Thursday, March 15, 2018

#নিষিদ্ধ_যাপন #তৃতীয়_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা



রম্যাণীর ভ্রূ ধনুকে টঙ্কার দিয়ে ওঠে মানে তেমনই লাগে মেহুলের। বুকের মরীচিকা , মরুভূমি হয়ে যায় নিমেষে। রম্যাণী দ্বিতীয় কুকিটা ভাঙে না, ক্লান্ত ভঙ্গিতে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসে। মেহুলের চোখে কি যেন  পড়ে, আঙুলরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রাত গভীর হয় , ক্যাফে ফাঁকা হতে থাকে। নটা বাজতেই চত্বর ফাঁকা। মেহুল প্লেট গুছিয়ে ফেলে ডাস্টবিনে। খুচরো গোনে নিঃশব্দে।  রম্যাণী দেওয়ালে মাথা হেলিয়ে বসে থাকে।
নীরবতা অগভীর আঁধারে পা দিয়ে ঢেউ তোলে।

মেহুল ক্লোজড বোর্ডটা ঘুরিয়ে দেয় । ধীর পায়ে হাত কচলে রম্যাণীর পিঠের পিছনে দাঁড়ায়। নারীর শরীর কাঁপছে। মায়ের শরীরও কাঁপত চাপা কান্নায়। আস্তে করে হাত রাখে হলুদ ফর্সা কাঁধে, বড় চেনা অকাল বর্ষণের আভাস ।
টেবিলে লুটোয় ক্লান্ত নারী, সাদা মেঝেতে আঁচল লুটোয়।
শ্রীফল ছুঁয়ে যায় টেবিলের ধার।

নারী আশ্রয়ের নামে বুক চায় , বাঁধভাঙা কান্নায় ভাসাতে। আক্রোশের কামে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে।

শাটার নামে । বন্ধু-পুরুষের বুক ঘেঁষে নারী অতিথিশালায় পৌঁছয়। কালো সোফা নগ্নতা ঢাকে নীল ভেলভেট চাদরে ।
রাতের বাঘিনী রক্তের স্বাদ ঠোঁটে মাখে।

সকাল আসে নিয়ম মেনে, বিছানায় দুটি শরীর, এক শরীর পাশ ফিরে শুয়ে থাকে চোখে হাত চাপা দিয়ে, অন্য শরীর তাকিয়ে থাকে ও শরীরের দিকে। এদিকের শরীর ওঠে, ক্লান্ত বাঘিনীর মেরুদন্ডের উপর ঠোঁট ছোঁয়ায়, কেঁপে ওঠে সে শরীর।

রাত কাটে।

শনিবার সকাল -

মেহুল বিছানা ছেড়ে পা রাখে মেঝেয়। মেঝে জুড়ে অবিন্যস্ত পোশাক। খাটের গায়ে আধা শাড়ির আঁচল, বাকি মেঝের লজ্জা বাড়ায়। আপনমনেই হেসে ওঠে সে।

শরীর ভোগের নেশাটা বাড়ছে মেহুলের।

সূর্যের  ছোঁয়ায়  নগ্ন ভেনাস অন্য সৌন্দর্য। দেখতে দেখতে মেহুল ধীর পায়ে বাথরুমে ঢোকে। ব্রাশের সাথে কথা সেরে শাওয়ার চালিয়ে দেয়।
শরীর জুড়ে কলঙ্কের দাগ মেহুলের আজ। সারা শরীর জুড়ে অন্য শরীরের গন্ধ, পিঠে নখের আঁচড় চিড়চিড় করে জ্বালা করে।  নিজেকেই আলিঙ্গন করে ভিজতে থাকে মানুষটা।

একসময় শেষ হয় স্নান। আজ জবা ফুল ছাড়াই সূর্যের দিকে হাত জোড় হয়,
দীর্ঘ ওঁ কার ধ্বনি,
" ওঁ জবাকুসুম... "

জবা গাছে আজ ভ্রুণ অনেক বেশী। কেউ আলগা বাঁধনে , কেউ ঠিক ঠাক, কেউ বাঁধন ভাঙা । পাতার ভেতর অংশ কুরে কুরে খেয়েছে পোকা , কুঁকড়ে গেছে। ঠিক যেন মায়ের সাথে তার সম্পর্কটা। সম্পর্কের ঘূণ পোকার মতই মনে হল মেহুল।

আজ অনেকগুলো ভ্রুণ সহ ফুটে থাকা ফুল ঝরে পড়ল প্রভুর পায়ে। তুলল না মেহুল, বরং পিছোতে লাগল জবা গাছের দিকে তাকিয়ে। ঘরে ঢুকে দেখল রম্যাণী প্রস্তুত তার স্বামী পরিত্যক্ত পাখির বাসায় ফিরে যেতে। আজ অনেক সামলে গেছে মানুষটা। সব মানুষের একটা সময় ভরসার জায়গা লাগে, যাদের থাকে না তারা দেওয়ালে পিঠ রাখে। মেহুলের হাত রম্যাণীর গাল ছোঁয়, কপালে ছোঁয় ঠোঁট । রম্যাণী আলিঙ্গন করে না , বাথরোব এক হাতের মুঠোয় ধরে থাকে।

রম্যাণী বেরিয়ে যায়, সভ্য সোফা নগ্ন হয়। গা এলায় মেহুল , নিজের দুই হাত উল্টে পাল্টে দেখে। তার হাতের তালু লালচে, মায়ের মত।  স্বভাবটাও বোধহয় মায়ের মত। হাত মুঠো করে, মুঠো খোলে। মনে পড়ে এই হাত ছুঁয়েছিল রম্যাণীর নোনতা স্বাদের চিবুক, পিঠ, হাত । আঙুল ছুঁয়েছিল ঠোঁট, কপাল থেকে ঝোড়ো চুল সরিয়ে ঠোঁটেরা মিলিত হয়েছিল। সঙ্গমে শীৎকার ছিল, অভিশাপ ছিল, অধিকার বোধ ছিল , দাবি ছিল না।  যেন মৈথুনরত মানুষেরা জানতই সকাল মানেই সীমান্ত পাঁচিলের গায়ে রোদ পড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠা।

ব্ল্যাক কফি নিয়ে বসে মেহুল , আজ ছুটি । সেই সন্ধ্যায় বেরোতে পারে একটা দরকারে, ইচ্ছে না হলে নাও বেরোতে পারে।

মায়েরও হাত লালচে ছিল, রাতে শুতে আসার সময় মনে হত আরও লাল হয়েছে। হাত বুলিয়ে দিত ছেলের ঘুমন্ত কপালে। চুলে বিলি কেটে দিত। পাশের ঘর থেকে গজরানি শোনা যেত। অসহায় মধ্যবয়সী পুরুষের গর্জন। মেহুল অনুভব করত মায়ের ঘামে ভেজা শরীর একই সাথে ঠান্ডা আবার উত্তপ্তও। কাল রম্যাণীর শরীর জুড়ে তেমনই ভাব খেলা করেছে। প্রতি ঝড়ের পর শান্ত হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলো প্রিয় হয়ে থাকবে সারা জীবন।

মেহুলের হঠাৎ চোখে পড়ে তার বাড়ির গেট খুলে ঢুকছে ক্যাফেতে দেখা প্রতিদিনকার মানুষটা ।

এখানে?

মেহুলকে অনুসরণ করছে নাকি!!  অনুসরণ করে পৌঁছে গেছে তার বাড়িতে ?

মেহুলের চোখ স্থির হয় মানুষটার উপর। মানুষটা চিরপরিচিত ঢং-এ জবাগাছের কাছে যায়, গুঁড়িতে হাত বোলায়। কুঁকড়ে যাওয়া পাতায় আঙুল বুলিয়ে আদর করে।মাথা ঠেকায় জবা গাছে। ফোনটা বেজে ওঠে। তার চোখের সামনে দিয়েই মানুষটা মাথা নীচু করে বেরিয়ে যায়।

মেহুল সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্ল্যাকবোর্ডের পাশেই রাখা থাকে বাহারি কাঁসার পাত্র। জল টল টলে, তলদেশে রঙিন কাঁচের মত দেখতে পাথর। পাত্রের উপর ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মেহুল।  নিজেকে চিনতে চায়, তাই বোধহয় বার বার ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে। প্রতিদিনের রুটিন তার ঘষে ঘষে মোছা ব্ল্যাকবোর্ডটা, ঝুঁকে দেখা নিজের প্রতিবিম্ব। মনে হয় মুখের একপাশ জেঠুর, অন্যপাশ বাবার । ভ্রু কুঁচকে ওঠে তার বিরক্তিতে ,  ক্লান্তিতে সোজা হয়।

চোখ পড়ে  যায় জর্জিও জ্যাকোবিডসের আঁকা ফার্স্ট স্টেপ ছবিতে। যদিও এই ছবির দুটি ভার্সন, এখানে প্রথম ছবির নকলটি সাজানো। বৃদ্ধ মানুষটি ছোট্ট নাতনিকে টেবিলের উপর হাঁটা শেখাচ্ছেন, অন্য প্রান্তে শিশুটির বড় দিদি বোনকে ধরে ফেলার মত পোশ্চার নিয়ে অপেক্ষারত। তার ছোট থেকে কিশোরবেলা সবটাই বিপত্নীক জেঠুর কোলে কোলেই কেটেছে। বেশ বড় অবধি দেখেছে জ্যেঠু বুড়ো হয়ে যেতে , বাবার সামনে কোলকুঁজো হয়ে যেতে।

জ্যেঠুর  মতই লালচে ফর্সা, আয়ত চোখ, টানা চোখের পাতা তার। অল্প কালো রেখা টানলে চোখ দুটো স্পষ্ট ইশারা করে। এই অভ্যাসটাও জেঠুর থেকেই রপ্ত করেছে সে। সকালে আচমন পুজো সেরে পায়রার পালক কাজলে ডুবিয়ে চোখে রেখা টেনে নিয়ে তবেই ঘর থেকে বেরোতে। সেসময় বাচ্ছা মানুষটা দরজায় পর্দা ধরে উঁকি দিত। জ্যেঠু বেরিয়েই তার হাত ধরে কাছে টেনে নিত। ভেজা ভেজা চন্দনের গন্ধ,  চন্দন মাখা প্রশস্ত বুকেতে।

একবার কে এক পিসি ঠাকুমা এসেছিল তাদের বাড়ি , খুঁটিয়ে দেখে মেহুলের গালে ঠোনা মেরে বলেছিল

“ আ মোলো যা , এ ছোঁড়া বিপ্রর মত দেখতে হইছে লা। বংশ বংশ! বংশের ব্যাটা অমনই দেখতে হবেই তো।”

বিপ্রদাস ছিল জেঠুর নাম।

বাবা রেশনের থলি নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

জ্যেঠু চেয়ারে দুলতে দুলতে বই নামিয়ে রেখে অপ্রস্তুত হাসি হেসেছিলেন। মায়ের মুখটা দেখা হয়নি মেহুলের , তাই জানে না কি ভাব খেলা করেছিল।

(ক্রমশ...)

লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860086967504480&id=707552542757924

No comments:

Post a Comment