজাদী, কাকে পাঠিয়েছিলি তুই! রেন্ডি মাগী একাই চার চারটে ছেলেকে পুড়িয়ে মারলো আর নিজেও মরলো। শালী আরেকটা কোথায় পালিয়েছে যদি ধরতে পারি, ওটাকেও সাইদার মতো মারবো! শালী তোর চম্পা নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আমার ভাইপোকে জড়িয়ে ধরেছিল জানিস!ছেলেটার মুখটাও দেখতে পেলো না ওর মা, শেষবারের মতো, এত জ্বলে গেছে।”
সবার অলক্ষ্যে কেউ বুঝি মানদন্ড রেখে ন্যায়বিচার করলেন।
স্বপ্নার কি হয় এরপরে কারুর জানা নেই, বারবনিতাদের পল্লীতে রাত্রিযাপন করা অদূষিত মেয়েটি, সভ্য সমাজে বা তার পরিবারের আশ্রয় পেয়েছিল কিনা, তা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রেখে দেয়। শোনা যায়, দুগ্গামাসীকেও পুত্রশোকে পাগল হয়ে, হরেনবাবু নিজেই হত্যা করেন, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের বস্তি। কিন্তু চম্পা, বা অসময়ে ঝরে যাওয়া এরকম আরো কত প্রাণ প্রশ্ন রেখে যায় সমাজের কাছে, সত্যিই কি এই প্রাণগুলোর মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমরা? এরকম অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আশেপাশে আমাদের, কিন্তু তার কত গুলোই বা যোগ্য ন্যায়বিচারের আলোয় আলোকিত হয়?
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ কাম্য, কিন্তু এই সব ক্ষেত্রে আমরা প্রতিকারেই সীমিত রেখে দিই আমাদের কর্তব্যকে। একটি মানুষের যৌনতা তার অস্তিত্বের দোসর। তাহলে কোনওভাবেই কি যৌনতাকে পণ্য হিসেবে বাজারে ঠেলে না দিয়ে, এই সমস্ত মানুষগুলোকে বিকল্প জীবিকার কোনো সন্ধান দেওয়া সম্ভব ছিলো না, না কি সদিচ্ছার অভাব সেই রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চোখ গুলোতেই ঠুলি বেঁধে রেখে দিয়েছে?
প্রশ্ন থাকবেই!
ছবিঋণ: গুগল
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=879733682206475&id=707552542757924
No comments:
Post a Comment