Friday, June 1, 2018
Sunday, April 29, 2018
#মেলার_গল্প
#উপসংহার
#ধূপছায়া_মজুমদার
তারপর, বন্ধুরা, মেলার ক'টাদিন কেমন কাটলো? মনে হচ্ছে না কেমন হুশ করে দিনগুলো পেরিয়ে গেল? এই তো সেদিন মেলা বসলো, বাঁশ-তেরপলের কাঠামোর ওপর ওয়াটারপ্রুফ পলিথিনের চাদর দড়ি দিয়ে বেশ করে টেনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে অস্থায়ী দোকানের অস্থায়ী ছাদ তৈরি হলো, দোকানে দোকানে ইলেকট্রিকের তার টেনে নিয়ে গিয়ে আলো ঝোলানো হলো, ওদিকে 'হ্যালো টেস্টিং টেস্টিং হ্যালো ওয়ান টু থ্রি' শুনে শুনে কান ঝালাপালা হচ্ছিলো কদিন, মেলা শুরুর দিন হঠাৎ সেটাই বদলে গেলো "আমাদের এই বার্সিক মেলার অোনুষ্ঠান এবার সতেরো বছরে পড়ল' তে, আর ওই ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুকুর, কাক, আর প্রায় ওদের সঙ্গেই ভাগ্য ভাগ করে নেওয়া ভবঘুরেদের দল, তারাও সব গুটিগুটি পায়ে আসতে লাগলো মেলার মাঠের দিকে।
মেলার মাঠে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দেখা হয়ে গেল গঙ্গা যমুনা পতু আর রমেনের সঙ্গে। পুলিশ আর মানবাধিকারের টানাপোড়েনে ওদের ভবিষ্যতে কি লেখা আছে পড়া গেল না, তবে নেশার ঘোরে বকে যাওয়া রমেনের কথা শুনে মনে হলো, লোকটার বাইরেটা আর ভেতরটা বোধহয় একরকম নয়। অবশ্য আমরা বাইরে থেকে দেখে আর কতটুকু বুঝতে পারি? আমরা কি বুঝি, জোড়া মেয়েদের একজন যমুনা, সে তার নিজের 'সমাজে ফিট না হওয়া' চেহারাকে সাজিয়েগুছিয়ে রেখে কোন্ লড়াইয়ে যুঝতে চেষ্টা করে? নাকি আমরা বুঝতে পারি পতু কেন পঞ্চাশ টাকার নোটটা আলাদা করে তুলে রেখে দেয়? টানটা ঠিক কিসের?
এরপর আমরা দেখি টুম্পা আর তার মাকে। টুম্পাটা বড় অভিমানী, সেই কবে ওর মা গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়েছিল, সেই ব্যথা সে মেলায় আসার সময়েও বুকে বয়ে এনেছে। সেই অভিমানেই কি ছোট্ট মেয়েটা মায়ের আঁচল ছেড়ে একা একা বেরিয়ে পড়েছিল মেলায় ঘুরতে? তারপর আর চেনা পথে ফিরে যেতে পারেনি? না বোধহয়, অতটুকু মেয়ে কি আর অত ভেবে কাজ করে? ওর চোখে আর মনে ঝিলমিল লেগেছিল, চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল মেলার ঐশ্বর্যে, তাই ও হাঁটা দিয়েছিল অনির্দেশের পথে। বাকিরা কেউ ওকে খুঁজে পায়নি, কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিল ওকে। তারপর কি হল? খুব স্পষ্ট নয় সেটা, মোট কথা, সময়ের সরণি থেকে আর ফেরা হলো না টুম্পার। আহা, আরেকটু আগলালে হতো না? কি জানি!
এরপর আমাদের সামনে আসেন একমুঠো লজেন্স হাতে নিয়ে পোটলি বাবা, জীবনবাবু। যাঁর শরীরে জীবন ক্যান্সারের কলমে বিদায়ের নির্ঘণ্ট লিখে পাঠিয়েই দিয়েছে, তিনি কাঁধের ঝোলায় মুঠো মুঠো লজেন্স নিয়ে মেলা থেকে মেলায় ঘুরে বেড়ান স্রেফ একটু আনন্দ জীবনে ভরে নেবেন বলে। এঁর সঙ্গে আলাপের পরেও কি আমরা ভাবব জীবনের অনেকটা জুড়ে থাকে আঁধার? নাহ, সেটা উচিত হবে না, চলুন, আমরা বরং আলোর হাত ধরে হেঁটে যাই জীবনবাবুর কাছে, আনন্দের খোঁজে চলেছেন উনি, ওঁর সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে তো!
এর পর যার সঙ্গে আলাপ হলো, সে হচ্ছে টুবাই। সে তার 'কালো, সোয়েট করা ' মালতীমাসির ভক্ত, শহুরে উন্নাসিকতা আর উচ্চাকাঙক্ষার ঘেরাটোপে তার সরল শৈশবের স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে যায়, ব্যালান্সিং-এর খেলনার মতোই নিখুঁত ব্যালান্সিং শিখে যায় সেও। শুধু, তার বুকের মাঝে কোনও এক কোণে থেকে যায় কি নাগরদোলা আর পাঁপড় -জিলিপির কোনও ছবি? সেই ছবি নিয়ে সে কি তার উত্তরসূরির হাত ধরে একদিন এসে দাঁড়াবে এই মেলার মাঠে? উত্তর দেবে সময়।
মেলায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন শেষ বিকেলে দেখা যায় তিনজনের একটা পরিবার হেঁটে চলে যাচ্ছে, বাড়ি ফিরছে, পথে ফেলে যাচ্ছে মেলার চিহ্নদের, জিলিপির ফোঁটা ফোঁটা রস, পাঁপড়ভাজার হলদে গুঁড়ো, ওদের ঝোলায় আছে এক মস্ত দৌলত, ছবিঘরের ক্যামেরায় তোলা একটা আস্ত ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ। ওদের চুড়ি কেনা হয়নি, মাথায় দেওয়ার শোলার টোকা, পায়ে দেওয়ার চটি, কিচ্ছুটি কেনা হয়নি, বদলে ওদের ছেলেটার মুখে হাসি ফুটেছে, আর কি চাই? মনে পড়ে যায়, অনেকদিন আগে এক গ্রাম্য মাঝির চেয়ে নেওয়া আশীষের কথা, "আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে"! এ চাওয়া যে চিরন্তন। মুখগুলো বদলে যায়, চাওয়াটা সেই একই থাকে। তারই জন্য কষ্ট, তারই জন্য ত্যাগস্বীকার, সবকিছু।
এরপর এসে দাঁড়াতে হলো গগন ময়রার দোকানে, তার জিলিপির নামডাক যা, চেখে দেখতে তো হবেই। রসে টইটম্বুর জিলিপি খেতে খেতে জানা গেল এক আপাতকঠিন ব্যবসায়ীর এক অসম লড়াইয়ের কাহিনী, এক সাধারণ মানুষ থেকে মহীরুহ হয়ে ওঠার আখ্যান। নেলো হাবলা খেঁদি মান্তিদের গ্রাসাচ্ছাদনের ভারই কেবল নয়, তাদের কর্মসংস্থানেরও রাস্তা খোলা রাখবে বলে প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে গগন ময়রা আর মণি, হয়তো নিজেদের অজান্তেই, এ যে 'সমাজসেবা', সেই অনুভবের অহঙ্কার তাদের মনে জায়গা করে নিচ্ছে কি? জানা নেই। তাদের এই লড়াই ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে, মানুষের মনে জেগে উঠুক শুভবোধ, পরমেশ্বরের কাছে আপাতত এই প্রার্থনা করে চলুন এগিয়ে যাই আমরা।
এবার দেখা হবে নিতাই বেলুনওয়ালার সঙ্গে। ওই যে, পা মুড়ে বসে ছবি আঁকতে থাকা ছেলেটির পাশে বসে পাজামা টা একটু তুলে কাটা পায়ের ঘষা খাওয়া জায়গাটা চুলকে নিচ্ছে নিতাই, আর ছবি আঁকিয়ে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখছে তার 'মডেল' কে সে ভুল করে গোটা মানুষ ভেবে ফেলেছিল। আহা, থাক না, ক্ষতি কি? দ্যাখো দেখি, নিতাই ক্ষ্যাপা কেমন খুশি হলো নিজের গোটা চেহারাটাকে ছবির দুনিয়ায় দেখতে পেয়ে! এইই তো পাওয়া হে বন্ধুরা, ওই যে একলা নিতাই বেলুনওয়ালা নিজের একখানা গোটা ছবি আর হাতে সেই পুরাকালের ঝুমঝুমি বেলুন দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে একটা মস্ত বেলুন উপহার দিয়ে বসল শিল্পী মানুষটিকে, ওদের ওই খুশি আর বিস্ময়টুকুই রয়ে যাবে, ফিরে ফিরে আসবে আঁধারঘেরা মুহূর্তেও, এক লহমায় আলোয় ভরে যাবে চারপাশ। বাকি সবই মায়া, কালের ক্যানভাসে ভাসমান বুদবুদ, ব্যস।
চড়কের মেলা, সেখানে লোহার শলায় জিভ ফোঁড়া, গালে বাণ মারা, আগুনে হাঁটা এসব আসবে না, তাই কি আর হয়? তাই এবার আমাদের দেখা হয়ে যায় বুধনের সঙ্গে, চড়কপূজার ব্রতপালনের নামে নিজেকে যে বছরের পর বছর ক্ষতবিক্ষত করে চলে, কোন্ ইষ্টলাভের আশায়, জানা নেই। তবে করে, সে, এবং গ্রামবাংলার আরও অগণিত মানুষ এভাবেই ব্রতপালন করে আসছে বহুদিন ধরে। বুধনের কষ্টে চোখ উপচে জল আসে তার স্ত্রী মালতীর, তার কষ্টে প্রলেপ লাগাতে উঠেপড়ে লাগেন প্রাচীন আধুনিক মানুষ অমলা। তাঁদের আগলে রাখার মায়ায় জড়িয়ে বুধন কি সামনের বছর পিছিয়ে আসবে এই কষ্টদায়ক আচার পালন থেকে? দেখা যাক, অপেক্ষায় থাকি আমরা, আরও এক বছর।
বৈশাখের মেলার এক প্রধান চরিত্র হলো কালবৈশাখী ঝড়, আর মেলায় দুই মনের মিলন হবে, দুই মন একসুতোয় বাঁধা পড়ে নতুন পথে চলা শুরু করবে এই মেলার মাঠ থেকেই, এ তো খুবই স্বাভাবিক। তাই মেলার মাঠে এক ঝড়ের সন্ধ্যায় শুরু হয় জয়ন্ত আর মিঠির একসাথে পথ চলা। জয়ন্তকে ভালো মানুষ বলেই মনে হয়, সে নিশ্চয়ই মিঠিকে ভালো রাখবে, মিঠি -জয়ন্তর নতুন সংসার শান্তি আর স্বস্তিতে ভরে উঠবে, এই আশা মনে রেখে আমরা তাকাই ঋজুর দিকে, সেই ঝড়ের সন্ধ্যাতেই যে ঋজু অসুরবধ করে এক নতুন জন্ম লাভ করেছে। আর নোলাবুড়ো? কে নেবে তার ভাতের ভার? জয়ন্ত কি তাকেও নিয়ে গেল কলকাতা? নাকি তার হাত এবার ধরবে ঋজু, প্রায়শ্চিত্ত করবে ফেলে আসা পাপের? ভগবান আর নোলাবুড়োকে দুপাশে নিয়ে একই টেবিলে বসে খাওয়া সারতে পারবে কি ঋজু? সময়ই বলুক সে কথা, আমরা বরং সামনে এগোই।
এভাবেই শেষ হয় চড়কের মেলা, খোলা হয় প্যান্ডেল, খোলা হয় নাগরদোলার টুকরোদের। আবার অন্য কোথাও গিয়ে জড়ো হবে এরা, হয়তো গোবিন্দপুর, কিংবা অন্য কোথাও। আমরাও যাবো সেসব মেলায়, পায়ে পায়ে, দেখা হয়ে যাবে চেনামুখগুলোর সঙ্গে, চিনে নেবো আরও কিছু নতুন মুখ। জীবন বয়ে যাবে তার নিজের স্রোতে, দিনরাত্রি আসবে যাবে, আমরা খুঁজে নিতে থাকব জীবনরসের গল্প, মেলার মাঠে।
(সমাপ্ত)
****************************
***'মেলার গল্প ' আপাতত এখানেই শেষ। বন্ধুরা, সঙ্গে থাকার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। সিরিজটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত জানতে চাই আমরা, আপনাদের মনের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছি, আমরা জানতে আগ্রহী।
সিরিজশেষে পাঠকদের কাছ থেকে সিরিজের থিমের ওপর গল্প চাওয়ার রেওয়াজ বজায় থাকছে এই বারও। পাঠকবন্ধুদের কাছে অনুরোধ, মেলা নিয়ে লেখা অপ্রকাশিত গল্প-কবিতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। মেলা হয়ে উঠুক সবার জন্য।
******************************
**'মেলা' সিরিজের সবকটি গল্পের লিঙ্ক একত্রে দেওয়া রইলো নিচে, বন্ধুদের জন্য :
মেলার গল্পের গৌরচন্দ্রিকা, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878076192372224&id=707552542757924
গঙ্গা যমুনা, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067565706420&id=707552542757924
সময় সরণি, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878066922373151&id=707552542757924
পোটলি বাবা, দেবলীনার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878074705705706&id=707552542757924
টুবাইয়ের গল্প, অভিষেকের কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878066399039870&id=707552542757924
পদচিহ্ন, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067832373060&id=707552542757924
দয়াময়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878073859039124&id=707552542757924
স্বপ্নফানুস, দেবলীনার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878065759039934&id=707552542757924
মানত, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067349039775&id=707552542757924
চক্রবৎ (সিনেমায় যেমন হয়), অনিন্দ্যর কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=882580938588416&id=707552542757924
#ধূপছায়া_মজুমদার
তারপর, বন্ধুরা, মেলার ক'টাদিন কেমন কাটলো? মনে হচ্ছে না কেমন হুশ করে দিনগুলো পেরিয়ে গেল? এই তো সেদিন মেলা বসলো, বাঁশ-তেরপলের কাঠামোর ওপর ওয়াটারপ্রুফ পলিথিনের চাদর দড়ি দিয়ে বেশ করে টেনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে অস্থায়ী দোকানের অস্থায়ী ছাদ তৈরি হলো, দোকানে দোকানে ইলেকট্রিকের তার টেনে নিয়ে গিয়ে আলো ঝোলানো হলো, ওদিকে 'হ্যালো টেস্টিং টেস্টিং হ্যালো ওয়ান টু থ্রি' শুনে শুনে কান ঝালাপালা হচ্ছিলো কদিন, মেলা শুরুর দিন হঠাৎ সেটাই বদলে গেলো "আমাদের এই বার্সিক মেলার অোনুষ্ঠান এবার সতেরো বছরে পড়ল' তে, আর ওই ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুকুর, কাক, আর প্রায় ওদের সঙ্গেই ভাগ্য ভাগ করে নেওয়া ভবঘুরেদের দল, তারাও সব গুটিগুটি পায়ে আসতে লাগলো মেলার মাঠের দিকে।
মেলার মাঠে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের দেখা হয়ে গেল গঙ্গা যমুনা পতু আর রমেনের সঙ্গে। পুলিশ আর মানবাধিকারের টানাপোড়েনে ওদের ভবিষ্যতে কি লেখা আছে পড়া গেল না, তবে নেশার ঘোরে বকে যাওয়া রমেনের কথা শুনে মনে হলো, লোকটার বাইরেটা আর ভেতরটা বোধহয় একরকম নয়। অবশ্য আমরা বাইরে থেকে দেখে আর কতটুকু বুঝতে পারি? আমরা কি বুঝি, জোড়া মেয়েদের একজন যমুনা, সে তার নিজের 'সমাজে ফিট না হওয়া' চেহারাকে সাজিয়েগুছিয়ে রেখে কোন্ লড়াইয়ে যুঝতে চেষ্টা করে? নাকি আমরা বুঝতে পারি পতু কেন পঞ্চাশ টাকার নোটটা আলাদা করে তুলে রেখে দেয়? টানটা ঠিক কিসের?
এরপর আমরা দেখি টুম্পা আর তার মাকে। টুম্পাটা বড় অভিমানী, সেই কবে ওর মা গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়েছিল, সেই ব্যথা সে মেলায় আসার সময়েও বুকে বয়ে এনেছে। সেই অভিমানেই কি ছোট্ট মেয়েটা মায়ের আঁচল ছেড়ে একা একা বেরিয়ে পড়েছিল মেলায় ঘুরতে? তারপর আর চেনা পথে ফিরে যেতে পারেনি? না বোধহয়, অতটুকু মেয়ে কি আর অত ভেবে কাজ করে? ওর চোখে আর মনে ঝিলমিল লেগেছিল, চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল মেলার ঐশ্বর্যে, তাই ও হাঁটা দিয়েছিল অনির্দেশের পথে। বাকিরা কেউ ওকে খুঁজে পায়নি, কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিল ওকে। তারপর কি হল? খুব স্পষ্ট নয় সেটা, মোট কথা, সময়ের সরণি থেকে আর ফেরা হলো না টুম্পার। আহা, আরেকটু আগলালে হতো না? কি জানি!
এরপর আমাদের সামনে আসেন একমুঠো লজেন্স হাতে নিয়ে পোটলি বাবা, জীবনবাবু। যাঁর শরীরে জীবন ক্যান্সারের কলমে বিদায়ের নির্ঘণ্ট লিখে পাঠিয়েই দিয়েছে, তিনি কাঁধের ঝোলায় মুঠো মুঠো লজেন্স নিয়ে মেলা থেকে মেলায় ঘুরে বেড়ান স্রেফ একটু আনন্দ জীবনে ভরে নেবেন বলে। এঁর সঙ্গে আলাপের পরেও কি আমরা ভাবব জীবনের অনেকটা জুড়ে থাকে আঁধার? নাহ, সেটা উচিত হবে না, চলুন, আমরা বরং আলোর হাত ধরে হেঁটে যাই জীবনবাবুর কাছে, আনন্দের খোঁজে চলেছেন উনি, ওঁর সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে তো!
এর পর যার সঙ্গে আলাপ হলো, সে হচ্ছে টুবাই। সে তার 'কালো, সোয়েট করা ' মালতীমাসির ভক্ত, শহুরে উন্নাসিকতা আর উচ্চাকাঙক্ষার ঘেরাটোপে তার সরল শৈশবের স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে যায়, ব্যালান্সিং-এর খেলনার মতোই নিখুঁত ব্যালান্সিং শিখে যায় সেও। শুধু, তার বুকের মাঝে কোনও এক কোণে থেকে যায় কি নাগরদোলা আর পাঁপড় -জিলিপির কোনও ছবি? সেই ছবি নিয়ে সে কি তার উত্তরসূরির হাত ধরে একদিন এসে দাঁড়াবে এই মেলার মাঠে? উত্তর দেবে সময়।
মেলায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন শেষ বিকেলে দেখা যায় তিনজনের একটা পরিবার হেঁটে চলে যাচ্ছে, বাড়ি ফিরছে, পথে ফেলে যাচ্ছে মেলার চিহ্নদের, জিলিপির ফোঁটা ফোঁটা রস, পাঁপড়ভাজার হলদে গুঁড়ো, ওদের ঝোলায় আছে এক মস্ত দৌলত, ছবিঘরের ক্যামেরায় তোলা একটা আস্ত ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ। ওদের চুড়ি কেনা হয়নি, মাথায় দেওয়ার শোলার টোকা, পায়ে দেওয়ার চটি, কিচ্ছুটি কেনা হয়নি, বদলে ওদের ছেলেটার মুখে হাসি ফুটেছে, আর কি চাই? মনে পড়ে যায়, অনেকদিন আগে এক গ্রাম্য মাঝির চেয়ে নেওয়া আশীষের কথা, "আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে"! এ চাওয়া যে চিরন্তন। মুখগুলো বদলে যায়, চাওয়াটা সেই একই থাকে। তারই জন্য কষ্ট, তারই জন্য ত্যাগস্বীকার, সবকিছু।
এরপর এসে দাঁড়াতে হলো গগন ময়রার দোকানে, তার জিলিপির নামডাক যা, চেখে দেখতে তো হবেই। রসে টইটম্বুর জিলিপি খেতে খেতে জানা গেল এক আপাতকঠিন ব্যবসায়ীর এক অসম লড়াইয়ের কাহিনী, এক সাধারণ মানুষ থেকে মহীরুহ হয়ে ওঠার আখ্যান। নেলো হাবলা খেঁদি মান্তিদের গ্রাসাচ্ছাদনের ভারই কেবল নয়, তাদের কর্মসংস্থানেরও রাস্তা খোলা রাখবে বলে প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে গগন ময়রা আর মণি, হয়তো নিজেদের অজান্তেই, এ যে 'সমাজসেবা', সেই অনুভবের অহঙ্কার তাদের মনে জায়গা করে নিচ্ছে কি? জানা নেই। তাদের এই লড়াই ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে, মানুষের মনে জেগে উঠুক শুভবোধ, পরমেশ্বরের কাছে আপাতত এই প্রার্থনা করে চলুন এগিয়ে যাই আমরা।
এবার দেখা হবে নিতাই বেলুনওয়ালার সঙ্গে। ওই যে, পা মুড়ে বসে ছবি আঁকতে থাকা ছেলেটির পাশে বসে পাজামা টা একটু তুলে কাটা পায়ের ঘষা খাওয়া জায়গাটা চুলকে নিচ্ছে নিতাই, আর ছবি আঁকিয়ে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখছে তার 'মডেল' কে সে ভুল করে গোটা মানুষ ভেবে ফেলেছিল। আহা, থাক না, ক্ষতি কি? দ্যাখো দেখি, নিতাই ক্ষ্যাপা কেমন খুশি হলো নিজের গোটা চেহারাটাকে ছবির দুনিয়ায় দেখতে পেয়ে! এইই তো পাওয়া হে বন্ধুরা, ওই যে একলা নিতাই বেলুনওয়ালা নিজের একখানা গোটা ছবি আর হাতে সেই পুরাকালের ঝুমঝুমি বেলুন দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে একটা মস্ত বেলুন উপহার দিয়ে বসল শিল্পী মানুষটিকে, ওদের ওই খুশি আর বিস্ময়টুকুই রয়ে যাবে, ফিরে ফিরে আসবে আঁধারঘেরা মুহূর্তেও, এক লহমায় আলোয় ভরে যাবে চারপাশ। বাকি সবই মায়া, কালের ক্যানভাসে ভাসমান বুদবুদ, ব্যস।
চড়কের মেলা, সেখানে লোহার শলায় জিভ ফোঁড়া, গালে বাণ মারা, আগুনে হাঁটা এসব আসবে না, তাই কি আর হয়? তাই এবার আমাদের দেখা হয়ে যায় বুধনের সঙ্গে, চড়কপূজার ব্রতপালনের নামে নিজেকে যে বছরের পর বছর ক্ষতবিক্ষত করে চলে, কোন্ ইষ্টলাভের আশায়, জানা নেই। তবে করে, সে, এবং গ্রামবাংলার আরও অগণিত মানুষ এভাবেই ব্রতপালন করে আসছে বহুদিন ধরে। বুধনের কষ্টে চোখ উপচে জল আসে তার স্ত্রী মালতীর, তার কষ্টে প্রলেপ লাগাতে উঠেপড়ে লাগেন প্রাচীন আধুনিক মানুষ অমলা। তাঁদের আগলে রাখার মায়ায় জড়িয়ে বুধন কি সামনের বছর পিছিয়ে আসবে এই কষ্টদায়ক আচার পালন থেকে? দেখা যাক, অপেক্ষায় থাকি আমরা, আরও এক বছর।
বৈশাখের মেলার এক প্রধান চরিত্র হলো কালবৈশাখী ঝড়, আর মেলায় দুই মনের মিলন হবে, দুই মন একসুতোয় বাঁধা পড়ে নতুন পথে চলা শুরু করবে এই মেলার মাঠ থেকেই, এ তো খুবই স্বাভাবিক। তাই মেলার মাঠে এক ঝড়ের সন্ধ্যায় শুরু হয় জয়ন্ত আর মিঠির একসাথে পথ চলা। জয়ন্তকে ভালো মানুষ বলেই মনে হয়, সে নিশ্চয়ই মিঠিকে ভালো রাখবে, মিঠি -জয়ন্তর নতুন সংসার শান্তি আর স্বস্তিতে ভরে উঠবে, এই আশা মনে রেখে আমরা তাকাই ঋজুর দিকে, সেই ঝড়ের সন্ধ্যাতেই যে ঋজু অসুরবধ করে এক নতুন জন্ম লাভ করেছে। আর নোলাবুড়ো? কে নেবে তার ভাতের ভার? জয়ন্ত কি তাকেও নিয়ে গেল কলকাতা? নাকি তার হাত এবার ধরবে ঋজু, প্রায়শ্চিত্ত করবে ফেলে আসা পাপের? ভগবান আর নোলাবুড়োকে দুপাশে নিয়ে একই টেবিলে বসে খাওয়া সারতে পারবে কি ঋজু? সময়ই বলুক সে কথা, আমরা বরং সামনে এগোই।
এভাবেই শেষ হয় চড়কের মেলা, খোলা হয় প্যান্ডেল, খোলা হয় নাগরদোলার টুকরোদের। আবার অন্য কোথাও গিয়ে জড়ো হবে এরা, হয়তো গোবিন্দপুর, কিংবা অন্য কোথাও। আমরাও যাবো সেসব মেলায়, পায়ে পায়ে, দেখা হয়ে যাবে চেনামুখগুলোর সঙ্গে, চিনে নেবো আরও কিছু নতুন মুখ। জীবন বয়ে যাবে তার নিজের স্রোতে, দিনরাত্রি আসবে যাবে, আমরা খুঁজে নিতে থাকব জীবনরসের গল্প, মেলার মাঠে।
(সমাপ্ত)
****************************
***'মেলার গল্প ' আপাতত এখানেই শেষ। বন্ধুরা, সঙ্গে থাকার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। সিরিজটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত জানতে চাই আমরা, আপনাদের মনের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছি, আমরা জানতে আগ্রহী।
সিরিজশেষে পাঠকদের কাছ থেকে সিরিজের থিমের ওপর গল্প চাওয়ার রেওয়াজ বজায় থাকছে এই বারও। পাঠকবন্ধুদের কাছে অনুরোধ, মেলা নিয়ে লেখা অপ্রকাশিত গল্প-কবিতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। মেলা হয়ে উঠুক সবার জন্য।
******************************
**'মেলা' সিরিজের সবকটি গল্পের লিঙ্ক একত্রে দেওয়া রইলো নিচে, বন্ধুদের জন্য :
মেলার গল্পের গৌরচন্দ্রিকা, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878076192372224&id=707552542757924
গঙ্গা যমুনা, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067565706420&id=707552542757924
সময় সরণি, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878066922373151&id=707552542757924
পোটলি বাবা, দেবলীনার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878074705705706&id=707552542757924
টুবাইয়ের গল্প, অভিষেকের কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878066399039870&id=707552542757924
পদচিহ্ন, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067832373060&id=707552542757924
দয়াময়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ধূপছায়ার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878073859039124&id=707552542757924
স্বপ্নফানুস, দেবলীনার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878065759039934&id=707552542757924
মানত, সুস্মিতার কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=878067349039775&id=707552542757924
চক্রবৎ (সিনেমায় যেমন হয়), অনিন্দ্যর কলমে :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=882580938588416&id=707552542757924
Wednesday, April 18, 2018
দাবানল
স্বর্ণদ্বীপ_চৌধুরী
“খেন্তি রে, খেন্তি পোড়ারমুখী, খেন্তিইইইই, ওরে ও খেন্তি, আ মোলো যা, কানের মাতা কেয়ে বসে আচিস নাকি?”
“ও মা ফুলঠাকমা যে, শুনতে পাইনি গো, কড়ায় ভাজা বসিয়ে এইচি, তা বলো, কি জন্যি এত্ত হাঁক দিচ্চিলে?”
“শিগগির চল, বড়বাবু, তোরে ডাক দিচে,বলতিচে কি দরকার আছে। আয় আয়!”
গতিক বড় সুবিধার লাগলো না সব শুনে, খেন্তি ওরফে চম্পার। এই বড়বাবু লোকটি যে একেবারেই সুবিধার নয়, এই তল্লাটে সব ঘরের মানুষ সেই কথা জানে। নামেই পুলিশ, আসলে রাজনৈতিক দলের পান্ডা-গুন্ডাদের ফোকটে ফূর্তির রসদ জোগানোর দালাল, আসবে আর মেয়েদের নিয়ে যাবে সেই মতলবে। দুগ্গামাসী ওরফে এই বস্তির সর্বেসর্বাও কিছু বলে না একে, তারও যে অনেক স্বার্থ আছে। কতরকম বেআইনি নেশার কারবার চালায় দুগ্গামাসী এই বস্তির পায়রার খোপগুলোতে, সব জানা স্থানীয় ওই নেতাদের আর বড়বাবুর, তাই কোনো আইন দুগ্গামাসীর টিকিটাও ছুঁতে পারে না। শুনেছে, অনেক আগে এখানে বদলি হয়ে আসা এক পুলিশ অফিসার এসব নিয়ে তদন্ত করে, ধর-পাকড় শুরু করেছিল,তবে কারুর শাস্তিই সেভাবে স্থায়ী হয়নি। সেই অফিসারকে কচুকাটা করে ভাসিয়ে দিয়েছিল ওই রূপনারায়ণের জলে এখানকার দারোয়ানের দল। তার অভাগী স্ত্রী, স্বামীর মুখটুকও পায়নি দেখতে শেষবারের মতো। কি করেই বা পাবে, মাথাটাই তো পাওয়া যায়নি এমন কাজের সাফাই! পোশাকের মধ্যে থাকা কার্ড দেখে শনাক্ত করা হয়েছিল ওর আট টুকরো দেহটা, কিছুটা তার আবার জলজ প্রাণীও ঠুকরে খেয়েছে।
চম্পা তখনও এই বস্তিতে আসেনি, ওর প্রাণের সখী সোহাগীর মুখে এসব শুনেছে। সোহাগী বলেছিল, “মুখ দেখতি পাবে কি করে রে খেন্তি! আমি দেকেচিলাম, কানাই আর খালিদ, দুইজনা ওই মুন্ডুটা নিয়ে লুফালুফি খেলতি খেলতি ফেলি দিলো নদের জলে।”
সোহাগীর জন্ম থেকে বড় হওয়া এই নরকেই, ওর মা এখানে এসেছিল অনেক ছোটবেলায়, বাপ-মা মরা একরত্তি মেয়ের খাওয়ানো-পরানোর খরচ থেকে বাঁচতে, তার কাকা বেচে দিয়ে গেছিল এই পাড়ায়। সোহাগীর মা এইডস হয়ে মরে বেঁচেছে অনেক আগেই, সোহাগী তখন বেশ ছোট, ফুলঠাকুমা ওকে বড় করেছে, আর এখন ও নিজেও এখানকার অভিজ্ঞ পণ্যজীবী। শুনেছে শহরের শিক্ষিত, আধুনিক মননের অধিকারী নারী-পুরুষেরা, সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থার প্রতিনিধিরা অনেক কাজ করে ওদের পুনর্বাসনের জন্যে। কত প্রকল্প, কত সহায়তা, কত উন্নয়নের আলো, তাদের মতো কিছু কিছু মেয়েদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখায়, তবে সেসব ওই কলকাতা শহরের সোনাগাছির জন্যে, মফস্বলের প্রান্তে থাকা বেশ্যাপট্টির গলিতে, সেই আলোর ক্ষীণ কিরণটুকুও এসে পৌঁছায় না।
“কি রে চল! সঙের মতো রংমাখা রূপ নিয়ে দোরে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস লো? তোর ঘরে নাগর আচে নাকি? থাকলে অন্য কাউকে পাঠাচ্চি, তোরে ডাকচে বড়বাবু, আয় একুনি।” দুগ্গামাসীর অত্যুগ্র কুহরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হলো চম্পার, ফুলঠাকুমার সাথে সাথে দুগ্গামাসীও এসেছিল পেছন পেছন তাকে নিয়ে যেতে, অতটা খেয়াল করেনি। বিনা বাক্যব্যয়ে চম্পা পিছু নিলো দুগ্গামাসীর, লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে ফুলঠাকুমাও ধীর পদক্ষেপে তাদের। রক্ষাকালীর বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বড়োবাবুর মুখটা দূর থেকে মা বগলার পায়ের তলায় থাকা অসুরের মুখের মতো লাগলো এক ঝলক, লালসাময় রসনা লকলকিয়ে যেন লেহন করছে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর শরীর, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে বারাঙ্গনাদের ব্যবহারজীর্ণ লাবণ্য।
“এই যে বাবু, নে যাও, এই চম্পাকে তো তুমি চেনোই ভালোমতো, আর হেইটা হলো স্বপ্না, নতুন আমদানি। এহনো পোক্ত না, তবে নে যাও, ও ঠিক পারবে এহন। দেখেশুনে নে আমার ঘরে এসো।”
“তোর ঘরে কি জন্যে রে দুগ্গা! সবই তো ছিবড়ে হয়ে গেছে তোর!”
বড়বাবুর বিশ্রী কথা আর বিশ্রী ইঙ্গিতওয়ালা হাসির খ্যাক খ্যাক আওয়াজ যেন কানে গিয়ে বিঁধলো চম্পার, যদিও দুগ্গামাসীকে সে মোটেই পছন্দ করে না, তাও ইচ্ছা করছিল পায়ের জীর্ণ পাদুকার সদপ্রয়োগ করে ওই ভন্ড রক্ষাকর্তার দুটি গালে।
“ বাজে কতা রাখো দিকি! দেনাপাওনা কি সকলের সামনে করবে নাকি!আর ছিবড়ে তো তুমিও চুষতে আসো মাঝে মাঝে, দিনের আলোয় চিনতে অসুবিধা হচ্চে বুঝি, সরাবো নাকি বুকের কাপড়টা?”
যাক, দুগ্গামাসীর উত্তরটা ভালোই ছিল, চম্পা ভাবে মনে মনে, তবে এই লোকটা যা বেহায়া, এর মোটেই গায়ে লাগবে না, আর গায়ে যে লাগেনি বড়বাবুর একেবারেই, প্রত্যুত্তরে দেওয়া হাসিতেই তা বেশ পরিষ্কার।
“আচ্ছা চম্পা শোন, বাবু তোকে নে যাবে, গোল করবিনি, স্বপ্নারে নে শান্ত হয়ে যাবি, নেতাবাবুর কিছু অতিথ আসবেন, তাদের খাতির যত্ন করবি। ওনারা যেমনটি বলবেন করবি, তিনদিন বাদে তোদের দে যাবেন বড়বাবু। তখন পাবি তোদের ভাগ। স্বপ্নারে একটু শিকিয়ে দিবি। ও মাগী সুবিদার নয়।”
দুগ্গামাসী বলার আগেই এরকম কিছুর একটা আঁচ পেয়েছিল চম্পা, এখন আর সন্দেহ রইলো না। স্বপ্নাকে দেখে মনে হলো বলির আগে বেঁধে রাখা পাঁঠা, চারদিকে আড়চোখে দেখছে আর কাঁপছে। এবারে তার মানে অর্থবান কোনো সৌখিন মক্কেলের বায়না আছে, নাহলে দেনাপাওনা,ভাগ-বখরা, এসবের ধারেকাছে দিয়েও যায় না ওই বড়বাবু। স্বপ্নাকে দেখে বড় মায়া হলো চম্পার, গলার কাছে একটা দলাপাকানো চাপা কষ্ট আবার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো অনেকদিন বাদে। বছর পাঁচেক আগে চম্পাও এমন করেই দাঁড়িয়েছিল, যখন তাকে পাঠানো হচ্ছিল জনৈক এক নেতা, দুগ্গামাসীর কথায় ‘মালদার বাবু’র মনোরঞ্জন করতে।
গরিবের মেয়ে ছিল চম্পা ওরফে মীনাক্ষী,স্কুল পালিয়ে ভালোবেসেছিল গ্রামে কয়েকদিনের জন্যে কন্ট্রাক্ট’এর কাজ করতে আসা অজ্ঞাতকুলশীল রাজুকে। বিয়ের পর রাজু ওকে এখানে রেখে যায়, দুগ্গামাসীকে ওর মাসি পরিচয় দিয়ে,কথা দিয়েছিল বাড়িতে জানিয়ে তারপরে এসে তাকে পূর্ণ মর্যাদায় নিয়ে যাবে তার শ্বশুরের ভিটেয়,কথা রাখতে রাজু আর ফিরে আসেনি। চম্পার আজও স্পষ্ট মনে আছে, প্রথমবার ব্যবসায় পাঠানোর আগে, দুগ্গামাসী জোর করে মুছে দিয়েছিল ওর সিঁথির সিঁদুর, ভেঙে দিয়েছিল শাঁখা-পলা, বলেছিল ‘বেশ্যার বর হয়না রে হারামজাদী, বাবু হয়!’। সেদিন অবশ্য শুধু শাঁখা পলা নয়, ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল ওর পূর্বপরিচয়, ওর বিশ্বাস আর সর্বোপরি ওর মন। দুগ্গামাসীর দেওয়া নাম ‘চম্পা’।তার মতো সবারই এখানে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে, সোহাগী বলেছিল”এ তো অন্য জেবন রে চম্পা, হেইখানে পুরাতন নামের কোনো কাম নেই”।চম্পা অবশ্য জানে নাম পরিবর্তনের কারণ, যাতে কোনোদিন কেউ কোনোভাবেই ফিরে যাওয়ার পথের সন্ধান তাদের দিতে না পারে। চম্পার স্পষ্ট মনে আছে, ওর প্রথম ক্রেতার অত্যাচারের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়েছিল চম্পা। যখন হুঁশ ফেরে, দেখে দামী পালংকের ধবধবে সাদা চাদর ওর যোনি থেকে নিঃশব্দে নিঃসৃত টাটকা রক্তে ভিজে গেছে । কোনোরকমে টলতে টলতে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াতেই, কে যেন খামচে ধরলো স্তনাগ্র পিছন থেকে, দৈহিক বুভুক্ষা বাকি ছিল বুঝি তখনও ! দেহে এতো শক্তি ছিলো না যে নিজেকে ছাড়ায়, বুঝেছিল বাঁধা দিতে গেলে নির্যাতন বাড়বে, চুপ করে মড়ার মতো পড়েছিল বেশ কিছুক্ষণ, মদ্যপ লোকটা কিছুক্ষণ তার মধ্যে উত্তেজনা সঞ্চারের বৃথা চেষ্টা করে, তার কোনো সাড়া না পেয়ে কিছু বাদে নিজেই বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে। খবর দিয়েছিল কানাই দালালকে।একটা কাপড় জড়িয়ে,কানাই কোনোরকমে তুলে এনেছিল বাবুর বাড়ি থেকে চম্পাকে, তারপরে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল সুস্থ হয়ে ব্যবসায় ফিরতে। মাঝে কয়েকবার পালাতেও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। বরং যে শাস্তি জুটেছিল তার বদলে, তা ভাবলে এখনো শিউরে ওঠে ও মনে মনে। কানাই, খালিদ, ভুবন আর পিটার, দুগ্গামাসীর চার পোষ্য মনুষ্যরূপী নরখাদক, একসাথে চড়াও হয়েছিল তার নগ্ন শরীরের ওপর! তাই এখন আর এইসব নিয়ে ভাবেনা চম্পা, পালাবার রাস্তা বন্ধ, থাকতে যখন হবে এখানেই, ব্যবসা না করলে খাবে কি! বাইরের জগৎটা অনেকদিন আগেই ছেড়ে এসেছে ওর মতো এখানে থাকা বাকি মেয়েরা, ফিরে গিয়ে অন্যভাবে বাঁচা যাবে কি যাবে না সে তো ভাবনাতেই অনেক দূর, প্রগাঢ় ভীতি নিশ্চিন্ত বাসা বেঁধেছে অন্তরে, এই চেনা জায়গা ছেড়ে বেরোতে।
“এই যে নবাবের বিটি, যাও, পরনের কাপড়কানা বদলে নাও, এরপরে তিনদিন আর পরনে কিচু উঠবে কিনা, সাজতে সময় পাবে কিনা কে জানে! এই সুপ্রিয়া, নে যা তো স্বপ্নারে, সাজায়ে নিয়ে আয়, চম্পা মা আমার তো রেডিই আচে।”
দুগ্গামাসীর আদেশে জনৈকা সুপ্রিয়া, যে এখনো অব্দি শুধু শয্যা ছাড়া কারুর হৃদয়ের প্রিয়া হতে পারেনি, স্বপ্নার হাত দুটো এমন ভাবে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললো, যেন ছেলেবেলার শখ ছিল দারোগার চাকরি করার। চম্পা চোখ ফেরাতে পারছে না স্বপ্নার দিক থেকে, এক পাও নড়ছে না মেয়েটা নিজে থেকে, ভাবগতিক যা, একটু ফাঁক পেলেই দৌড় লাগাবে, কিন্তু তাহলে যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না।
“খেন্তি, মা!”
“কি গো ফুলঠাকমা, বলো।”
“তুই ওকে পালাতে দিবি মা, সঙ্গে নে যাচ্চিস তো! দেহিস না, যদি কোনোরকমে…”
“আস্তে বলো ঠাকমা, দুগ্গামাসি শুনলে তোমার আবার তিনবেলার খাওয়া জুটবেনি। আমিও থাকবনি। বুড়ো বয়েসে না খেয়ে মরবি বুড়ি।”
“তা মরি!পাপের ভাত আর খেয়ে কাজ নাই।”
“ওই বুড়ি! কি ফুসফুস করচিস রে?” একটা হাঁক দিয়ে দুগ্গামাসী আবার ঢুকে গেলো ঘরের মধ্যে, টাকা পয়সা নিয়ে কিছু গোলমাল হচ্ছিল বোধহয় বড়বাবুর সাথে, বুড়ি কানে কালা, বুঝে পায় না ঠিক কতটা জোরে শোনায় ওর কথা গুলো বাকিদের কাছে।
বুড়ি চুপ করে গেলেও, ওর কথা গুলো ঘুরপাক খেতে থাকলো চম্পার অন্তরাত্মার চারপাশে। কিন্তু কিসের লোভে সাহায্য করবে, ওই স্বপ্না নামের মেয়েটাকে, উল্টে ধরা পড়লে, শেষ থাকবে না দুর্গতির, দুজনেরই। আর কেনই বা করবে, ওকে তো কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি কোনোদিন, বরং উল্টে সকলেই বুঝিয়েছে এখানে কি করে টিকে থাকতে হয়, শিখিয়েছে ব্যবসা বাড়ানোর কৌশল।
সুপ্রিয়াদি স্বপ্নার হাতটা চম্পার হাতে দিয়ে বললো,” এনে ধর। এ ছুঁড়ির লক্ষণ ভালো নয়,ভেগে যাওয়ার তালে আছে। সামলে রাখিস।”
স্বপ্না কঠিন মুখ আর প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে চম্পার নজরদারিতে উঠে বসলো গাড়ীতে, সাথে চম্পা ছাড়াও দুজন উর্দিধারী পুলিশ বসে আছে।
চম্পা সমানে লক্ষ্য করে চলেছে স্বপ্নাকে। মাঝারি গড়ন, গায়ের রঙ, মুখের আদল দেখে মনে হচ্ছে, নেহাতই বদসঙ্গে পড়ে এই পাড়ায় এসে গেছিল, অভাবে নয়। অনেকটা রাস্তা চলার পর স্বপ্না বেশ উশখুশ করতে লাগলো, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন। গাড়ি থামলো বটে, কিন্তু আদেশ হলো সবার সামনেই কাজ সারতে হবে, পাখি যাতে না পালায় তাই এই বন্দোবস্ত। স্বপ্না যে একেবারেই প্রস্তুত নয় তা বুঝে, চম্পা ওদের বলে স্বপ্নাকে নিয়ে গেল একটু আড়ালে, ঝোপের মাঝে।
“নে, কর।”
স্বপ্না তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে।
“আ মোলো যা। পালাবার তালে নেমেচিলি নাকি! ওসব হবেনি। তুই পালা আর আমি মরি আর কি। যা করার করে গাড়িতে ওঠ।”
এতক্ষণে বুঝি স্বপ্নার বাঁধ ভাঙলো পুরোপুরি, সমবেদনা জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা, অনেক অনুনয় করলো চম্পার কাছে অনেক, ফল হলো না কিছুই!
“হেই সব হবেনি বাপু। দেকেচিস হেইখান থেকে দেকা যাচ্চে গাড়ি, একটা হাঁক দেব আর সব কটা মিনসে একসাথে এসে পড়বে। চল! চল! একন হেই তোর জেবন। বাকিদের মতো বাবুদের খুশি করবি আর গতরসোহাগ নিবি। অভ্যেস হয়ে যাবে এহন।”
স্বপ্নার কঠিন মুখ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। পাশে বসা দুই চৌকিদারের একজন বেশ বয়স্ক হলেও অপরজন তুলনায় ছোকরাই বলা চলে। দুজনেই আড়চোখে, পাশে বসা দুই বারবনিতার দেহসৌষ্ঠব মাপার প্রয়াস করে যাচ্ছে, হয়তো হাত নিশপিশও করছে, একটু ছুঁয়ে দেখতে, কিন্তু পারছেনা, সামনে বড়বাবু বসে আছে বলে হয়তো সাহসে কুলাচ্ছেনা।
“তা বড়বাবু, কোতায় নে যাচ্চেন আমাদের? সেই ককুন তো উঠেচি, আর কদ্দুর গোও?”
“আরে হরেনবাবুর ছেলের বন্ধু এসেছে কজন। বাবার কাছে আবদার করেছে, বাগানবাড়িতে থেকে ফুর্তি করবে, কাঁচা বয়েসের ঝোঁক আর কি। এই তিনদিন তাই মোচ্ছব হবে রে, মদের ফোয়ারা ছুটবে, তোরা নাচবি। ভালো করে খুশি করতে পারলে, অনেক বখশিশ পাবি জেনে রাখ।”
হরেনবাবুকে চম্পা ভালোমতোই চেনে। অলিখিত ভাবে ওই দুগ্গামাসীর স্বামী, ওর বাঁধা বাবু। লোকটার যে কিসের ব্যবসা আছে, আর কিসের নেই, তা বোঝা দায়। মদ, নারী, আর নেশার জিনিসের এক চেটিয়া ব্যবসায় লোকটা আগে থেকেই ছিল টাকার কুমির, তার ওপর আগেরবার ভোটে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীও হয়েছে এখন।
বাগানবাড়িতে এসে যখন নামলো তখন দিনের আলো অস্তমিত, সন্ধ্যার কনে দেখা মেঘের আলোয় গণিকা প্রবেশ করলো তার ক্ষণিকের বাসরগৃহের অন্দরে। বাড়িটা মূল লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরেই, আশেপাশে জনমানুষের চিহ্ন নেই। বাড়ির পিছনে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ গিয়ে মিশেছে ধানক্ষেতে। বিলাসবহুল ঘরের প্রকান্ড জানলায় দাঁড়িয়ে চম্পা উদাসদৃষ্টিতে একবারে চেয়ে দেখলো বাইরে। আকাশের মতো তার সিঁথিও রাঙা হয়ে উঠেছিল একদিন, ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল সে এক প্রবঞ্চকের হাতে হাত রেখে,বৃথা সে স্বপ্নের তিলমাত্র বাস্তবতা পায়নি, ধীরে ধীরে মা-বাবার একমাত্র মেয়ে, দাদার একমাত্র আদরের বোন মীনাক্ষী মরে গিয়ে, তার পরিচয় এখন শুধুই লালবাতি এলাকার চম্পা। কেবল ফুলঠাকুমার ওপর বেশ মায়া পড়ে গিয়েছে এখানে আসার পর থেকে।
স্বপ্না এর মধ্যেও দুবার কাতর অনুরোধ জানিয়েছে চম্পার কাছে, চম্পা কঠোর। “কেন বাঁচাবো বল শুনি! যাতে সবাই মিলে একা আমাকেই ছিঁড়ে খায়!”
হরেনবাবুর ছেলে আর তার বন্ধুরা আগে থেকেই ওখানে উপস্থিত ছিল, চম্পা আর স্বপ্নাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেল অন্দরের একটি ঘরের মধ্যে বাইরের ঘর থেকে। স্বপ্না হাত পা ছুঁড়ে অনেকবার নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করলেও চম্পা বেশ উপভোগই করছিল। ‘এই তো সুযোগ! এদের কাঁচা-কচি মাথা গুলো চিবিয়ে নিজের আখেরটা গুছিয়ে নেওয়ার। একজনকে বাঁধা বাবু বানালে আর চিন্তা নেই। খাওয়া-পরার কোনো কষ্টই থাকবেনা, বাগানবাড়িতে থাকতে পাবে, যেমন পেয়েছিল সাইদা দিদি। এই হরেনবাবুরই ভাই তো নিয়ে গেছিল তাকে কিনে, নিজের কাছে কোন এক বাগানবাড়িতে পাকাপাকি ভাবে রাখবে বলে। কিন্তু এই সেই বাগানবাড়ি কি? তাহলে দেখতে পাচ্ছেনা কেন! কে জানে, অন্য কোথাও হবে হয়তো! বড় মানুষ এরা, কত বাড়ি থাকে এমন এদের। স্বপ্নাটা বোকা! যত আটকাবে ততই বাড়বে এদের জেদ, আর ততই বেদনা বাড়বে। মেনেই নিক না!’
যেরকম ভেবেছিল, সেরকমটি হলো না। ভেবেছিল এখুনি হয়তো চারটে ছেলে মিলে বিবস্ত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর যেমনটা, বাকি খরিদ্দার করে থাকে। এরা সেই রাস্তায় গেল না, কথাবার্তায় বুঝলো, রাত্রে খাওয়াদাওয়ার বাদে হবে মদ্যপানের উৎসব আর তার পরেই ওদের নিয়ে শুরু হবে আদিম রিপুর খেলা।বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, তবে ভেতরেই ঘুরে ঘুরে দেখার আছে।চম্পা একটু জরিপ করে দেখলো যে ঘরে তাদের রাখা হয়েছে, সেই ঘরের লাগোয়া রয়েছে স্নানঘর। স্নানঘরের লাগোয়া আরেকটি ঘর, সেটা বন্ধ করা রয়েছে। চম্পার খুব ইচ্ছা করছিল,বাকি বাড়িটুকুও একটু ঘুরে ঘুরে দেখে। বড়মানুষদের এরকম সাজানো বাড়ি, সে আগে কখনো দেখেনি, কিন্তু স্বপ্নাকে পাহারা দিতে গিয়ে সকাল থেকে তার নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে, শান্তিতে একটু জিরিয়ে নেবে তারও উপায় নেই। ছেলেগুলো পাশের ঘরে বসে কি করছে একটা টিভির মতো জিনিস নিয়ে। চম্পা স্বপ্নাকে স্নানঘরে পাঠিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একটু আড়ি পাতলো মাঝের একটা জানলায়। ছেলেগুলো কি একটা দেখছে ওই টিভিটায়। চম্পা একটু দেখতে চেষ্টা করে বেশ কিছু বাদে উদ্ধার করলো, টিভিতে চলছে দুটি মানুষের রতিক্রিয়ার ভিডিও, মানুষদুটিও তার চেনা, হরেনবাবুর ভাই আর সাইদা দিদি। চম্পা মনে মনে ছেলেগুলোকে দুটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল ওখান থেকে, কিন্তু চোখ আটকে গেলো টিভির পর্দায়। এ কি দেখছে! হরেনবাবুর ভাই মত্ত উলঙ্গ অবস্থায় উঠে গিয়ে একটা বড় লোহার রড নিয়ে এলেন কোথা থেকে, আর এনেই সোজা ঢুকিয়ে দিলেন সাইদা দিদির যৌনাঙ্গে,পৈশাচিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে হরেনবাবুর ভাইয়ের মুখমন্ডল।বেশ কিছুক্ষন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করার পর মুখ দিয়ে টাটকা রক্ত বেরিয়ে একটু ছটফট করে আস্তে আস্তে স্থির হয়ে গেল সাইদা দিদির নির্বস্ত্র দেহটা। দুটো লোক ঢুকলো ঘরে তার কিছু বাদেই, আর পা ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেল দেহটা নিয়ে।
সর্বনাশ! সাইদা দিদি বেঁচে নেই! আর এই নরপিশাচগুলো সেই ভিডিও দেখে উল্লসিত। কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এলো চম্পা। স্বপ্না দরজায় মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে খুলে দেওয়ার জন্যে, চম্পা কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বেশ গম্ভীর গলায় বলল “খুলছি দাঁড়া!”
চম্পার দু পায়ের মাঝের প্রথমবারের অশরীরী ক্ষতটা হঠাৎ বুঝি প্রাণ ফিরে পেয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সংকেত দিচ্ছে যেন ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যেতে চলেছে। পালাতেই হবে ওদের, যেভাবেই হোক।
পাশের ঘরে ছেলেগুলোর গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এখনো, চম্পার মাথায় খেলে গেল বুদ্ধি। স্বপ্নাকে ভেতরেই অপেক্ষা করতে বলে ও গেল পাশের ঘরে।
“এই যে বাবুরা, কখন থেকে গা’টা ম্যাজম্যাজ করছে, আর কতক্ষণ?”
“এই যে আমার রানি, খুব ক্ষিদে পেয়েছে না তোর!একটু সবুর কর, তোর সব ক্ষিদে আজই মিটিয়ে দেব আমরা।”
চম্পার বুক কাঁপছে, কিন্তু এদের কিছুই বুঝতে দিলোনা, বরং একটু ছলকলাতেই এরা তুলে দিল কাঙ্খিত বস্তু ওর হাতে, দু’বোতল মদ, দুটো সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই।
ওখানে বসেই দুবার গ্লাসে ঢেলে নিজে খেয়ে ওদেরও খাওয়ালো বেশ অনেকটা করে, খালি পেটে মদ্যপানের ফলে হরেনবাবুর ভাইপো বেশ বেসামাল হয়ে পড়লো, এর মধ্যেই চম্পার ওপর আদেশ হলো স্বপ্নাকে তৈরি করে নিয়ে আসার। চম্পা বুঝলো কাজ হাসিল। মদের বোতল, দেশলাই সব নিয়ে চললো পাশের ঘরে স্বপ্নাকে তৈরি করে প্রস্তুত করতে।
সকাল থেকে স্বপ্না আশায় ছিল, চম্পার মন গলবে, ও ছাড়া পাবে, কিন্তু সেই সব আশা ভরসা এখন কর্পূরের মতো উবে গেছে, এখন সঙ্গী শুধুই উৎকণ্ঠা আর চরমতম সর্বনাশের আশঙ্কা। বন্ধ করা স্নানঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে পথশ্রমের ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিল একটু। হঠাৎ একটা জ্বলন্ত ঘরের আবহে খুলে গেল স্নানঘরের দরজা, সামনে চম্পা দাঁড়িয়ে।
“পালা তুই, পালা জানলা দিয়ে। এই সুযোগ!”
চম্পার এহেন ভোলবদলে বিস্মিত স্বপ্না ক্ষণিক সময় নিলো সম্বিৎ ফেরাতে। তারপরে আর কালবিলম্ব করেনি,
“কিন্তু দিদি তুমি!”
স্বপ্নার গলার আওয়াজটা বড় মিঠে লাগলো চম্পার।
“আমার বোদয় যাওয়া হবেনি রে!তুই যা! সাইদা দিদির মতো মরতে দেবনি আমি তোকে। যা হয় হোক!”
জানলা দিয়ে লাফিয়ে পরে পাঁচিল টপকে একবার ফিরে তাকালো স্বপ্না।চম্পাকে বাঁচাতে, সাহস সঞ্চার করে একটু ফিরে আসতেই চোখে পড়লো তিনটি পুরুষের ছায়ামূর্তি, খোলা জানলা দিয়ে তারাও বেরিয়ে আসতে চাইছে, ওকে ধরে নিয়ে যেতে, কিন্তু একি, অগ্নিময় শরীরে কেউ যেন গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে ওদের, দাউদাউ করে জ্বলে যাচ্ছে তিনটি ছটফট করতে থাকা শরীর, আর সেই প্রজ্জ্বলিত মানুষটি সর্বগ্রাসী আগুন নিয়ে যেন প্রলয়নৃত্য করে চলেছে, ওই বাড়ির সমস্ত পাপ, সমস্ত ক্লেদ ভস্মীভূত করার মানসে। লেলিহান আগুনের শিখায় ঝলসে গেল দৃষ্টিপথ, আর ফিরে তাকায়নি স্বপ্না।
“হারামজাদী, কাকে পাঠিয়েছিলি তুই! রেন্ডি মাগী একাই চার চারটে ছেলেকে পুড়িয়ে মারলো আর নিজেও মরলো। শালী আরেকটা কোথায় পালিয়েছে যদি ধরতে পারি, ওটাকেও সাইদার মতো মারবো! শালী তোর চম্পা নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আমার ভাইপোকে জড়িয়ে ধরেছিল জানিস!ছেলেটার মুখটাও দেখতে পেলো না ওর মা, শেষবারের মতো, এত জ্বলে গেছে।”
সবার অলক্ষ্যে কেউ বুঝি মানদন্ড রেখে ন্যায়বিচার করলেন।
স্বপ্নার কি হয় এরপরে কারুর জানা নেই, বারবনিতাদের পল্লীতে রাত্রিযাপন করা অদূষিত মেয়েটি, সভ্য সমাজে বা তার পরিবারের আশ্রয় পেয়েছিল কিনা, তা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রেখে দেয়। শোনা যায়, দুগ্গামাসীকেও পুত্রশোকে পাগল হয়ে, হরেনবাবু নিজেই হত্যা করেন, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের বস্তি। কিন্তু চম্পা, বা অসময়ে ঝরে যাওয়া এরকম আরো কত প্রাণ প্রশ্ন রেখে যায় সমাজের কাছে, সত্যিই কি এই প্রাণগুলোর মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমরা? এরকম অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আশেপাশে আমাদের, কিন্তু তার কত গুলোই বা যোগ্য ন্যায়বিচারের আলোয় আলোকিত হয়?
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ কাম্য, কিন্তু এই সব ক্ষেত্রে আমরা প্রতিকারেই সীমিত রেখে দিই আমাদের কর্তব্যকে। একটি মানুষের যৌনতা তার অস্তিত্বের দোসর। তাহলে কোনওভাবেই কি যৌনতাকে পণ্য হিসেবে বাজারে ঠেলে না দিয়ে, এই সমস্ত মানুষগুলোকে বিকল্প জীবিকার কোনো সন্ধান দেওয়া সম্ভব ছিলো না, না কি সদিচ্ছার অভাব সেই রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চোখ গুলোতেই ঠুলি বেঁধে রেখে দিয়েছে?
প্রশ্ন থাকবেই!
ছবিঋণ: গুগল
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=879733682206475&id=707552542757924
“খেন্তি রে, খেন্তি পোড়ারমুখী, খেন্তিইইইই, ওরে ও খেন্তি, আ মোলো যা, কানের মাতা কেয়ে বসে আচিস নাকি?”
“ও মা ফুলঠাকমা যে, শুনতে পাইনি গো, কড়ায় ভাজা বসিয়ে এইচি, তা বলো, কি জন্যি এত্ত হাঁক দিচ্চিলে?”
“শিগগির চল, বড়বাবু, তোরে ডাক দিচে,বলতিচে কি দরকার আছে। আয় আয়!”
গতিক বড় সুবিধার লাগলো না সব শুনে, খেন্তি ওরফে চম্পার। এই বড়বাবু লোকটি যে একেবারেই সুবিধার নয়, এই তল্লাটে সব ঘরের মানুষ সেই কথা জানে। নামেই পুলিশ, আসলে রাজনৈতিক দলের পান্ডা-গুন্ডাদের ফোকটে ফূর্তির রসদ জোগানোর দালাল, আসবে আর মেয়েদের নিয়ে যাবে সেই মতলবে। দুগ্গামাসী ওরফে এই বস্তির সর্বেসর্বাও কিছু বলে না একে, তারও যে অনেক স্বার্থ আছে। কতরকম বেআইনি নেশার কারবার চালায় দুগ্গামাসী এই বস্তির পায়রার খোপগুলোতে, সব জানা স্থানীয় ওই নেতাদের আর বড়বাবুর, তাই কোনো আইন দুগ্গামাসীর টিকিটাও ছুঁতে পারে না। শুনেছে, অনেক আগে এখানে বদলি হয়ে আসা এক পুলিশ অফিসার এসব নিয়ে তদন্ত করে, ধর-পাকড় শুরু করেছিল,তবে কারুর শাস্তিই সেভাবে স্থায়ী হয়নি। সেই অফিসারকে কচুকাটা করে ভাসিয়ে দিয়েছিল ওই রূপনারায়ণের জলে এখানকার দারোয়ানের দল। তার অভাগী স্ত্রী, স্বামীর মুখটুকও পায়নি দেখতে শেষবারের মতো। কি করেই বা পাবে, মাথাটাই তো পাওয়া যায়নি এমন কাজের সাফাই! পোশাকের মধ্যে থাকা কার্ড দেখে শনাক্ত করা হয়েছিল ওর আট টুকরো দেহটা, কিছুটা তার আবার জলজ প্রাণীও ঠুকরে খেয়েছে।
চম্পা তখনও এই বস্তিতে আসেনি, ওর প্রাণের সখী সোহাগীর মুখে এসব শুনেছে। সোহাগী বলেছিল, “মুখ দেখতি পাবে কি করে রে খেন্তি! আমি দেকেচিলাম, কানাই আর খালিদ, দুইজনা ওই মুন্ডুটা নিয়ে লুফালুফি খেলতি খেলতি ফেলি দিলো নদের জলে।”
সোহাগীর জন্ম থেকে বড় হওয়া এই নরকেই, ওর মা এখানে এসেছিল অনেক ছোটবেলায়, বাপ-মা মরা একরত্তি মেয়ের খাওয়ানো-পরানোর খরচ থেকে বাঁচতে, তার কাকা বেচে দিয়ে গেছিল এই পাড়ায়। সোহাগীর মা এইডস হয়ে মরে বেঁচেছে অনেক আগেই, সোহাগী তখন বেশ ছোট, ফুলঠাকুমা ওকে বড় করেছে, আর এখন ও নিজেও এখানকার অভিজ্ঞ পণ্যজীবী। শুনেছে শহরের শিক্ষিত, আধুনিক মননের অধিকারী নারী-পুরুষেরা, সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থার প্রতিনিধিরা অনেক কাজ করে ওদের পুনর্বাসনের জন্যে। কত প্রকল্প, কত সহায়তা, কত উন্নয়নের আলো, তাদের মতো কিছু কিছু মেয়েদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ দেখায়, তবে সেসব ওই কলকাতা শহরের সোনাগাছির জন্যে, মফস্বলের প্রান্তে থাকা বেশ্যাপট্টির গলিতে, সেই আলোর ক্ষীণ কিরণটুকুও এসে পৌঁছায় না।
“কি রে চল! সঙের মতো রংমাখা রূপ নিয়ে দোরে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস লো? তোর ঘরে নাগর আচে নাকি? থাকলে অন্য কাউকে পাঠাচ্চি, তোরে ডাকচে বড়বাবু, আয় একুনি।” দুগ্গামাসীর অত্যুগ্র কুহরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হলো চম্পার, ফুলঠাকুমার সাথে সাথে দুগ্গামাসীও এসেছিল পেছন পেছন তাকে নিয়ে যেতে, অতটা খেয়াল করেনি। বিনা বাক্যব্যয়ে চম্পা পিছু নিলো দুগ্গামাসীর, লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে ফুলঠাকুমাও ধীর পদক্ষেপে তাদের। রক্ষাকালীর বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বড়োবাবুর মুখটা দূর থেকে মা বগলার পায়ের তলায় থাকা অসুরের মুখের মতো লাগলো এক ঝলক, লালসাময় রসনা লকলকিয়ে যেন লেহন করছে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর শরীর, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে বারাঙ্গনাদের ব্যবহারজীর্ণ লাবণ্য।
“এই যে বাবু, নে যাও, এই চম্পাকে তো তুমি চেনোই ভালোমতো, আর হেইটা হলো স্বপ্না, নতুন আমদানি। এহনো পোক্ত না, তবে নে যাও, ও ঠিক পারবে এহন। দেখেশুনে নে আমার ঘরে এসো।”
“তোর ঘরে কি জন্যে রে দুগ্গা! সবই তো ছিবড়ে হয়ে গেছে তোর!”
বড়বাবুর বিশ্রী কথা আর বিশ্রী ইঙ্গিতওয়ালা হাসির খ্যাক খ্যাক আওয়াজ যেন কানে গিয়ে বিঁধলো চম্পার, যদিও দুগ্গামাসীকে সে মোটেই পছন্দ করে না, তাও ইচ্ছা করছিল পায়ের জীর্ণ পাদুকার সদপ্রয়োগ করে ওই ভন্ড রক্ষাকর্তার দুটি গালে।
“ বাজে কতা রাখো দিকি! দেনাপাওনা কি সকলের সামনে করবে নাকি!আর ছিবড়ে তো তুমিও চুষতে আসো মাঝে মাঝে, দিনের আলোয় চিনতে অসুবিধা হচ্চে বুঝি, সরাবো নাকি বুকের কাপড়টা?”
যাক, দুগ্গামাসীর উত্তরটা ভালোই ছিল, চম্পা ভাবে মনে মনে, তবে এই লোকটা যা বেহায়া, এর মোটেই গায়ে লাগবে না, আর গায়ে যে লাগেনি বড়বাবুর একেবারেই, প্রত্যুত্তরে দেওয়া হাসিতেই তা বেশ পরিষ্কার।
“আচ্ছা চম্পা শোন, বাবু তোকে নে যাবে, গোল করবিনি, স্বপ্নারে নে শান্ত হয়ে যাবি, নেতাবাবুর কিছু অতিথ আসবেন, তাদের খাতির যত্ন করবি। ওনারা যেমনটি বলবেন করবি, তিনদিন বাদে তোদের দে যাবেন বড়বাবু। তখন পাবি তোদের ভাগ। স্বপ্নারে একটু শিকিয়ে দিবি। ও মাগী সুবিদার নয়।”
দুগ্গামাসী বলার আগেই এরকম কিছুর একটা আঁচ পেয়েছিল চম্পা, এখন আর সন্দেহ রইলো না। স্বপ্নাকে দেখে মনে হলো বলির আগে বেঁধে রাখা পাঁঠা, চারদিকে আড়চোখে দেখছে আর কাঁপছে। এবারে তার মানে অর্থবান কোনো সৌখিন মক্কেলের বায়না আছে, নাহলে দেনাপাওনা,ভাগ-বখরা, এসবের ধারেকাছে দিয়েও যায় না ওই বড়বাবু। স্বপ্নাকে দেখে বড় মায়া হলো চম্পার, গলার কাছে একটা দলাপাকানো চাপা কষ্ট আবার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো অনেকদিন বাদে। বছর পাঁচেক আগে চম্পাও এমন করেই দাঁড়িয়েছিল, যখন তাকে পাঠানো হচ্ছিল জনৈক এক নেতা, দুগ্গামাসীর কথায় ‘মালদার বাবু’র মনোরঞ্জন করতে।
গরিবের মেয়ে ছিল চম্পা ওরফে মীনাক্ষী,স্কুল পালিয়ে ভালোবেসেছিল গ্রামে কয়েকদিনের জন্যে কন্ট্রাক্ট’এর কাজ করতে আসা অজ্ঞাতকুলশীল রাজুকে। বিয়ের পর রাজু ওকে এখানে রেখে যায়, দুগ্গামাসীকে ওর মাসি পরিচয় দিয়ে,কথা দিয়েছিল বাড়িতে জানিয়ে তারপরে এসে তাকে পূর্ণ মর্যাদায় নিয়ে যাবে তার শ্বশুরের ভিটেয়,কথা রাখতে রাজু আর ফিরে আসেনি। চম্পার আজও স্পষ্ট মনে আছে, প্রথমবার ব্যবসায় পাঠানোর আগে, দুগ্গামাসী জোর করে মুছে দিয়েছিল ওর সিঁথির সিঁদুর, ভেঙে দিয়েছিল শাঁখা-পলা, বলেছিল ‘বেশ্যার বর হয়না রে হারামজাদী, বাবু হয়!’। সেদিন অবশ্য শুধু শাঁখা পলা নয়, ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল ওর পূর্বপরিচয়, ওর বিশ্বাস আর সর্বোপরি ওর মন। দুগ্গামাসীর দেওয়া নাম ‘চম্পা’।তার মতো সবারই এখানে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে, সোহাগী বলেছিল”এ তো অন্য জেবন রে চম্পা, হেইখানে পুরাতন নামের কোনো কাম নেই”।চম্পা অবশ্য জানে নাম পরিবর্তনের কারণ, যাতে কোনোদিন কেউ কোনোভাবেই ফিরে যাওয়ার পথের সন্ধান তাদের দিতে না পারে। চম্পার স্পষ্ট মনে আছে, ওর প্রথম ক্রেতার অত্যাচারের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়েছিল চম্পা। যখন হুঁশ ফেরে, দেখে দামী পালংকের ধবধবে সাদা চাদর ওর যোনি থেকে নিঃশব্দে নিঃসৃত টাটকা রক্তে ভিজে গেছে । কোনোরকমে টলতে টলতে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াতেই, কে যেন খামচে ধরলো স্তনাগ্র পিছন থেকে, দৈহিক বুভুক্ষা বাকি ছিল বুঝি তখনও ! দেহে এতো শক্তি ছিলো না যে নিজেকে ছাড়ায়, বুঝেছিল বাঁধা দিতে গেলে নির্যাতন বাড়বে, চুপ করে মড়ার মতো পড়েছিল বেশ কিছুক্ষণ, মদ্যপ লোকটা কিছুক্ষণ তার মধ্যে উত্তেজনা সঞ্চারের বৃথা চেষ্টা করে, তার কোনো সাড়া না পেয়ে কিছু বাদে নিজেই বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে। খবর দিয়েছিল কানাই দালালকে।একটা কাপড় জড়িয়ে,কানাই কোনোরকমে তুলে এনেছিল বাবুর বাড়ি থেকে চম্পাকে, তারপরে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল সুস্থ হয়ে ব্যবসায় ফিরতে। মাঝে কয়েকবার পালাতেও চেষ্টা করেছিল, পারেনি। বরং যে শাস্তি জুটেছিল তার বদলে, তা ভাবলে এখনো শিউরে ওঠে ও মনে মনে। কানাই, খালিদ, ভুবন আর পিটার, দুগ্গামাসীর চার পোষ্য মনুষ্যরূপী নরখাদক, একসাথে চড়াও হয়েছিল তার নগ্ন শরীরের ওপর! তাই এখন আর এইসব নিয়ে ভাবেনা চম্পা, পালাবার রাস্তা বন্ধ, থাকতে যখন হবে এখানেই, ব্যবসা না করলে খাবে কি! বাইরের জগৎটা অনেকদিন আগেই ছেড়ে এসেছে ওর মতো এখানে থাকা বাকি মেয়েরা, ফিরে গিয়ে অন্যভাবে বাঁচা যাবে কি যাবে না সে তো ভাবনাতেই অনেক দূর, প্রগাঢ় ভীতি নিশ্চিন্ত বাসা বেঁধেছে অন্তরে, এই চেনা জায়গা ছেড়ে বেরোতে।
“এই যে নবাবের বিটি, যাও, পরনের কাপড়কানা বদলে নাও, এরপরে তিনদিন আর পরনে কিচু উঠবে কিনা, সাজতে সময় পাবে কিনা কে জানে! এই সুপ্রিয়া, নে যা তো স্বপ্নারে, সাজায়ে নিয়ে আয়, চম্পা মা আমার তো রেডিই আচে।”
দুগ্গামাসীর আদেশে জনৈকা সুপ্রিয়া, যে এখনো অব্দি শুধু শয্যা ছাড়া কারুর হৃদয়ের প্রিয়া হতে পারেনি, স্বপ্নার হাত দুটো এমন ভাবে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললো, যেন ছেলেবেলার শখ ছিল দারোগার চাকরি করার। চম্পা চোখ ফেরাতে পারছে না স্বপ্নার দিক থেকে, এক পাও নড়ছে না মেয়েটা নিজে থেকে, ভাবগতিক যা, একটু ফাঁক পেলেই দৌড় লাগাবে, কিন্তু তাহলে যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না।
“খেন্তি, মা!”
“কি গো ফুলঠাকমা, বলো।”
“তুই ওকে পালাতে দিবি মা, সঙ্গে নে যাচ্চিস তো! দেহিস না, যদি কোনোরকমে…”
“আস্তে বলো ঠাকমা, দুগ্গামাসি শুনলে তোমার আবার তিনবেলার খাওয়া জুটবেনি। আমিও থাকবনি। বুড়ো বয়েসে না খেয়ে মরবি বুড়ি।”
“তা মরি!পাপের ভাত আর খেয়ে কাজ নাই।”
“ওই বুড়ি! কি ফুসফুস করচিস রে?” একটা হাঁক দিয়ে দুগ্গামাসী আবার ঢুকে গেলো ঘরের মধ্যে, টাকা পয়সা নিয়ে কিছু গোলমাল হচ্ছিল বোধহয় বড়বাবুর সাথে, বুড়ি কানে কালা, বুঝে পায় না ঠিক কতটা জোরে শোনায় ওর কথা গুলো বাকিদের কাছে।
বুড়ি চুপ করে গেলেও, ওর কথা গুলো ঘুরপাক খেতে থাকলো চম্পার অন্তরাত্মার চারপাশে। কিন্তু কিসের লোভে সাহায্য করবে, ওই স্বপ্না নামের মেয়েটাকে, উল্টে ধরা পড়লে, শেষ থাকবে না দুর্গতির, দুজনেরই। আর কেনই বা করবে, ওকে তো কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি কোনোদিন, বরং উল্টে সকলেই বুঝিয়েছে এখানে কি করে টিকে থাকতে হয়, শিখিয়েছে ব্যবসা বাড়ানোর কৌশল।
সুপ্রিয়াদি স্বপ্নার হাতটা চম্পার হাতে দিয়ে বললো,” এনে ধর। এ ছুঁড়ির লক্ষণ ভালো নয়,ভেগে যাওয়ার তালে আছে। সামলে রাখিস।”
স্বপ্না কঠিন মুখ আর প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে চম্পার নজরদারিতে উঠে বসলো গাড়ীতে, সাথে চম্পা ছাড়াও দুজন উর্দিধারী পুলিশ বসে আছে।
চম্পা সমানে লক্ষ্য করে চলেছে স্বপ্নাকে। মাঝারি গড়ন, গায়ের রঙ, মুখের আদল দেখে মনে হচ্ছে, নেহাতই বদসঙ্গে পড়ে এই পাড়ায় এসে গেছিল, অভাবে নয়। অনেকটা রাস্তা চলার পর স্বপ্না বেশ উশখুশ করতে লাগলো, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন। গাড়ি থামলো বটে, কিন্তু আদেশ হলো সবার সামনেই কাজ সারতে হবে, পাখি যাতে না পালায় তাই এই বন্দোবস্ত। স্বপ্না যে একেবারেই প্রস্তুত নয় তা বুঝে, চম্পা ওদের বলে স্বপ্নাকে নিয়ে গেল একটু আড়ালে, ঝোপের মাঝে।
“নে, কর।”
স্বপ্না তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে।
“আ মোলো যা। পালাবার তালে নেমেচিলি নাকি! ওসব হবেনি। তুই পালা আর আমি মরি আর কি। যা করার করে গাড়িতে ওঠ।”
এতক্ষণে বুঝি স্বপ্নার বাঁধ ভাঙলো পুরোপুরি, সমবেদনা জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা, অনেক অনুনয় করলো চম্পার কাছে অনেক, ফল হলো না কিছুই!
“হেই সব হবেনি বাপু। দেকেচিস হেইখান থেকে দেকা যাচ্চে গাড়ি, একটা হাঁক দেব আর সব কটা মিনসে একসাথে এসে পড়বে। চল! চল! একন হেই তোর জেবন। বাকিদের মতো বাবুদের খুশি করবি আর গতরসোহাগ নিবি। অভ্যেস হয়ে যাবে এহন।”
স্বপ্নার কঠিন মুখ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে, গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। পাশে বসা দুই চৌকিদারের একজন বেশ বয়স্ক হলেও অপরজন তুলনায় ছোকরাই বলা চলে। দুজনেই আড়চোখে, পাশে বসা দুই বারবনিতার দেহসৌষ্ঠব মাপার প্রয়াস করে যাচ্ছে, হয়তো হাত নিশপিশও করছে, একটু ছুঁয়ে দেখতে, কিন্তু পারছেনা, সামনে বড়বাবু বসে আছে বলে হয়তো সাহসে কুলাচ্ছেনা।
“তা বড়বাবু, কোতায় নে যাচ্চেন আমাদের? সেই ককুন তো উঠেচি, আর কদ্দুর গোও?”
“আরে হরেনবাবুর ছেলের বন্ধু এসেছে কজন। বাবার কাছে আবদার করেছে, বাগানবাড়িতে থেকে ফুর্তি করবে, কাঁচা বয়েসের ঝোঁক আর কি। এই তিনদিন তাই মোচ্ছব হবে রে, মদের ফোয়ারা ছুটবে, তোরা নাচবি। ভালো করে খুশি করতে পারলে, অনেক বখশিশ পাবি জেনে রাখ।”
হরেনবাবুকে চম্পা ভালোমতোই চেনে। অলিখিত ভাবে ওই দুগ্গামাসীর স্বামী, ওর বাঁধা বাবু। লোকটার যে কিসের ব্যবসা আছে, আর কিসের নেই, তা বোঝা দায়। মদ, নারী, আর নেশার জিনিসের এক চেটিয়া ব্যবসায় লোকটা আগে থেকেই ছিল টাকার কুমির, তার ওপর আগেরবার ভোটে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারীও হয়েছে এখন।
বাগানবাড়িতে এসে যখন নামলো তখন দিনের আলো অস্তমিত, সন্ধ্যার কনে দেখা মেঘের আলোয় গণিকা প্রবেশ করলো তার ক্ষণিকের বাসরগৃহের অন্দরে। বাড়িটা মূল লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরেই, আশেপাশে জনমানুষের চিহ্ন নেই। বাড়ির পিছনে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ গিয়ে মিশেছে ধানক্ষেতে। বিলাসবহুল ঘরের প্রকান্ড জানলায় দাঁড়িয়ে চম্পা উদাসদৃষ্টিতে একবারে চেয়ে দেখলো বাইরে। আকাশের মতো তার সিঁথিও রাঙা হয়ে উঠেছিল একদিন, ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল সে এক প্রবঞ্চকের হাতে হাত রেখে,বৃথা সে স্বপ্নের তিলমাত্র বাস্তবতা পায়নি, ধীরে ধীরে মা-বাবার একমাত্র মেয়ে, দাদার একমাত্র আদরের বোন মীনাক্ষী মরে গিয়ে, তার পরিচয় এখন শুধুই লালবাতি এলাকার চম্পা। কেবল ফুলঠাকুমার ওপর বেশ মায়া পড়ে গিয়েছে এখানে আসার পর থেকে।
স্বপ্না এর মধ্যেও দুবার কাতর অনুরোধ জানিয়েছে চম্পার কাছে, চম্পা কঠোর। “কেন বাঁচাবো বল শুনি! যাতে সবাই মিলে একা আমাকেই ছিঁড়ে খায়!”
হরেনবাবুর ছেলে আর তার বন্ধুরা আগে থেকেই ওখানে উপস্থিত ছিল, চম্পা আর স্বপ্নাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেল অন্দরের একটি ঘরের মধ্যে বাইরের ঘর থেকে। স্বপ্না হাত পা ছুঁড়ে অনেকবার নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করলেও চম্পা বেশ উপভোগই করছিল। ‘এই তো সুযোগ! এদের কাঁচা-কচি মাথা গুলো চিবিয়ে নিজের আখেরটা গুছিয়ে নেওয়ার। একজনকে বাঁধা বাবু বানালে আর চিন্তা নেই। খাওয়া-পরার কোনো কষ্টই থাকবেনা, বাগানবাড়িতে থাকতে পাবে, যেমন পেয়েছিল সাইদা দিদি। এই হরেনবাবুরই ভাই তো নিয়ে গেছিল তাকে কিনে, নিজের কাছে কোন এক বাগানবাড়িতে পাকাপাকি ভাবে রাখবে বলে। কিন্তু এই সেই বাগানবাড়ি কি? তাহলে দেখতে পাচ্ছেনা কেন! কে জানে, অন্য কোথাও হবে হয়তো! বড় মানুষ এরা, কত বাড়ি থাকে এমন এদের। স্বপ্নাটা বোকা! যত আটকাবে ততই বাড়বে এদের জেদ, আর ততই বেদনা বাড়বে। মেনেই নিক না!’
যেরকম ভেবেছিল, সেরকমটি হলো না। ভেবেছিল এখুনি হয়তো চারটে ছেলে মিলে বিবস্ত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর যেমনটা, বাকি খরিদ্দার করে থাকে। এরা সেই রাস্তায় গেল না, কথাবার্তায় বুঝলো, রাত্রে খাওয়াদাওয়ার বাদে হবে মদ্যপানের উৎসব আর তার পরেই ওদের নিয়ে শুরু হবে আদিম রিপুর খেলা।বাড়ির বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই, তবে ভেতরেই ঘুরে ঘুরে দেখার আছে।চম্পা একটু জরিপ করে দেখলো যে ঘরে তাদের রাখা হয়েছে, সেই ঘরের লাগোয়া রয়েছে স্নানঘর। স্নানঘরের লাগোয়া আরেকটি ঘর, সেটা বন্ধ করা রয়েছে। চম্পার খুব ইচ্ছা করছিল,বাকি বাড়িটুকুও একটু ঘুরে ঘুরে দেখে। বড়মানুষদের এরকম সাজানো বাড়ি, সে আগে কখনো দেখেনি, কিন্তু স্বপ্নাকে পাহারা দিতে গিয়ে সকাল থেকে তার নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে, শান্তিতে একটু জিরিয়ে নেবে তারও উপায় নেই। ছেলেগুলো পাশের ঘরে বসে কি করছে একটা টিভির মতো জিনিস নিয়ে। চম্পা স্বপ্নাকে স্নানঘরে পাঠিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একটু আড়ি পাতলো মাঝের একটা জানলায়। ছেলেগুলো কি একটা দেখছে ওই টিভিটায়। চম্পা একটু দেখতে চেষ্টা করে বেশ কিছু বাদে উদ্ধার করলো, টিভিতে চলছে দুটি মানুষের রতিক্রিয়ার ভিডিও, মানুষদুটিও তার চেনা, হরেনবাবুর ভাই আর সাইদা দিদি। চম্পা মনে মনে ছেলেগুলোকে দুটি অশ্রাব্য গালি দিয়ে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল ওখান থেকে, কিন্তু চোখ আটকে গেলো টিভির পর্দায়। এ কি দেখছে! হরেনবাবুর ভাই মত্ত উলঙ্গ অবস্থায় উঠে গিয়ে একটা বড় লোহার রড নিয়ে এলেন কোথা থেকে, আর এনেই সোজা ঢুকিয়ে দিলেন সাইদা দিদির যৌনাঙ্গে,পৈশাচিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে হরেনবাবুর ভাইয়ের মুখমন্ডল।বেশ কিছুক্ষন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করার পর মুখ দিয়ে টাটকা রক্ত বেরিয়ে একটু ছটফট করে আস্তে আস্তে স্থির হয়ে গেল সাইদা দিদির নির্বস্ত্র দেহটা। দুটো লোক ঢুকলো ঘরে তার কিছু বাদেই, আর পা ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেল দেহটা নিয়ে।
সর্বনাশ! সাইদা দিদি বেঁচে নেই! আর এই নরপিশাচগুলো সেই ভিডিও দেখে উল্লসিত। কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এলো চম্পা। স্বপ্না দরজায় মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে খুলে দেওয়ার জন্যে, চম্পা কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বেশ গম্ভীর গলায় বলল “খুলছি দাঁড়া!”
চম্পার দু পায়ের মাঝের প্রথমবারের অশরীরী ক্ষতটা হঠাৎ বুঝি প্রাণ ফিরে পেয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলো। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সংকেত দিচ্ছে যেন ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যেতে চলেছে। পালাতেই হবে ওদের, যেভাবেই হোক।
পাশের ঘরে ছেলেগুলোর গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এখনো, চম্পার মাথায় খেলে গেল বুদ্ধি। স্বপ্নাকে ভেতরেই অপেক্ষা করতে বলে ও গেল পাশের ঘরে।
“এই যে বাবুরা, কখন থেকে গা’টা ম্যাজম্যাজ করছে, আর কতক্ষণ?”
“এই যে আমার রানি, খুব ক্ষিদে পেয়েছে না তোর!একটু সবুর কর, তোর সব ক্ষিদে আজই মিটিয়ে দেব আমরা।”
চম্পার বুক কাঁপছে, কিন্তু এদের কিছুই বুঝতে দিলোনা, বরং একটু ছলকলাতেই এরা তুলে দিল কাঙ্খিত বস্তু ওর হাতে, দু’বোতল মদ, দুটো সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই।
ওখানে বসেই দুবার গ্লাসে ঢেলে নিজে খেয়ে ওদেরও খাওয়ালো বেশ অনেকটা করে, খালি পেটে মদ্যপানের ফলে হরেনবাবুর ভাইপো বেশ বেসামাল হয়ে পড়লো, এর মধ্যেই চম্পার ওপর আদেশ হলো স্বপ্নাকে তৈরি করে নিয়ে আসার। চম্পা বুঝলো কাজ হাসিল। মদের বোতল, দেশলাই সব নিয়ে চললো পাশের ঘরে স্বপ্নাকে তৈরি করে প্রস্তুত করতে।
সকাল থেকে স্বপ্না আশায় ছিল, চম্পার মন গলবে, ও ছাড়া পাবে, কিন্তু সেই সব আশা ভরসা এখন কর্পূরের মতো উবে গেছে, এখন সঙ্গী শুধুই উৎকণ্ঠা আর চরমতম সর্বনাশের আশঙ্কা। বন্ধ করা স্নানঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে পথশ্রমের ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিল একটু। হঠাৎ একটা জ্বলন্ত ঘরের আবহে খুলে গেল স্নানঘরের দরজা, সামনে চম্পা দাঁড়িয়ে।
“পালা তুই, পালা জানলা দিয়ে। এই সুযোগ!”
চম্পার এহেন ভোলবদলে বিস্মিত স্বপ্না ক্ষণিক সময় নিলো সম্বিৎ ফেরাতে। তারপরে আর কালবিলম্ব করেনি,
“কিন্তু দিদি তুমি!”
স্বপ্নার গলার আওয়াজটা বড় মিঠে লাগলো চম্পার।
“আমার বোদয় যাওয়া হবেনি রে!তুই যা! সাইদা দিদির মতো মরতে দেবনি আমি তোকে। যা হয় হোক!”
জানলা দিয়ে লাফিয়ে পরে পাঁচিল টপকে একবার ফিরে তাকালো স্বপ্না।চম্পাকে বাঁচাতে, সাহস সঞ্চার করে একটু ফিরে আসতেই চোখে পড়লো তিনটি পুরুষের ছায়ামূর্তি, খোলা জানলা দিয়ে তারাও বেরিয়ে আসতে চাইছে, ওকে ধরে নিয়ে যেতে, কিন্তু একি, অগ্নিময় শরীরে কেউ যেন গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে ওদের, দাউদাউ করে জ্বলে যাচ্ছে তিনটি ছটফট করতে থাকা শরীর, আর সেই প্রজ্জ্বলিত মানুষটি সর্বগ্রাসী আগুন নিয়ে যেন প্রলয়নৃত্য করে চলেছে, ওই বাড়ির সমস্ত পাপ, সমস্ত ক্লেদ ভস্মীভূত করার মানসে। লেলিহান আগুনের শিখায় ঝলসে গেল দৃষ্টিপথ, আর ফিরে তাকায়নি স্বপ্না।
“হারামজাদী, কাকে পাঠিয়েছিলি তুই! রেন্ডি মাগী একাই চার চারটে ছেলেকে পুড়িয়ে মারলো আর নিজেও মরলো। শালী আরেকটা কোথায় পালিয়েছে যদি ধরতে পারি, ওটাকেও সাইদার মতো মারবো! শালী তোর চম্পা নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আমার ভাইপোকে জড়িয়ে ধরেছিল জানিস!ছেলেটার মুখটাও দেখতে পেলো না ওর মা, শেষবারের মতো, এত জ্বলে গেছে।”
সবার অলক্ষ্যে কেউ বুঝি মানদন্ড রেখে ন্যায়বিচার করলেন।
স্বপ্নার কি হয় এরপরে কারুর জানা নেই, বারবনিতাদের পল্লীতে রাত্রিযাপন করা অদূষিত মেয়েটি, সভ্য সমাজে বা তার পরিবারের আশ্রয় পেয়েছিল কিনা, তা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রেখে দেয়। শোনা যায়, দুগ্গামাসীকেও পুত্রশোকে পাগল হয়ে, হরেনবাবু নিজেই হত্যা করেন, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের বস্তি। কিন্তু চম্পা, বা অসময়ে ঝরে যাওয়া এরকম আরো কত প্রাণ প্রশ্ন রেখে যায় সমাজের কাছে, সত্যিই কি এই প্রাণগুলোর মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমরা? এরকম অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আশেপাশে আমাদের, কিন্তু তার কত গুলোই বা যোগ্য ন্যায়বিচারের আলোয় আলোকিত হয়?
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ কাম্য, কিন্তু এই সব ক্ষেত্রে আমরা প্রতিকারেই সীমিত রেখে দিই আমাদের কর্তব্যকে। একটি মানুষের যৌনতা তার অস্তিত্বের দোসর। তাহলে কোনওভাবেই কি যৌনতাকে পণ্য হিসেবে বাজারে ঠেলে না দিয়ে, এই সমস্ত মানুষগুলোকে বিকল্প জীবিকার কোনো সন্ধান দেওয়া সম্ভব ছিলো না, না কি সদিচ্ছার অভাব সেই রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চোখ গুলোতেই ঠুলি বেঁধে রেখে দিয়েছে?
প্রশ্ন থাকবেই!
ছবিঋণ: গুগল
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=879733682206475&id=707552542757924
Thursday, March 15, 2018
#নিষিদ্ধ_যাপন #পঞ্চম_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা
__________________________________
টানটান বিছানা, জানলার ওপারে সমুদ্রের গর্জন। তার সাথে পাল্লা দিয়ে অমানুষিক কামের আশ্লেষ আহ্বানের শব্দরা ধরা দিচ্ছে না মানে বোঝার জন্য। উপর নীচে দুই মত্ত শরীর। ঘন মুহূর্ত ঘন নিঃশ্বাস । ঘামের ফোঁটা নাকের ডগায়, নাক ঠোঁটের মাঝে জমে উঠেছে । উন্মুক্ত ঠোঁট, হাতের বাঁধনে শরীর তীব্র সুখের সন্ধানে অলিগলি খুঁড়ছে অন্ধ হয়ে।
“ ওহ্ কাম অন মাদারফাকার! ”
লহমায় ঠান্ডা হয়ে গেল উপরের শরীর, সাম্রাজ্য বিস্তার করছিল যে। খাট থেকে নেমে, সোজা হয়ে দাঁড়ালো, মাথা নীচু। বিছানায় ছটফটে অপর শরীর শ্বাস টেনে টেনে তখনও
“ ওহ্ সন অফ বিচ , কাম, কাম। নিড ইউ। ”
সাঁড়াশী হাতের মোহে ধরা দিল বালিশ, চেপে ধরল শ্বাস টানা শরীরের মালিকের মুখে।
গোঁ গোঁ গোঁ… টান টান শরীর।
দাঁতে ঠোঁট চেপে শেষবারের মত গলির উৎসমুখে গেঁথে বন্ধ করে দিল চাওয়া পাওয়ার দরজাটা। ঠোঁটের নোনতাস্বাদ জিভ ছুঁলো।
_________________________________
দরজার তালাটা টেনে দেখে মেহুল চাবিটা আলতো হাতে রুমালে ভালো করে মুছে শুইয়ে দিল বাগানের একটেরে থাকা সাদা গোলাপের ঝরে পড়া পাপড়ির নীচে। বেরিয়ে যেতে যেতে একবার বাড়ির দিকে তাকালো মেহুল। ঐ যে দক্ষিণমুখী ঘর, দোতলার বক্স খাটে ঘুমিয়ে আছে অন্ব, অন্বয়ী। মায়ের মত করে একই ভঙ্গিতে একপাশ ফিরে। নিজে শুইয়ে রেখে এসেছে, কাল প্রচন্ড পরিশ্রম গেছে, পরিশ্রান্ত মানুষ তো!! ঘুমোক। মাছিরাও বিরক্ত করতে পারবে না এমন ঘুম ঘুমোক। বাবা মারা যাওয়ার পর শীতের শেষ মাঝরাতে ঘুমচোখে মায়ের পরিশ্রান্ত মুখে স্বেদবিন্দু তাকে উত্তেজিত করেছিল, পরম যত্নে মাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল সে। পাশ ফিরিয়ে চাদর চাপা দিয়ে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে পাড়ি দিয়েছিল অচেনা শহরে। আসার আগে জ্যেঠুর দরজার চিলতে ফাঁক দিয়ে আলোর ভার অন্ধকার বয়ে আনছিল। এক শহরে বেশিদিন টিঁকতে পারে নি, শহর থেকে অন্য শহরে যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াত। পালিয়ে বেড়াত। “ বেচারা বাবাটা, তার কিছুই ছিল না নিজের। ” সম্পর্ক চায় না সে, শরীরের গন্ধে তার অমোঘ নেশা ।
রাতের অন্ধকারের অতিথি অন্বয়ীর শঙ্করপুরের শঙ্খমালা বাড়ি থেকে দিনের আলোয় পরিচিত পায়ে হেঁটে ফিরছে। সোনা রোদ ছুঁচ্ছে বুক, পিঠ ।
“ ওঁ জবা কুসুম সংকাশং… ”
আচ্ছা সে অপরাধ বোধে ভুগত কি ? সে তো অনুতপ্ত বোধ করেনি কখনো, এখনোও তো করছে না।
বাবা মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি “ রক্তবীজ ” আউড়ে গেছে। মনে পড়ে।
শেষ রাতের জয়ী পরাজিত হ্যাঁ দুটোই তো সে, সেই ‘ মাদাররর্ ফাকারর্ ’টা
ফিরছে নিজের অতিথি শালায়, অন্বয়ীর শঙ্করপুরের বাড়ির অতিথি এখন ফিরছে। যেখানে রম্যাণী আছে, শাওন আছে, আর আছে ক্যাফেতে আসা সেই মানুষটা। সেই মানুষটার টানেই ফিরছে। একবার জিজ্ঞেস করতেই হবে
“ ক্যাফেতে কি করতে আসেন ? ”
হয়ত দেখা হয়ে যেতে পারে দুজনে কোনো একদিন অতিথিশালার সোফায়, চেয়ারে টেবিলে, খাটে, ছাদে । অনুভবে বাঁচা হয়ে যেতে পারে এক একটা দিন রাত।
__________________________________
রম্যাণী সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে এই সাতসকালেই মেহুলের দিকে। বর্ষীয়ান পুলিশ অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করছেন অন্বয়ী মল্লিকের মার্ডারকেসের। শঙ্করপুরের তার বাগানবাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে মৃতদেহ। তার সেক্রেটারি ডায়েরি করেছে। ফোনের কললিস্টের নাম্বার ধরে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। লাস্টের দুটো নাম্বারের আগে মেহুলের নাম্বার। আজ ক্যাফেতে কাস্টমার নেই। রম্যাণী, মেহুল ও পুলিশ অফিসার। সন্তুষ্ট পুলিশ অফিসার থানায় ডেকে পাঠানোর আদেশ দিয়ে মসমসিয়ে জিপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
রম্যাণীকে খোলা বুকে টেনে নিতে নিতে বড় করে শ্বাস ফেলল মেহুল। মুখে ক্লান্তির ছাপের ভান রেখে রম্যাণীর ঘন চুলে নাক ডুবিয়ে নিশ্চিন্ততা অনুভব করতে লাগল। ভাগ্যিস, দুজনের ফোন যাওয়ার আগের দিন থেকেই এই শহরের ঘরে একলা শুয়ে বিশ্রাম নিয়েছে।
দরজা ঠেলে ঢুকল ক্যাফের নিশ্চুপ প্রথম মানুষ। আজ আর কোণের চেয়ারে গিয়ে বসল না। এগিয়ে এল মেহুলের দিকে, ঝুঁকে পড়ে হ্যান্ডশেক করল। মেহুলের শরীর ঝটকা লাগল তার গভীর চোখের দিকে তাকাতেই। মানুষটা হেসে বেরিয়ে গেল দরজা ঠেলে।
চলে যাওয়া মানুষটার থেকে চোখ সরিয়ে নিতে নিতেই বেজে উঠল মেহুলের ফোন
“ বনমালী তুমি, পরজনমে হইও রাধা ।”
ফার্নিচারের দোকান থেকে কল।
রম্যাণীকে বুক থেকে সরিয়ে ফ্রেশ হতে ঢুকল বাথরুমে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুখে জলের ঝাপটা দিতেই পিছনে ওরা কারা সব ?
অল্পবয়সের জ্যেঠু, যৌবন বয়সের জ্যেঠু, মধ্যবয়সের জ্যেঠু একে একে একে পেছন থেকে শরীরে মিশছে। সবশেষে দাঁড়িয়ে একটু আগে চলে যাওয়া মানুষটা। হাতের ফোনটা মেহুলের ফোনের পাশে রেখে মেহুলের শরীরে মিশে যাওয়ার আগে টের পেল তার মাথা ঘুরছে কারণ
এ তো এ তো প্রৌঢ় জ্যেঠু , যার মত দেখতে তাকে। প্রৌঢ় হলে তাকে এমনিই দেখতে হবে হয়ত। শরীরে মিশে গেল প্রত্যেক বয়সের জ্যেঠু। মেহুল হাত বাড়াল তার ফোনের পাশের ফোনটার দিকে, কিন্তু কোথায় ফোন ?
শুধু মেহুলের ফোনটাই একলা পড়ে আছে। তার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে ?
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
মনে পড়ল জ্যেঠুর ভীষণ প্রিয় ছিল গানটা, কবে যেন তার পছন্দের গানের লিস্টে মিশে গেছে এই গানটা খেয়াল করা হয়নি।
আয়নায় ঘুষিটা বসাতে বসাতে মেহুল চিৎকার করে উঠল
“ বাবা , সন অফ বিচ হেয়ার। রক্তবীজ হেয়ার বাবা। ”
(সমাপ্ত)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860091930837317&id=707552542757924
#নিষিদ্ধ_যাপন #চতুর্থ_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা
তিনজনে প্রায় একই বছরে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গেল আগে পরে । মেহুলের একেক সময় হিংসে হয়, একেক সময় আনন্দ। মিশ্র অনুভূতিতে ভাসতে ভাসতে তার শরীর উত্তপ্ত হতে থাকে। কাউকে পাশে বসিয়ে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।
ফোনটা বেজে উঠল।
অন্বয়ী ফোন করেছে । অন্বয়ী মল্লিক, ফ্যাশন ডিজাইনার। আপাতত অন্বয়ী তার ছোট্ট ক্যাফেতে ইনভেস্ট করতে রাজী , চল্লিশ শতাংশ লাভের বিনিময়ে। ক্যাফেটা ভালো করে সাজাতে চায় সে। একটা বেতের সোফাসেট কিনবে, আরেকটা কফি মেশিন, বেশকিছু জিনিসও।
এতদিন অন্বয়ীর সাথে অনলাইনে মেল চালাচালি করে কথা হয়েছে। এবার সামনে গিয়ে কনভিন্স করতে হবে। ফোনটা রিসিভ করে সে।
“ আমি কি মিস্টার মেহুলের সাথে কথা বলছি , অন্বয়ী মল্লিক হেয়ার।”
হাস্কি গলার আওয়াজে কাটা কাটা বাক্য ভেসে আসে।
মেহুল সোজা হয়ে বসে।
ব্যবসায়িক কথা চলতে থাকে।
জীবন চলে। সপ্তাহ আসে যায়।
মেহুলের সাথে ক্যাফের আগন্তুকের দেখা চলতে থাকে। এগিয়ে এসে কথা বলা হয় না এই যা। রম্যাণীও আসে প্রায় প্রতিদিন , বিনা শর্তে মেহুলের হাতে হাতে সাহায্য করে। একটা কিন্ডারগার্টেনে অতিকষ্টে চাকরিও জোগার করে নিয়েছে। স্বামী কোনোদিন ফেরে ঘরে কোনোদিন ফেরে না। তাকে উৎখাত করেনি। দুজনের দেখা হয় না একছাদের নীচে থেকেও। রম্যাণী এই বিষয় নিয়ে দুঃখও করে না। মেহুল মাঝে মাঝে ভাবে মানুষ কত অদ্ভুত , অভ্যাসের বশ হয়ে গেলে সেই জীবন নিয়েই বেঁচে থাকে। রম্যাণীর ব্যক্তিত্ব আকর্ষণ করে তাকে , চুম্বকের মত।
তবে এখন রম্যাণীকে অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। কেমন যেন একটা সম্পর্কের নাম দিতে চায়। নামহীন সম্পর্কের মাধুর্য হারাবে নাম পেলে, যেন বুঝতেই চায় না। সম্পর্কের নাম হলেই সেটাতে উৎসাহ হারাবে মেহুল। ঠোঁটের কোণে পাতলা হাসিটা ফিকে হয়ে আসে।
অন্বয়ী মল্লিকও কম যান না। তাঁর অফিসে বেশ কয়েকবার গেছে সে, আমন্ত্রণ জানাতে তিনিও এসেছেন, ক্যাফে ঘুরে দেখে গেছেন। রূপান্তরকামী মানুষরা হেলাফেলার চরিত্র হন না তা বোধহয় অন্বয়ী মল্লিককে দেখলে বোঝা যাবে। ঝজু শরীর, দৃঢ়চেতা মন, কমকথার মানুষ।
রম্যাণীর উপর নেশাটা কমে আসছে মেহুল টের পায়, গোলাপ সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে গেলে যেমন কুঁড়ি খোঁজে মন, কিংবা অর্ধপ্রস্ফুটিত কুঁড়ি। ঠিক তেমন ভাব নিয়েই মেহুল আকৃষ্ট হচ্ছে অন্বয়ীর উপর। অস্থির বা বিরক্তিতে ল্যাপটপে আঙুল ঠোকা, সিগারেটে টান দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকানো, জুতো ট্যাপ করতে থাকা।
না না না! তার এ কী হচ্ছে ? সে মানুষ থেকে কী অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। কেমন করে সব মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে সে ? প্রশ্নরা ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়।
নগ্ন হয়ে আয়নায় চোখ রাখলে কি নিজেকে চেনা যায় ? প্রায়ই এই সম্পর্কহীন মানুষটা জলবিন্দুর কাম, প্রেম মেখে আয়নার সামনে দাঁড়ায় । রেখায় রেখায় আঙুল রেখে পূর্বসুরী খোঁজে। জেঠু না বাবা ? ঘুসিতে চিড় খেয়ে যায় কাঁচ প্রায় প্রতিদিনই, প্রতিদিনই নতুন কাঁচ আসে।
এখন বড় অপ্রেমিক লাগছে নিজেকে। শিকড়টা খুঁজে পেলে কালঘুম ঘুমানোর আগে শান্তির পরত লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত । তা কি করে সম্ভব !! এখনকার বাড়িতে গরাদ হয় না, কালো আলকাতরা লাগানো লোহার শিকের গরাদ। হয় না কড়িকাঠ। আধুনিক ছাদের গা জুড়ে নেমে আসে কৃত্রিম নকসী রাত, চাঁদ, তারা। বাল্বের উজ্জ্বলতা ধার নিয়ে
নির্ঘুম চোখে জ্বলজ্বলে কৃত্রিমতা নির্লজ্জ হয়ে ওঠে। আজকাল মেহুলের আকাশ দেখতে ইচ্ছে করলেই ছাদে উঠে শোয়। গরমকালে মাদুর পেতে, শীতকালে স্লিপিং ব্যাগ। ঘন নীল আকাশে, কাস্তের ধারের মত একফালি চাঁদ, চারদিকে ছড়ানো তারার আতসবাজির ফুলকি। আকাশের তারায় আপনজনেরা ঘর বানায়, মা কখনো বলেনি, বরং মা বলতে মনে পড়ে আকাশের কালপুরুষকে। মা বলতে মনে পড়ে মিঠাপাতি পান ছেঁচার গন্ধ, মা বলতে মনে পড়ে বৃহস্পতিবার আলতার ছাপ ফেলা জলছাপ বিছানার চাদরের কোণায়, মা বলতে মনে পড়ে শাড়িতে হলুদ রঙের হাত মোছার দাগ।
__________________________________
বেশ কদিন কেটে গেছে। রম্যাণী এখন নিয়মিত আসে, কপালের সিঁদুরের টিপটা তিরছে দাগ টেনে নিষিদ্ধ ডাক ডাকে মেহুলকে । ঠোঁট শুকোয় , বুক শুকোয় তেষ্টায়। গলা অবধি তেষ্টাটা ঢোঁক গেলে। ঘন কাজল চোখের গভীর ডাককে অস্বীকার করতে পারে না মেহুল । অতিথিশালা এখন রম্যাণীকে চেনে , প্রায়ই তাপ মাখে যে। মেহুল একেকসময় অতিথিশালাকে মানুষ ভাবে। যে উদার হৃদয়ের মানুষ। যে আসুক তাকে কর্পূর জল দেবে , বাঁচার জন্য পাত সাজিয়ে রসদ দেবে, খানিক পুঁটুলি বেঁধে দেবে আগামী দিনের জন্য । একেকসময় অতিথিশালার দেওয়ালের সাথে ঝগড়া করে , কথায় বলে না ওদের তো কান আছে। ফিসফিসে ঝগড়া, ঘ্যানঘেনে ঝগড়া, পিঠ দিয়ে বসে কথা চালাচালি সবরকমই করে যায় মেহুল।
আচ্ছা এ কেমন মানসিকতা !! ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষের ঠোঁটের উপর চোখ আটকে যায়, কামনার অঙ্গ তীক্ষ্ণ সজীব হয়ে ঠোঁট চাটে। লিঙ্গভেদ মানে না, হাতের মুঠোয় ধরে গলায় মুখ ডুবিয়ে গন্ধে মাতাল হতে ইচ্ছে করে। তবে কি পাগল হতে অল্পই বাকি, মেহুলের নিজেকে নিয়েই ধন্ধ জাগে।
থুতনিতে তিল , শাঁওলা রং, গ্লসি লিপস্টিক, কানে, নাকে স্টাডে মেহুলের চোখ মুগ্ধতা নিবেদন করে চলেছে টেবিলের এপার থেকে। ঘুরন্ত চেয়ারে অস্থির ব্যক্তিত্ব।
“ সাচ এ সন অফ বিচ, ফাক ”
অন্বয়ী মল্লিকের মুখ থেকে শব্দটা যেন ছিটকে এল। চমকে মেহুল ভাবনা সামলাতে সামলাতে পিছিয়ে গেল। তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে না, ফোনেতেই কার উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করেছেন। আগুনের ফুলকির মত ছিটকে এসে মেহুলের নরম চামড়ায় আটকে গেল। এই নোংরা শব্দটা তাকে দুর্বল করে দেয় জাড় থেকে। অন্ধকারে মুড়ে যায় ভেতরটা, মনের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হতে থাকে বাবার গলা। ঘরের ঠিক মাঝখানে ফুটে ওঠে ছোট মেহুলকে বুকে জড়িয়ে মাতৃমূর্তি। দরজার ওপারে জ্যেঠুর গলা,
“ ভুল বুঝছিস ভাই , ভুল বুঝছিস ”।
কখনো কখনো মাতৃমূর্তিটা পুরুষ মূর্তিতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। গর্জানো পুরুষ মানুষটা একই থাকে।
বাচ্ছা মানুষটার দিকে আঙুল তুলে পুরুষ মানুষটা চেঁচায় “রক্তবীজ, রক্তবীজ”
অতীত ভেসে আসে সময় উজান বেয়ে। দেওয়ালের ঠান্ডা বুকে নিজেকে না মেশালে মেহুলের এই অতীত ঘরটা হারায় না। হারায় না একটা তীব্র জ্বালা। ঘর থেকে ক্যাফে যাওয়া আসার পথটুকু হেডফোনের নরম আব্রুতে ঢাকা থাকে কান, যাতে কোনোভাবেই না কোনো নোংরা শব্দ একদিনের মত স্তব্ধ করে দেয়।
(ক্রমশ...)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860089917504185&id=707552542757924
#নিষিদ্ধ_যাপন #তৃতীয়_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা
রম্যাণীর ভ্রূ ধনুকে টঙ্কার দিয়ে ওঠে মানে তেমনই লাগে মেহুলের। বুকের মরীচিকা , মরুভূমি হয়ে যায় নিমেষে। রম্যাণী দ্বিতীয় কুকিটা ভাঙে না, ক্লান্ত ভঙ্গিতে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসে। মেহুলের চোখে কি যেন পড়ে, আঙুলরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
রাত গভীর হয় , ক্যাফে ফাঁকা হতে থাকে। নটা বাজতেই চত্বর ফাঁকা। মেহুল প্লেট গুছিয়ে ফেলে ডাস্টবিনে। খুচরো গোনে নিঃশব্দে। রম্যাণী দেওয়ালে মাথা হেলিয়ে বসে থাকে।
নীরবতা অগভীর আঁধারে পা দিয়ে ঢেউ তোলে।
মেহুল ক্লোজড বোর্ডটা ঘুরিয়ে দেয় । ধীর পায়ে হাত কচলে রম্যাণীর পিঠের পিছনে দাঁড়ায়। নারীর শরীর কাঁপছে। মায়ের শরীরও কাঁপত চাপা কান্নায়। আস্তে করে হাত রাখে হলুদ ফর্সা কাঁধে, বড় চেনা অকাল বর্ষণের আভাস ।
টেবিলে লুটোয় ক্লান্ত নারী, সাদা মেঝেতে আঁচল লুটোয়।
শ্রীফল ছুঁয়ে যায় টেবিলের ধার।
নারী আশ্রয়ের নামে বুক চায় , বাঁধভাঙা কান্নায় ভাসাতে। আক্রোশের কামে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে।
শাটার নামে । বন্ধু-পুরুষের বুক ঘেঁষে নারী অতিথিশালায় পৌঁছয়। কালো সোফা নগ্নতা ঢাকে নীল ভেলভেট চাদরে ।
রাতের বাঘিনী রক্তের স্বাদ ঠোঁটে মাখে।
সকাল আসে নিয়ম মেনে, বিছানায় দুটি শরীর, এক শরীর পাশ ফিরে শুয়ে থাকে চোখে হাত চাপা দিয়ে, অন্য শরীর তাকিয়ে থাকে ও শরীরের দিকে। এদিকের শরীর ওঠে, ক্লান্ত বাঘিনীর মেরুদন্ডের উপর ঠোঁট ছোঁয়ায়, কেঁপে ওঠে সে শরীর।
রাত কাটে।
শনিবার সকাল -
মেহুল বিছানা ছেড়ে পা রাখে মেঝেয়। মেঝে জুড়ে অবিন্যস্ত পোশাক। খাটের গায়ে আধা শাড়ির আঁচল, বাকি মেঝের লজ্জা বাড়ায়। আপনমনেই হেসে ওঠে সে।
শরীর ভোগের নেশাটা বাড়ছে মেহুলের।
সূর্যের ছোঁয়ায় নগ্ন ভেনাস অন্য সৌন্দর্য। দেখতে দেখতে মেহুল ধীর পায়ে বাথরুমে ঢোকে। ব্রাশের সাথে কথা সেরে শাওয়ার চালিয়ে দেয়।
শরীর জুড়ে কলঙ্কের দাগ মেহুলের আজ। সারা শরীর জুড়ে অন্য শরীরের গন্ধ, পিঠে নখের আঁচড় চিড়চিড় করে জ্বালা করে। নিজেকেই আলিঙ্গন করে ভিজতে থাকে মানুষটা।
একসময় শেষ হয় স্নান। আজ জবা ফুল ছাড়াই সূর্যের দিকে হাত জোড় হয়,
দীর্ঘ ওঁ কার ধ্বনি,
" ওঁ জবাকুসুম... "
জবা গাছে আজ ভ্রুণ অনেক বেশী। কেউ আলগা বাঁধনে , কেউ ঠিক ঠাক, কেউ বাঁধন ভাঙা । পাতার ভেতর অংশ কুরে কুরে খেয়েছে পোকা , কুঁকড়ে গেছে। ঠিক যেন মায়ের সাথে তার সম্পর্কটা। সম্পর্কের ঘূণ পোকার মতই মনে হল মেহুল।
আজ অনেকগুলো ভ্রুণ সহ ফুটে থাকা ফুল ঝরে পড়ল প্রভুর পায়ে। তুলল না মেহুল, বরং পিছোতে লাগল জবা গাছের দিকে তাকিয়ে। ঘরে ঢুকে দেখল রম্যাণী প্রস্তুত তার স্বামী পরিত্যক্ত পাখির বাসায় ফিরে যেতে। আজ অনেক সামলে গেছে মানুষটা। সব মানুষের একটা সময় ভরসার জায়গা লাগে, যাদের থাকে না তারা দেওয়ালে পিঠ রাখে। মেহুলের হাত রম্যাণীর গাল ছোঁয়, কপালে ছোঁয় ঠোঁট । রম্যাণী আলিঙ্গন করে না , বাথরোব এক হাতের মুঠোয় ধরে থাকে।
রম্যাণী বেরিয়ে যায়, সভ্য সোফা নগ্ন হয়। গা এলায় মেহুল , নিজের দুই হাত উল্টে পাল্টে দেখে। তার হাতের তালু লালচে, মায়ের মত। স্বভাবটাও বোধহয় মায়ের মত। হাত মুঠো করে, মুঠো খোলে। মনে পড়ে এই হাত ছুঁয়েছিল রম্যাণীর নোনতা স্বাদের চিবুক, পিঠ, হাত । আঙুল ছুঁয়েছিল ঠোঁট, কপাল থেকে ঝোড়ো চুল সরিয়ে ঠোঁটেরা মিলিত হয়েছিল। সঙ্গমে শীৎকার ছিল, অভিশাপ ছিল, অধিকার বোধ ছিল , দাবি ছিল না। যেন মৈথুনরত মানুষেরা জানতই সকাল মানেই সীমান্ত পাঁচিলের গায়ে রোদ পড়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠা।
ব্ল্যাক কফি নিয়ে বসে মেহুল , আজ ছুটি । সেই সন্ধ্যায় বেরোতে পারে একটা দরকারে, ইচ্ছে না হলে নাও বেরোতে পারে।
মায়েরও হাত লালচে ছিল, রাতে শুতে আসার সময় মনে হত আরও লাল হয়েছে। হাত বুলিয়ে দিত ছেলের ঘুমন্ত কপালে। চুলে বিলি কেটে দিত। পাশের ঘর থেকে গজরানি শোনা যেত। অসহায় মধ্যবয়সী পুরুষের গর্জন। মেহুল অনুভব করত মায়ের ঘামে ভেজা শরীর একই সাথে ঠান্ডা আবার উত্তপ্তও। কাল রম্যাণীর শরীর জুড়ে তেমনই ভাব খেলা করেছে। প্রতি ঝড়ের পর শান্ত হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলো প্রিয় হয়ে থাকবে সারা জীবন।
মেহুলের হঠাৎ চোখে পড়ে তার বাড়ির গেট খুলে ঢুকছে ক্যাফেতে দেখা প্রতিদিনকার মানুষটা ।
এখানে?
মেহুলকে অনুসরণ করছে নাকি!! অনুসরণ করে পৌঁছে গেছে তার বাড়িতে ?
মেহুলের চোখ স্থির হয় মানুষটার উপর। মানুষটা চিরপরিচিত ঢং-এ জবাগাছের কাছে যায়, গুঁড়িতে হাত বোলায়। কুঁকড়ে যাওয়া পাতায় আঙুল বুলিয়ে আদর করে।মাথা ঠেকায় জবা গাছে। ফোনটা বেজে ওঠে। তার চোখের সামনে দিয়েই মানুষটা মাথা নীচু করে বেরিয়ে যায়।
মেহুল সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্ল্যাকবোর্ডের পাশেই রাখা থাকে বাহারি কাঁসার পাত্র। জল টল টলে, তলদেশে রঙিন কাঁচের মত দেখতে পাথর। পাত্রের উপর ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মেহুল। নিজেকে চিনতে চায়, তাই বোধহয় বার বার ঝুঁকে পড়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে। প্রতিদিনের রুটিন তার ঘষে ঘষে মোছা ব্ল্যাকবোর্ডটা, ঝুঁকে দেখা নিজের প্রতিবিম্ব। মনে হয় মুখের একপাশ জেঠুর, অন্যপাশ বাবার । ভ্রু কুঁচকে ওঠে তার বিরক্তিতে , ক্লান্তিতে সোজা হয়।
চোখ পড়ে যায় জর্জিও জ্যাকোবিডসের আঁকা ফার্স্ট স্টেপ ছবিতে। যদিও এই ছবির দুটি ভার্সন, এখানে প্রথম ছবির নকলটি সাজানো। বৃদ্ধ মানুষটি ছোট্ট নাতনিকে টেবিলের উপর হাঁটা শেখাচ্ছেন, অন্য প্রান্তে শিশুটির বড় দিদি বোনকে ধরে ফেলার মত পোশ্চার নিয়ে অপেক্ষারত। তার ছোট থেকে কিশোরবেলা সবটাই বিপত্নীক জেঠুর কোলে কোলেই কেটেছে। বেশ বড় অবধি দেখেছে জ্যেঠু বুড়ো হয়ে যেতে , বাবার সামনে কোলকুঁজো হয়ে যেতে।
জ্যেঠুর মতই লালচে ফর্সা, আয়ত চোখ, টানা চোখের পাতা তার। অল্প কালো রেখা টানলে চোখ দুটো স্পষ্ট ইশারা করে। এই অভ্যাসটাও জেঠুর থেকেই রপ্ত করেছে সে। সকালে আচমন পুজো সেরে পায়রার পালক কাজলে ডুবিয়ে চোখে রেখা টেনে নিয়ে তবেই ঘর থেকে বেরোতে। সেসময় বাচ্ছা মানুষটা দরজায় পর্দা ধরে উঁকি দিত। জ্যেঠু বেরিয়েই তার হাত ধরে কাছে টেনে নিত। ভেজা ভেজা চন্দনের গন্ধ, চন্দন মাখা প্রশস্ত বুকেতে।
একবার কে এক পিসি ঠাকুমা এসেছিল তাদের বাড়ি , খুঁটিয়ে দেখে মেহুলের গালে ঠোনা মেরে বলেছিল
“ আ মোলো যা , এ ছোঁড়া বিপ্রর মত দেখতে হইছে লা। বংশ বংশ! বংশের ব্যাটা অমনই দেখতে হবেই তো।”
বিপ্রদাস ছিল জেঠুর নাম।
বাবা রেশনের থলি নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
জ্যেঠু চেয়ারে দুলতে দুলতে বই নামিয়ে রেখে অপ্রস্তুত হাসি হেসেছিলেন। মায়ের মুখটা দেখা হয়নি মেহুলের , তাই জানে না কি ভাব খেলা করেছিল।
(ক্রমশ...)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860086967504480&id=707552542757924
#নিষিদ্ধ_যাপন #দ্বিতীয়_পর্ব #ময়ূরী_পাঁজা
বন্ধ দরজা ঠেলে ঢুকছে প্রথম মানুষ , দিনের দ্বিতীয় মানুষ। একে ঠিক বোঝে না মেহুল , মানুষটা আসে , এক কোণে হলুদ চেয়ার টেনে বসে। মেহুলের দিকে গাঢ় চোখে তাকায়। মেহুল মেলাতে না চেয়েও মিলিয়ে ফেলে মানুষটার সমুদ্রের মত গভীর চোখে। মানুষটা অবিকল একই সুরে টেবিল বাজায়, তারপর একটা ফোন আসে, প্রতিদিনই একই সময় বেজে ওঠে ফোনটা। রিংটোনটার মধ্যেই একটা নিশ্চুপ নেশা আছে টের পায় মেহুল।
“ বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা… “
মিনিট দশ থাকার পর মানুষটা জুতো খটখটিয়ে বেরিয়ে যায়। দিনে একবার করেই রোজ দেখা হয় এর সাথে। অদ্ভুত না ?
আজ শুক্রবার। আজ রম্যাণীর আসার কথা। মেহুলের সাথে কিছু সময় বেক ও কবিতায় কাটানোর কথা। তার রম্যাণীকে ভালো লাগে, স্বপ্নসুন্দরী যেন। রম্যাণী আদ্যোপান্ত ' হোম মেকার ' । চ্যাটার্ড অ্যাকাউন্টেট স্বামীর সাথে এ শহরে আছে। নিঃশ্বাস নেয়, রাঁধে। ছুটি কাটায় মেহুলের ক্যাফেতে । প্রতি শুক্রবার আসে , সঙ্গে আনে জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
' হোম মেকার '
মা হোম মেকার ছিল ? ছিলই তো। দরজা খুলে দেওয়া থেকে শোবার ঘরের চাদর একদিকের খাটের পাশে হেলে পড়া সবই মায়ের আয়ত্তে।
প্রথম দিন ব্ল্যাক ফরেস্ট পরিবেশন করতে গিয়ে চোখ পড়ে গেছিল রম্যাণীর হাতের খোলা বইয়ের পাতায়
" ভালোবাসা নিয়ে কত বিবাদ করেছো!
এখন, টেবিল জোড়া নিবন্ত লন্ঠনও সহনীয়।সহানুভূতি। সবজির মতন বিকোয় না হাটে। হাত কাটে, না রক্ত পড়ে না। বিভীষিকা! দুচোখের পক্ষেও নড়ে না।
প্রজড় পিন্ডের মত আছো- আজই বিবাদ করেছো।ভালোবাসা নিয়ে কিছু বিবাদ করেছো, কাতর পাথর মিছু বিবাদ... "
চোখ তুলে দেখার সময় মেহুল দেখেছিল
সেদিন রম্যাণীর চোখের কোণ লালচে, সজল চোখে ধেবড়ে যাওয়া কাজল।
পরে পরে মেহুলের চোখ পড়েছে নাকের উপর বসানো চশমার আড়ালে চোখের পাতায়, ব্যক্তিত্বে, তার জীবন উপন্যাসে। প্রত্যেকটা জীবন একটা একটা উপন্যাস, কোনোটা খোলা কোনোটা বন্ধ। বন্ধুত্ব করে নিয়েছে মেহুল রম্যাণীর সাথে। এখন ও আর রম্যাণী সুন্দর সন্ধ্যা কাটায়, সপ্তাহে একদিনই যদিও। কবিতা আওড়ায়, আঙুলের ভাঁজে শূন্যতার আঁক কষে, আর…. বেক করে। কখনো কখনো গানও গায়।
কাঁচের দরজায় লটকানো ক্লোজড বোর্ডটা ঘুরিয়ে দেয় মেহুল । ওদিকে তিনটে হলুদ হাসিমুখের সাথে ওপেনড লেখা। এবার শুরু হবে মানুষ আসা, ক্রেতা আসা। কেউ হাত ধরে, কেউ পাশে হেঁটে, কেউ হাত ঝুলিয়ে একলা।, পিঠে ক্লান্ত ব্যাগ।
মেহুল প্লেট প্রস্তুত করে, কাঁটা চামচ গুছিয়ে রাখে। ফ্রেশ বেকড খাবারগুলো সাজায়, দামের ট্যাগ বসায়। ছোট্ট মেনু কার্ড বসিয়ে আসে টেবিলে টেবিলে। দুজন স্কুল ছাত্রী কাঁচের দরজা ঠেলে ঢোকে। দিন শুরু হয়ে যায়।
দুপুর গড়ায়। সন্ধ্যা নামে, পড়ন্ত সূর্যের আলো ক্যাফের কোণে কোণে পাতাবাহারি গাছের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে কুকিজের কাঁচের বয়ামগুলোর ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে। এমন সময় দরজা ঠেলে পা রাখে রম্যাণী। আজ পরনে কালো খেসের শাড়িতে রক্তাভ সূর্যের রথ। চোখে গোল ভারী ফ্রেমের চশমা, চশমার ওপারে গাঢ় কাজলটানা। ঠোঁটে ম্যাট ফিনিশড লিপস্টিক। আজ হাতের অলংকার একটা কাঠের চুড়ি, বুকের মাঝে রূপোর দূর্গা। ওকে দেখে মেহুলের মনে পড়ে গেল সেই কবিতাটা, যেটা পরশু গভীর রাতে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিল।
সেই হাত
অভিনব দুটি হাতে দেয়াল দরোজা খুলে দাও। ততক্ষণে রোদ্দুর পৌঁচেছে গোটারাত ঘুরে ঘুরে রোদ্দুর পৌঁচেছে ঘরে।
কিছুটা নড়বড়ে ছিলো ঘর। এককোণে পাথর তেমন সন্তুষ্ট নয়, দখল দখল শব্দ করে।
দাবি তার ঘরটি ভরাবে মানুষের মাথায় চড়াবে তার ভার। আর যদি পারে গিলে খাবে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে...
- শক্তি চট্টোপাধ্যায়
হ্যাঁ, ওর অতিথিশালায় একটি ব্ল্যাকবোর্ড আছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁ পাশে রাখা। নিয়মিত চকের আঁচড়ে ঘষা দাগের কলঙ্কে আবছা হয়ে থাকে। ডাস্টারও আছে বটে তবে মেহুলের নরম হাতটাই বেশি ব্যবহার হয় কলঙ্ক ঘষামাজা আবছা করতে। বহু পুরনো অভ্যাস এ।
রম্যাণী এসে দাঁড়ালো কাউন্টারের কাছে, মেহুলী যেখানে দাঁড়িয়ে তার খুব কাছে। স্নিগ্ধ চন্দনের গন্ধ ভেসে এল অভিসারের আমন্ত্রণ নিয়ে। চন্দনের গন্ধটা মাতাল করে মেহুলকে আজও। প্রতি ভোরে মায়ের গায়ে লেগে থাকত ঘামে ভেজা চন্দনের গন্ধ । বুকে কাঁধে লাল আধা গোল চাঁদ চিহ্ন।
কাউন্টারের তরফ থেকে চিনেমাটির বাটিতে দুটি ফরচুন কুকি অভিবাদন জানায় রম্যাণীকে। অভ্যস্ত হাতের চাপে মাঝ বরাবর ভাগ হয়ে যায় কুকি, বেরিয়ে আসে এক চিলতে রেশমী চিরকুট।
" আজ রাতের অভিসারে রাধারাণী "
(ক্রমশ...)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860086027504574&id=707552542757924
নিষিদ্ধ_যাপন (প্রথম পর্ব) ময়ূরী পাঁজা
গোল বাটি মোমবাতিটা নিভে গেছে। ঘরের মধ্যে উষ্ণতার আবেশ। কাঁচের জানালা বেয়ে পরদার ফাঁক দিয়ে টাটকা রোদ গড়িয়ে এসে উপুড় হওয়া পুরুষ পিঠে প্রগলভতায় লুটোপুটি খাচ্ছে। পিঠের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম , সকালের ঘাসের উপর শিরশিরে শিশির বিন্দুর মতই নিজেদের লুকোতে ব্যস্ত। না রোগা না মোটা পুরুষ মানুষটি উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। বিলম্বিত লয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে। পিঠে আধখানা চাঁদের মত নখের দাগে রাতের কলঙ্ক। কোমরের উপর পাতলা চাদর ঢাকা। পাশেই আরেকটি শরীর শুয়ে, চিৎ হয়ে। আলতো হাতে চাদরটা টেনে ঠিক করে দিয়ে রোদের প্রগলভতা দেখছে, চোখে হিংসে চকচকে। হয়ত পিঠে মুখ গুঁজতে ইচ্ছে করছে !! শ্বাস টানার শব্দে পুরুষ শরীরটি ঘুমিয়ে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে। এদিকের শরীরটি আলতো হাতে নিজেকে তুলে ও মানুষটির মুখ দেখে , নিঃশব্দে শিশুর মত ঘুমোচ্ছে। হাত মুঠো। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে এদিকের শরীরটি ফিরে আসে নিজের জায়গায়। উত্তেজনার ক্ষতে আঙুল বুলোতে বুলোতে নিঃশব্দে হাসে, গা শিউরে ওঠে রাত যাপনের সুখে।
ধরে নেওয়া যাক এদিকের শরীরটির নাম মেহুল , পুরোপুরি প্রেমে থাকা মানুষ। আয়ত চোখ, জোড়া ভ্রু , কামনা উদ্রেককারী ঠোঁট। আপাতত ঠোঁটের কোণে দাগ, নোনতা স্বাদ চুঁইয়ে পড়ে। পাশেই বেড সাইড টেবিলে অগুরু ধূপের ছাই এর পিরামিড। খাটের পাশে অবিন্যস্ত পোশাক, উল্টোনো চটি, সুরক্ষার প্যাকেট। একটা ডার্ক চকোলেটও , দাঁতের দাগ কাঁধে নিয়ে উপুড়। খাঁজ দেখে প্রেমীর চোখ চকচকে হয়ে ওঠে। অন্যমনস্ক আঙুল খেলা করতে থাকে, কামড়ানোর দাগ বরাবর।
মেহুলের জন্মটা কেন হয়েছিল আজও প্রশ্ন করে বাথরুমের টাইলসকে, যেখানটায় প্রতিদিন শাওয়ার চালালেই জল ছিটকে ছিটকে যায়। জলের ফোঁটারা শান্ত হয়ে নেমে আসে গড়ানের দিকে। তাদের পাশে দুটো হাতের পাঞ্জা নরম ছাপ বসায়। জল শরীর বেয়ে নামে, উপত্যকা পেরিয়ে। বাঁধ না মানা আনন্দের লহর তোলে শরীর যন্ত্রে। শিল্পী আঙুলরা শাওয়ারের জলে সেতারের তার খোঁজে। তার ? সম্পর্কের সুতো কিংবা তার একই গোত্রের। যন্ত্রের তার বাঁধা যায়, সম্পর্কের তার সেই যে কাটে কোনো হাতের আদরেই বাঁধা পড়ে না। প্রেমী রোজ ভাবে , রোজ। তারপর নগ্ন দেহে সূর্যকে আমন্ত্রণ জানায় কুন্তীর মত। সেই একই উচ্ছলতা , একই মন্ত্র
" ওম জবাকুসুম শঙ্কাসন কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং ধ্বন্তারিং সর্ব পাপয়ং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্ "
প্রণাম সূর্যদেব।
সূর্যদেব বুক ছুঁয়ে, আজকের মত কবচ পরিয়ে দেন জীবনী শক্তির। মেহুল একটা লাল টকটকে জবা বারান্দায় যেখানে রোদ পড়েছে সেখানে অর্পণ করে। চেয়ারের উপর রাখা থাকে পরবর্তী পোশাক। হালকা গোলাপী বার্থরোব । গলিয়ে নেয়, আলগা গিঁট্টু বেঁধে। ছোট থেকেই গিঁট্টু বাঁধাটা গোলমেলে লাগে মেহুলের। গিট্টু মানে সম্পর্কের তার। কার পরে কি বা কার পরে কে ? জেঠুর পরে মা নাকি বাবার পরে মা !!
হাতে জলের ঝারি নিয়ে মেহুল পা রাখে সবুজ ঘাসে , শিরশিরে অনুভূতি পায়ের তলা ছাড়িয়ে কোমর অবধি শিহরিত করে, ঊর্ধ্বাঙ্গে সূর্যের রক্ষাকবচ। জবাগাছ কান্ড পাতা ভিজিয়ে স্নান করে। একটা একটা বোঁটা ভাঙা কুঁড়ি ভ্রুণ টুস করে পায়ের কাছে খসে পড়ে। মেহুলের তখন নিজেকে প্রভু মনে হয়। ভ্রুণ-টি কুড়িয়ে নিয়ে শোঁকে, বুকের কাছে বার্থরোবের তলায় চেপে রাখে। ফিরে আসে ঘরে। শুরু হয়ে যায় নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। একপেয়ালা সুগন্ধি সবুজ চা-এর নির্যাসে ঠোঁট ডুবে যায়। সাথে নিজ হাতে বেক করা ঝরঝরে কুকিস।
এই ঘরটা নিজস্ব, মেহুলের মায়ার কারণ। এ ঘরে কারুর কোনো ফটো নেই কোথাও , একেকসময় নিজের মনেই হাসে সে । যেন অতিথিশালা এটি , মেহুল সেখানে অতিথি। রাতের অতিথি। চা-পান সেরে মেহুল লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পোশাক পরে , চোখে আলতো কাজল পেন্সিল টানে । বোঝা না যাওয়ার মত। বিছানায় পুরুষটির ঘুম প্রবল। মেহুল রোদটুকু আড়াল করতে পর্দা টেনে দেয়। মুখ অল্প হাঁ করে ঘুমন্ত মানুষটির গালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়েই সরিয়ে নেয় নিজেকে। কান উত্তপ্ত হয়ে উঠবে আর একটুক্ষণ ছুঁয়ে থাকলে।
ডাইনিং রুমের টেবিলে গোলাপী চিরকুটে চাবি রাখার নির্দেশ দিয়ে কিছু খাবার হটপটে রেখে মেহুল বেরোয় একটু দূরের তার ছোট্ট ক্যাফের দিকে। শাটার তোলে, কাঁচের দরজার ওপারে ক্লোজড বোর্ডটায় হাত বুলিয়ে সাফসুতরো করে নিয়ে অভ্যস্ত হাতে বেক করা শুরু করে। ছোট্ট হতে পারে , মানুষ আসে অনেক। মেহুল নিজের জায়গা থেকে দেখে তাদের। টাকা দেওয়ার সময় কারুর আঙুল সরু, প্ল্যাটিনামের আংটি বেড় দিয়ে থাকে, কারুর আঙুল সামান্য মোটা, স্টেনলেস স্টিলের আংটি, কারুর ঝুটো কিন্তু ভালোবাসা মাখানো আংটি অলংকৃত করে। সবুজ ঘাসের শিরশিরে অনুভবটা এইবারে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মেহুলের শিল্পী আঙুল অস্থির হয়ে টেবিল ঠোকে, বেশ কিছু পরে একসময় সব শান্ত। ক্রেতার কথা বার্তা হাসি কিছুই কানে আসে না। আজ কিছু নতুন কেকের কথা ভেবেছে মেহুল , দেখা যাক। ইতিমধ্যেই ফ্রেশ বেকের গন্ধে ক্যাফে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে।
অস্তিত্ব .... অস্তিত্ব!! শিকড়!! টান অথবা তার !! বাবা না জ্যেঠু ? কার কার কার অংশ !! নাকি কারুরই নয় । কার সাথেই তার মিল ?
( ক্রমশ ...)
লিঙ্ক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=860085590837951&id=707552542757924
Thursday, February 15, 2018
শিশুকিশোর বিভাগ দ্বিতীয় সংখ্যার সূচীপত্র
🌹🌷🌸🌼🌻💐
👶🏻👶🏻#শিশু_কিশোর_বিভাগ_টিম_ক্রমশ👶🏻👶🏻
#সংখ্যা-২ (২৯/০১/২০১৮)
🌹🌷🌸🌼🌻💐
বন্ধুরা, আমাদের পেজে শিশুকিশোর বিভাগের দ্বিতীয় পর্বে কী কী ছিল সম্ভার একবার ফিরে দেখে নেওয়া যাক এসো।
🌹🌷🌸🌼🌻💐
জয়া এবং অভিষেকের কলমে ভারি মিষ্টি আজগুবিপুরের মণিব্যাঙের গপ্পো :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838646032981907&id=707552542757924
🐸🐸🐸🐸🐸🐸🐸🐸
সোনালী গুপ্তর কলমে ছোটোবেলার স্মৃতিচারণ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838677609645416&id=707552542757924
👧🏻🧒🏻👧🏻🧒🏻👧🏻🧒🏻👧🏻🧒🏻
প্যাঁচা আর মেনির কাণ্ডকারখানা জানতে হ’লে দেবলীনার এই ছড়াটা পড়া চাই-ই চাই :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838649039648273&id=707552542757924
🐱🦉🐱🦉🐱🦉🐱🦉
ছোট্টবন্ধুরা হাতে অবসর সময় পেলে কী কী করতে পারো একটু আইডিয়া নেবে নাকি সবর্নার এই ছড়াটা থেকে?
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838678406312003&id=707552542757924
🎨🎹🥁📒📚
শুভম আর শুক্তিকার আবৃত্তি আর পুকুম্যানের গল্পপাঠ একবার শুনে দেখো বন্ধুরা, নিশ্চয়ই মজা পাবে।
শুক্তিকার আবৃত্তি :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838690566310787&id=707552542757924
শুভমের আবৃত্তি :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838690896310754&id=707552542757924
ঐশিকের গল্পপাঠ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=839097879603389&id=707552542757924
🎤🎧⭐💫🌈🌸☘🌞🍓🍋🍎🍰🍭🐛🐛
মাকড়দহের মাকড়বাবুর সাথে ছড়ায় ছবিতে একটু আলাপ করবে এসো সুস্মিতা আর ধূপছায়ার হাত ধরে:
সুস্মিতার ছবি, ধূপছায়ার ছড়া :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838682996311544&id=707552542757924
🕷🕸🕷🕸🕷🕸🕷🕸🕷🕸🕷🕸
একঝাঁক ক্ষুদে বন্ধুদের আঁকা রইল সবার জন্য:
আরুভির ছবি আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838657696314074&id=707552542757924
রূপকথার আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838657369647440&id=707552542757924
মৌর্যর আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838658299647347&id=707552542757924
সাম্পানের আঁকা : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838656366314207&id=707552542757924
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838653202981190&id=707552542757924
শুক্তিকার হাতের কাজ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838656109647566&id=707552542757924
পুকুম্যানের আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838655186314325&id=707552542757924
🎨🎨🎨🎨🖌🖍🖌🖍
সুকুমার রায়ের লেখা ‘রাজার অসুখ’ গল্পটা জানো নিশ্চয়ই সবাই। ধূপছায়ার কণ্ঠে একবার ফের শুনে দেখো তো বন্ধুরা কেমন লাগে।
ধূপছায়ার গল্পপাঠ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838692839643893&id=707552542757924
🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻
এই পর্বে পেজে কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন একটা জিনিস। ‘নাটক’... হ্যাঁ বন্ধুরা। সঙ্গী সাথী জুটিয়ে হয়ে যাক জমিয়ে রিহার্সাল, নাকি?
অভিষেকের নাটক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838694752977035&id=707552542757924
🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏
🌹🌷🌸🌼🌻💐
শিশু কিশোর বিভাগের প্রথম পর্বে কী কী ছিল পেজে একবার চোখ বুলিয়ে নিত পারো এই লিংকে গিয়ে বন্ধুরা।
https://www.facebook.com/kromosho.prokashyo/posts/833189640194213
🌹🌷🌸🌼🌻💐
আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় থাকব বন্ধুরা।🕊💐
-টিম ক্রমশ
https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/
👶🏻👶🏻#শিশু_কিশোর_বিভাগ_টিম_ক্রমশ👶🏻👶🏻
#সংখ্যা-২ (২৯/০১/২০১৮)
🌹🌷🌸🌼🌻💐
বন্ধুরা, আমাদের পেজে শিশুকিশোর বিভাগের দ্বিতীয় পর্বে কী কী ছিল সম্ভার একবার ফিরে দেখে নেওয়া যাক এসো।
🌹🌷🌸🌼🌻💐
জয়া এবং অভিষেকের কলমে ভারি মিষ্টি আজগুবিপুরের মণিব্যাঙের গপ্পো :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838646032981907&id=707552542757924
🐸🐸🐸🐸🐸🐸🐸🐸
সোনালী গুপ্তর কলমে ছোটোবেলার স্মৃতিচারণ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838677609645416&id=707552542757924
👧🏻🧒🏻👧🏻🧒🏻👧🏻🧒🏻👧🏻🧒🏻
প্যাঁচা আর মেনির কাণ্ডকারখানা জানতে হ’লে দেবলীনার এই ছড়াটা পড়া চাই-ই চাই :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838649039648273&id=707552542757924
🐱🦉🐱🦉🐱🦉🐱🦉
ছোট্টবন্ধুরা হাতে অবসর সময় পেলে কী কী করতে পারো একটু আইডিয়া নেবে নাকি সবর্নার এই ছড়াটা থেকে?
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838678406312003&id=707552542757924
🎨🎹🥁📒📚
শুভম আর শুক্তিকার আবৃত্তি আর পুকুম্যানের গল্পপাঠ একবার শুনে দেখো বন্ধুরা, নিশ্চয়ই মজা পাবে।
শুক্তিকার আবৃত্তি :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838690566310787&id=707552542757924
শুভমের আবৃত্তি :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838690896310754&id=707552542757924
ঐশিকের গল্পপাঠ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=839097879603389&id=707552542757924
🎤🎧⭐💫🌈🌸☘🌞🍓🍋🍎🍰🍭🐛🐛
মাকড়দহের মাকড়বাবুর সাথে ছড়ায় ছবিতে একটু আলাপ করবে এসো সুস্মিতা আর ধূপছায়ার হাত ধরে:
সুস্মিতার ছবি, ধূপছায়ার ছড়া :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838682996311544&id=707552542757924
🕷🕸🕷🕸🕷🕸🕷🕸🕷🕸🕷🕸
একঝাঁক ক্ষুদে বন্ধুদের আঁকা রইল সবার জন্য:
আরুভির ছবি আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838657696314074&id=707552542757924
রূপকথার আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838657369647440&id=707552542757924
মৌর্যর আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838658299647347&id=707552542757924
সাম্পানের আঁকা : https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838656366314207&id=707552542757924
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838653202981190&id=707552542757924
শুক্তিকার হাতের কাজ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838656109647566&id=707552542757924
পুকুম্যানের আঁকা :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838655186314325&id=707552542757924
🎨🎨🎨🎨🖌🖍🖌🖍
সুকুমার রায়ের লেখা ‘রাজার অসুখ’ গল্পটা জানো নিশ্চয়ই সবাই। ধূপছায়ার কণ্ঠে একবার ফের শুনে দেখো তো বন্ধুরা কেমন লাগে।
ধূপছায়ার গল্পপাঠ :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838692839643893&id=707552542757924
🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻🤴🏻
এই পর্বে পেজে কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন একটা জিনিস। ‘নাটক’... হ্যাঁ বন্ধুরা। সঙ্গী সাথী জুটিয়ে হয়ে যাক জমিয়ে রিহার্সাল, নাকি?
অভিষেকের নাটক :
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=838694752977035&id=707552542757924
🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏🏏
🌹🌷🌸🌼🌻💐
শিশু কিশোর বিভাগের প্রথম পর্বে কী কী ছিল পেজে একবার চোখ বুলিয়ে নিত পারো এই লিংকে গিয়ে বন্ধুরা।
https://www.facebook.com/kromosho.prokashyo/posts/833189640194213
🌹🌷🌸🌼🌻💐
আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় থাকব বন্ধুরা।🕊💐
-টিম ক্রমশ
https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/
Wednesday, February 14, 2018
ঝাঁপ
সুস্মিতা_কুণ্ডু
...................................
-মা গো, বড্ড আঁধার। আলোটা নে’ আয় না শিগ্গিরি। ডর লাগে যে বড়।
-অ বৌ! দাওয়ায় কুপিটা জ্বাইল্যে বস্যে দে না গো। মেয়েটা যে আঁধারকে বড্ড ডরায়। শুনতি পাসনি না কি রে হতভাগী!
-ও বাপ! মা’রে বল না।
-অ বৈঁচীর মা! পুকুরঘাটকে গেলি নাকি? দ্যাকো দিকি। এই অ্যাতো রেতে কেউ ঘাটে যায়। কোতায় তেঁনারা থাকবেন কী লতারা থাকবেন সব। ছোবলালেই কম্ম সারা। অ বৈঁচী! তুই বোস দিনি এট্টু খাটিয়াটায়, এই ক্যাঁতাটা জইড়ে নে বেশটি করে।
একনো কালীপুজো হ’লুনি আর ঠাণ্ডা দ্যাকোনা কনকনিয়ে পড়েচে কেমন।
আমি একটু এগ্গে তোর মা’রে খুঁজে আসিখ’ন।
................
-ও ন’খুড়ী! আমাদের বৈঁচীর বাপকে দেকেচো? এদিক পানে এয়েচে মানুষটা?
-না লো ফুলবৌ। এ্যাত রাতে তাকে বেরোতে দিলি ক্যানে রে? একটা অগটন ঘটবে।
-অগটন আর কী লতুন করে হবে গো খুড়ী। যা হওয়ার তো হয়েই গ্যাচে। এই কালীপুজোর অমাবস্যার তিথিটি এলি পরেই মানুষটা কেমন করে গো খুড়ী। দরজায় শেকল দে’ আটকে রাকি। তাও শুনতি পাই মরা মেয়েটার সাতে কতা কইচে। কখন বলে তারে নাকি বাজী কিনে দেবে, কখন বলে দোকনেশ্বরে কালীঠাকুর দ্যাকাতে নে যাবে।
লোকটার মনেও নেই পাঁচ বচ্ছর আগে কালীপুজোর দিনটায় কী হয়েচিল গো খুড়ী।
-থাক ফুলবৌ। ও কতা মনে করিসনি।
-পারিনে যে খুড়ী, পারিনে। সবাই যকন তারাবাজী জ্বালচে, আলোয় আলোয় জমিন আকাশ ধবধব করচে, তকন মেয়েটাকে আমার টেইন্যে নে গেল আঁধার ঝোপেতে, শয়তানগুলো। পরদিন পুকুরে...
দ্যাকোনা, শিকলটা খোলা, দাওয়াতে খাটিয়া পাতা। লোকটা কোতাও নেই। সেই কখুন থেকে খুঁজচি।
........................
-ও ফুলজেঠি তুমি হেথা!
-কেন রে বিশু? কি হয়েচে?
-শিগ্গির যাও। ফুলজ্যাঠাকে পুকুরঘাটে সবাই দেকতে পেয়েচে ঠাকুর বিসজ্জন করতে গিয়ে। মনে হচ্চে বেশ খানিকক্ষণ আগেই ঝাঁপটা মেরে ছেল...
(সমাপ্ত)
...................................
-মা গো, বড্ড আঁধার। আলোটা নে’ আয় না শিগ্গিরি। ডর লাগে যে বড়।
-অ বৌ! দাওয়ায় কুপিটা জ্বাইল্যে বস্যে দে না গো। মেয়েটা যে আঁধারকে বড্ড ডরায়। শুনতি পাসনি না কি রে হতভাগী!
-ও বাপ! মা’রে বল না।
-অ বৈঁচীর মা! পুকুরঘাটকে গেলি নাকি? দ্যাকো দিকি। এই অ্যাতো রেতে কেউ ঘাটে যায়। কোতায় তেঁনারা থাকবেন কী লতারা থাকবেন সব। ছোবলালেই কম্ম সারা। অ বৈঁচী! তুই বোস দিনি এট্টু খাটিয়াটায়, এই ক্যাঁতাটা জইড়ে নে বেশটি করে।
একনো কালীপুজো হ’লুনি আর ঠাণ্ডা দ্যাকোনা কনকনিয়ে পড়েচে কেমন।
আমি একটু এগ্গে তোর মা’রে খুঁজে আসিখ’ন।
................
-ও ন’খুড়ী! আমাদের বৈঁচীর বাপকে দেকেচো? এদিক পানে এয়েচে মানুষটা?
-না লো ফুলবৌ। এ্যাত রাতে তাকে বেরোতে দিলি ক্যানে রে? একটা অগটন ঘটবে।
-অগটন আর কী লতুন করে হবে গো খুড়ী। যা হওয়ার তো হয়েই গ্যাচে। এই কালীপুজোর অমাবস্যার তিথিটি এলি পরেই মানুষটা কেমন করে গো খুড়ী। দরজায় শেকল দে’ আটকে রাকি। তাও শুনতি পাই মরা মেয়েটার সাতে কতা কইচে। কখন বলে তারে নাকি বাজী কিনে দেবে, কখন বলে দোকনেশ্বরে কালীঠাকুর দ্যাকাতে নে যাবে।
লোকটার মনেও নেই পাঁচ বচ্ছর আগে কালীপুজোর দিনটায় কী হয়েচিল গো খুড়ী।
-থাক ফুলবৌ। ও কতা মনে করিসনি।
-পারিনে যে খুড়ী, পারিনে। সবাই যকন তারাবাজী জ্বালচে, আলোয় আলোয় জমিন আকাশ ধবধব করচে, তকন মেয়েটাকে আমার টেইন্যে নে গেল আঁধার ঝোপেতে, শয়তানগুলো। পরদিন পুকুরে...
দ্যাকোনা, শিকলটা খোলা, দাওয়াতে খাটিয়া পাতা। লোকটা কোতাও নেই। সেই কখুন থেকে খুঁজচি।
........................
-ও ফুলজেঠি তুমি হেথা!
-কেন রে বিশু? কি হয়েচে?
-শিগ্গির যাও। ফুলজ্যাঠাকে পুকুরঘাটে সবাই দেকতে পেয়েচে ঠাকুর বিসজ্জন করতে গিয়ে। মনে হচ্চে বেশ খানিকক্ষণ আগেই ঝাঁপটা মেরে ছেল...
(সমাপ্ত)
ভবিষ্যৎ
ময়ূরী পাঁজা
টানা ইংলিশে একটানা বক্তৃতা দিয়ে থামলেন বিনয় বাবু। সামনের বেঞ্চের ছাত্রটি তুতলে তুতলে একটা প্রশ্ন করতেই ক্লাসের বাকিরা হেসে উঠল। জনহাস্যরোলে চাপা পড়ে গেল প্রশ্ন।
উষ্ণ হাতের স্পর্শে মাথা তুলতেই ছাত্রটি বিনয়বাবুকে দেখতে পেলে। তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ক্লাস থেকে বেরতে বেরতে মনে পড়ল তাঁর ছাত্রবেলায় ঠিক এই স্পর্শ অমল স্যার করেছিলেন ,
তবেই না প্রফেসর বিনয় চক্রবর্তী হয়েছেন।
( সমাপ্ত )
অস্ত্র উঠুক : গৌরচন্দ্রিকা
সিরিজ ১: অস্ত্র উঠুক
গৌরচন্দ্রিকা
*****************
সুস্মিতা কুণ্ডু এবং শুভদীপ সাহা
হুঁকোটায় একটা হেঁইয়ো করে জোরসে টান দিয়ে, আমেজে শিবনেত্র হয়ে বসেছিলেন ভোলানাথবাবু। একটুকুনি ছাই বাঘছাপ গালচেটায় পড়তেই ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেল ভোলানাথবাবুর। বিরস বদনে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে ফের আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। বিলকুল ভুলে মেরে দিয়েছেন। পারোসুন্দরী এযাত্রায় আর আস্ত রাখবেনা। তেড়েমেড়ে হাঁক পাড়লেন দুই 'পুরাতন ভৃত্য'-কে।
"ওরে ওই নোদে, কোতায় গেলি হতচ্ছাড়া ভেঙ্গো"।
তড়িঘড়ি তেলচিটে গামছায় হাত মুছতে মুছতে দুই মক্কেল পড়ি কি মরি করে ছুটে এল।
"এজ্ঞে কী হয়েচে কত্তাবাবা? তামুক ঠিক সাজা হয়নি বুজি? এক ছিলিম এক্কুনি সেজে আনচি ফের। সব ওই নোদেটার দোষ" - বলে ভেঙ্গো।
নোদে কাঁইমাঁই করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, থামিয়ে দিয়ে ভোলানাথবাবু হুঙ্কার ছাড়লেন - "দুটোর মাথাই এই ডুগডুগি ছুঁড়ে ভাঙব! এক হপ্তা আগে যে জিনিসগুলো নিয়ে আসার কথা বলেছিলুম, নিয়েইচিস ?"
দুই ভৃত্য একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে এক হাত লম্বা জিভ বার করে। ভোলানাথবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বেশ খানিকটা তান্ডব নাচ করে নেবেন ভেবেও ক্ষ্যান্ত দেন। 'রতি'-র বিউটি পার্লার থেকে 'পারো' আসার আগে ওগুলো চাই-ই-চাই। নইলে তৃতীয় নয়ন থেকে বাঁচানোর সাধ্যি ব্রহ্মা বিষ্ণু কারোরই নেই।
ফের গলা ছাড়লেন - " কাতুউউউউ! গনুউউউউ! শিগ্গির আয় এখানে।"
দুই ভাই এসে হাজির হল বাপের কাছে। এত হাঁকডাক শুনে লাকি আর সরো-ও থাকতে না পেরে হাজির হল, নিজেদের দ্বিপ্রাহরিক রূপটান ছেড়ে।
ভোলানাথ এবার নোদে-ভেঙ্গো কে ছেড়ে এদের ওপর চড়াও হলেন।
"বলি কবে থেকে যে তোমাদের মাতাঠাকরুণের জং ধরা অস্ত্র-শস্ত্রগুলো বিশ্বকর্মার ওয়ার্কশপে পালিশ করার জন্য পড়ে আছে, সে খেয়াল আচে?"
কাতু সদ্য গজানো গোঁফটায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে -
"ওই মান্ধাতার দাদুর আমলের টিনকাটাগুলো নিয়ে মা যাবে মর্ত্যে যুদ্ধ করতে! তাহলেই হয়েচে। শুরুর আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আমিই তো আমার তির ধনুকটা বিশুখুড়োকে দিয়ে এসেছি। বলেছি একটা হালকা দেখে এ.কে.-৪৭ বানিয়ে দিতে। তুমিও মাকে নিদেনপক্ষে একটা পাইপগান কিনে দাও বুঝলে?"
হতভম্ব ভোলানাথের দিকে চেয়ে লাকি আর সরো কলকলিয়ে বলে ওঠে- " হ্যাঁ বাবা! দাদা ঠিকই বলেছে। ওই গেলবার পুজোয় মর্ত্যে মামাবাড়ি গেলুম। তা একটু লেট নাইট শো দেখে প্যান্ডেলে ফিরছি। আর লাকি কে তো জানোই কেমন গয়নাগাঁটি পরে বেরোয় পথে। কিরকম গুন্ডা মতো কটা ছেলে পিছু নিল। হাতে পেটো, রিভলবার, অ্যাসিড বাল্ব সব ছিল। ভাগ্যিস হাঁসু আর পাঁচু গিয়ে ঝপ করে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে এল। নইলে যে কী হত ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় ভয়ে।"
আতঙ্কে ফ্যাকাশে মেরে যাওয়া মুখে ভোলাবাবু কোনো মতে বল্লেন - "মা কে ডাকলি না কেন তোরা? বা কালীমাসি কে?"
"কী যে বলো না বাবা! কালীমাসির তখনো কৈলাস থেকে যাওয়ার প্লেনের টিকিটই বুক হয়নি। আর মা প্যান্ডেল থেকে এসে ত্রিশুল এইম করতে করতে তোমার লাকি আনলাকি হয়ে যেত আর সরো পার্মানেন্ট Sorrow-সাগরে ডুব দিত।" - বলে দুই মেয়ে।
ভোলাবাবু তো যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! গনুটার বুদ্ধিশুদ্ধির ওপর চিরকাল একটু বেশিই আস্থা করেন। ওকে শুধোলেন -
"গনু বাপু তুই কি বলিস এ ব্যাপারে? সত্যি কি তোর মায়ের অস্ত্রগুলো ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে?"
গনু ভেবেচিন্তে ধীরে ধীরে বলে -"তা বাবা ওরা মিছে কথা কইচেনা। এই তো সেদিন মহি-জ্যাঠা খুব দুক্কু করছিল। মর্ত্যের দোর্দন্ডপ্রতাপ মনুষ্যরূপী অসুরগুলোর শয়তানি দেখে জ্যাঠার নাকি ভারি ইনফিরিয়োরিটি কমপ্লেক্স হয়েচে। অ্যান্টি ডিপ্রেশন বড়িও গিলছে অশ্বিনীমামাদের প্রেসকিপশনে। জিগ্গেস করো না।"
এক কোণে মুষড়ে বসে মোষের দুধ দুইতে থাকা মহি-জ্যাঠার দিকে শুঁড়-নির্দেশ করে গনু।
"মা কে ওইসব মর্ত্যবাসী মারকুটে অসুরদের সামনে ওই ফঙ্গবেনে অস্ত্র কটা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া কি উচিত হবে?"
সবাই বড় চিন্তায় কান মাথা চুলকোতে থাকে। এমন সময় ভোলানাথ-ঘরণী পারো প্রবেশ করেন। সকলের ঝিমোনো মুখগুলো দেখে শুধোন - "কী হল টা কী? এমন ম্যাদা মেরে আছো কেন সবকটা মিলে?"
সকলে মিলে হাঁউ মাঁউ খাঁউ করে সব বলতে শুরু করল। সব শুনে টুনে মাতা ঠাকরুণ বল্লেন -"তোদের অনেক আগেই সব কিছু আমার ভাবা হয়ে গেছে। এ যুগের নররূপী অসুরদের বধ করতে যে আমার পুরোনো অস্ত্রআর কাজে আসবেনা সে আমি ভালই বুঝেছি। তাই মর্ত্যের অসুর বধের দায় মর্ত্যেরই #অস্ত্র_উঠুক টিমের হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। যুগোপযোগী হাতিয়ার ওরাই খুঁজে বার করবে।"
ভোলানাথবাবু প্রবল বিস্ময়ে বললেন - "#অস্ত্র_উঠুক !! সেটা কী ? খায় না মাথায় দেয়! "
পারো তীব্র কটাক্ষপাত করে ঝেঁঝে উঠলেন - "সেটা জানতে গেলে তো গেলবার যে দামি মোবাইলটা পুজোয় গিফ্ট করলুম সেটা অন করতে হবে। ফেসবুকে লগ-ইন করতে হবে। ওদের পেজটায় পয়লা বৈশাখ থেকে নজর রাখতে হবে।"
"আর কাতু গনু লাকি সরো তোরাও কিন্তু ওদের বার্তা 'শেয়ার' করে ছড়িয়ে দিতে ভুলবি না।"
নোদে ভেঙ্গোও সমস্বরে বলে উঠলো - "আমরাও করব কত্তামা !"
মহি-জ্যাঠা টুক করে ইউ টিউবে অকাল মহালয়া চালিয়ে দিল -
"ইথ্থং যদা যদা বাধা দানবোথ্থা ভবিষ্যতি।
তদা তদাবতীর্যাহম করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্।।
যখন যখনই দানবের অত্যাচারে পৃথ্বী হবে ভারানতা, তখন তখনই শত্রুনাশের জন্য তুমি আবির্ভূতা হবে এই মহীতলে। এই আশ্বাসে স্নেহ ছিল, অভয় ছিল, প্রেম ছিল।
কিন্তু হে মা! শত্রু যে আজ সর্বত্রই। তোমার মহিমময় আবির্ভাব কি ঘটবে না? অস্ত্র কি তোমার ঝংকার তুলবে না অত্যাচারীর অঙ্গচ্ছেদনে?
"রাবনস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে ব্রহ্মণাবোধঃ
দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা।"
রাবণবধের জন্য রামকে অনুগ্রহ করতে ব্রহ্মার স্তুতিতে নিদ্রা থেকে জাগরিতা হয়েছিলে তুমি! তবে এই দুষ্কালে শত শত কন্ঠের আকুল স্তুতিতেও কি তোমার নিদ্রাভঙ্গ হচ্ছে না? তুমি কি শুধু রাজাকে অনুগ্রহ করবে বলে জগজ্জননীরূপে বিরাজিতা?
তবে "আব্রহ্মকীটজননী" কেন?
"গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধুযাবত পিবাম্যহম্।
ময়া ত্বয়ি হতেত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতা।।"
ধর্ষকের কামোল্লাস কি তোমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না? তবে তোমার এই নির্বিকল্পা নির্বিকারা রূপ কেন মা? তোমার বন্দনাগীতি সপ্তসুরে তানপুরে সাধা আছে, তোমার জয়ধ্বনি কম্বুকন্ঠে বাঁধা আছে। শুধু তোমার শত্রুনিধনের অপেক্ষা মাত্র।
আজ এই পূণ্য লগনে প্রেম-জরজর ভাষে বোধন করি তোমার! হে ত্রিলোকেশ্বরি! হে অমৃতানন্দময়ি! করূণাবলোকিনী! হে অনন্তা! হে অনন্তায়ূধধারিণী অনন্তভূজা! হে অনন্তকোটিব্রহ্মান্ডপ্রসবিনী! তোমার শক্তি জাজ্জ্বল্যমান আদিত্যকিরণের মত বিস্তারিত হোক জগতে। তোমার তীক্ষ্ণধার অস্ত্র উঠে আসুক নারীশক্তি রূপে। তোমার শাশ্বত বাৎসল্যময়ি মূর্তি হোক নারীর আদর্শ। এই ভাবদ্বয়ে ভাবমন্ডিতা হয়ে নারী হয়ে উঠুক 'ভীষণে মধুরা'।।
খড়্গে নাশো অরিকুল কালী কলিহরা।
নাশো মৃত্যু নাশো ব্যাধি বরাভয়করা।।
কালীদাস পদে পদে সেইপদ কয়।
যেপদে বিপদমাত্রে পদরক্ষা হয়।।
Subscribe to:
Comments (Atom)
