বন্ধ দরজা ঠেলে ঢুকছে প্রথম মানুষ , দিনের দ্বিতীয় মানুষ। একে ঠিক বোঝে না মেহুল , মানুষটা আসে , এক কোণে হলুদ চেয়ার টেনে বসে। মেহুলের দিকে গাঢ় চোখে তাকায়। মেহুল মেলাতে না চেয়েও মিলিয়ে ফেলে মানুষটার সমুদ্রের মত গভীর চোখে। মানুষটা অবিকল একই সুরে টেবিল বাজায়, তারপর একটা ফোন আসে, প্রতিদিনই একই সময় বেজে ওঠে ফোনটা। রিংটোনটার মধ্যেই একটা নিশ্চুপ নেশা আছে টের পায় মেহুল।
“ বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা… “
মিনিট দশ থাকার পর মানুষটা জুতো খটখটিয়ে বেরিয়ে যায়। দিনে একবার করেই রোজ দেখা হয় এর সাথে। অদ্ভুত না ?
আজ শুক্রবার। আজ রম্যাণীর আসার কথা। মেহুলের সাথে কিছু সময় বেক ও কবিতায় কাটানোর কথা। তার রম্যাণীকে ভালো লাগে, স্বপ্নসুন্দরী যেন। রম্যাণী আদ্যোপান্ত ' হোম মেকার ' । চ্যাটার্ড অ্যাকাউন্টেট স্বামীর সাথে এ শহরে আছে। নিঃশ্বাস নেয়, রাঁধে। ছুটি কাটায় মেহুলের ক্যাফেতে । প্রতি শুক্রবার আসে , সঙ্গে আনে জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
' হোম মেকার '
মা হোম মেকার ছিল ? ছিলই তো। দরজা খুলে দেওয়া থেকে শোবার ঘরের চাদর একদিকের খাটের পাশে হেলে পড়া সবই মায়ের আয়ত্তে।
প্রথম দিন ব্ল্যাক ফরেস্ট পরিবেশন করতে গিয়ে চোখ পড়ে গেছিল রম্যাণীর হাতের খোলা বইয়ের পাতায়
" ভালোবাসা নিয়ে কত বিবাদ করেছো!
এখন, টেবিল জোড়া নিবন্ত লন্ঠনও সহনীয়।সহানুভূতি। সবজির মতন বিকোয় না হাটে। হাত কাটে, না রক্ত পড়ে না। বিভীষিকা! দুচোখের পক্ষেও নড়ে না।
প্রজড় পিন্ডের মত আছো- আজই বিবাদ করেছো।ভালোবাসা নিয়ে কিছু বিবাদ করেছো, কাতর পাথর মিছু বিবাদ... "
চোখ তুলে দেখার সময় মেহুল দেখেছিল
সেদিন রম্যাণীর চোখের কোণ লালচে, সজল চোখে ধেবড়ে যাওয়া কাজল।
পরে পরে মেহুলের চোখ পড়েছে নাকের উপর বসানো চশমার আড়ালে চোখের পাতায়, ব্যক্তিত্বে, তার জীবন উপন্যাসে। প্রত্যেকটা জীবন একটা একটা উপন্যাস, কোনোটা খোলা কোনোটা বন্ধ। বন্ধুত্ব করে নিয়েছে মেহুল রম্যাণীর সাথে। এখন ও আর রম্যাণী সুন্দর সন্ধ্যা কাটায়, সপ্তাহে একদিনই যদিও। কবিতা আওড়ায়, আঙুলের ভাঁজে শূন্যতার আঁক কষে, আর…. বেক করে। কখনো কখনো গানও গায়।
কাঁচের দরজায় লটকানো ক্লোজড বোর্ডটা ঘুরিয়ে দেয় মেহুল । ওদিকে তিনটে হলুদ হাসিমুখের সাথে ওপেনড লেখা। এবার শুরু হবে মানুষ আসা, ক্রেতা আসা। কেউ হাত ধরে, কেউ পাশে হেঁটে, কেউ হাত ঝুলিয়ে একলা।, পিঠে ক্লান্ত ব্যাগ।
মেহুল প্লেট প্রস্তুত করে, কাঁটা চামচ গুছিয়ে রাখে। ফ্রেশ বেকড খাবারগুলো সাজায়, দামের ট্যাগ বসায়। ছোট্ট মেনু কার্ড বসিয়ে আসে টেবিলে টেবিলে। দুজন স্কুল ছাত্রী কাঁচের দরজা ঠেলে ঢোকে। দিন শুরু হয়ে যায়।
দুপুর গড়ায়। সন্ধ্যা নামে, পড়ন্ত সূর্যের আলো ক্যাফের কোণে কোণে পাতাবাহারি গাছের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে কুকিজের কাঁচের বয়ামগুলোর ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে। এমন সময় দরজা ঠেলে পা রাখে রম্যাণী। আজ পরনে কালো খেসের শাড়িতে রক্তাভ সূর্যের রথ। চোখে গোল ভারী ফ্রেমের চশমা, চশমার ওপারে গাঢ় কাজলটানা। ঠোঁটে ম্যাট ফিনিশড লিপস্টিক। আজ হাতের অলংকার একটা কাঠের চুড়ি, বুকের মাঝে রূপোর দূর্গা। ওকে দেখে মেহুলের মনে পড়ে গেল সেই কবিতাটা, যেটা পরশু গভীর রাতে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিল।
সেই হাত
অভিনব দুটি হাতে দেয়াল দরোজা খুলে দাও। ততক্ষণে রোদ্দুর পৌঁচেছে গোটারাত ঘুরে ঘুরে রোদ্দুর পৌঁচেছে ঘরে।
কিছুটা নড়বড়ে ছিলো ঘর। এককোণে পাথর তেমন সন্তুষ্ট নয়, দখল দখল শব্দ করে।
দাবি তার ঘরটি ভরাবে মানুষের মাথায় চড়াবে তার ভার। আর যদি পারে গিলে খাবে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে...
- শক্তি চট্টোপাধ্যায়
হ্যাঁ, ওর অতিথিশালায় একটি ব্ল্যাকবোর্ড আছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁ পাশে রাখা। নিয়মিত চকের আঁচড়ে ঘষা দাগের কলঙ্কে আবছা হয়ে থাকে। ডাস্টারও আছে বটে তবে মেহুলের নরম হাতটাই বেশি ব্যবহার হয় কলঙ্ক ঘষামাজা আবছা করতে। বহু পুরনো অভ্যাস এ।
রম্যাণী এসে দাঁড়ালো কাউন্টারের কাছে, মেহুলী যেখানে দাঁড়িয়ে তার খুব কাছে। স্নিগ্ধ চন্দনের গন্ধ ভেসে এল অভিসারের আমন্ত্রণ নিয়ে। চন্দনের গন্ধটা মাতাল করে মেহুলকে আজও। প্রতি ভোরে মায়ের গায়ে লেগে থাকত ঘামে ভেজা চন্দনের গন্ধ । বুকে কাঁধে লাল আধা গোল চাঁদ চিহ্ন।
কাউন্টারের তরফ থেকে চিনেমাটির বাটিতে দুটি ফরচুন কুকি অভিবাদন জানায় রম্যাণীকে। অভ্যস্ত হাতের চাপে মাঝ বরাবর ভাগ হয়ে যায় কুকি, বেরিয়ে আসে এক চিলতে রেশমী চিরকুট।
" আজ রাতের অভিসারে রাধারাণী "
(ক্রমশ...)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860086027504574&id=707552542757924
No comments:
Post a Comment